স্ট্রোকের আধুনিক চিকিৎসা শুধুই ঢাকাকেন্দ্রিক
জয়শ্রী ভাদুড়ী
মেট্রোরেলে রাজধানীর শাহবাগ থেকে উত্তরা যাওয়ার পথে শেওড়াপাড়া স্টেশনের কাছাকাছি অসুস্থ বোধ করেন ড. মুহা. নজীবুর রহমান। তিনি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ছিলেন। তাঁর ছেলে নাকিবুর রহমান জানান, ‘মেট্রোতে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় মেঝেতে লুটিয়ে পড়েন বাবা। এ সময় স্ট্রোকের কারণে তাঁর মৃত্যু হয়।’
চিকিৎসকরা জানান, স্ট্রোক এমন একটি জরুরি চিকিৎসা পরিস্থিতি, যেখানে প্রতিটি মিনিট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হঠাৎ মুখ বেঁকে যাওয়া, শরীরের এক পাশ অবশ বা দুর্বল হয়ে পড়া, কথা জড়িয়ে যাওয়া কিংবা কথা বলতে অসুবিধা হওয়া-এসব স্ট্রোকের লক্ষণ হতে পারে। এ সময় রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া গেলে মৃত্যুঝুঁকি কমানো এবং স্থায়ী পঙ্গুত্ব প্রতিরোধের সুযোগ তৈরি হয়। তবে দেশে স্ট্রোকের আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতি সবই ঢাকাকেন্দ্রিক। এ পরিস্থিতিতে আজ পালিত হচ্ছে বিশ্ব স্ট্রোক দিবস। এ বছরের প্রতিপাদ্য ‘প্রতিটি মিনিট গুরুত্বপূর্ণ’। এ ব্যাপারে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস হাসপাতালের (নিনস) সহযোগী অধ্যাপক ডা. হুমায়ুন কবীর হিমু বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘স্ট্রোকের ক্ষেত্রে প্রতিটি মিনিটই গুরুত্বপূর্ণ। মস্তিষ্কের কোনো রক্তনালি বন্ধ হয়ে গেলে আক্রান্ত অংশে রক্ত ও অক্সিজেনের সরবরাহ কমে যায়। ফলে মস্তিষ্কের কোষ দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকে। বড় রক্তনালি বন্ধ হয়ে গেলে প্রতি মিনিটে প্রায় ১৯ লাখ স্নায়ুকোষ নষ্ট হতে পারে। যত দেরিতে চিকিৎসা শুরু হয় মস্তিষ্কের ক্ষতি, পঙ্গুত্ব ও মৃত্যুর ঝুঁকি তত বাড়ে। দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছালে উপযুক্ত রোগীর ক্ষেত্রে থ্রম্বোলাইসিস বা মেকানিক্যাল থ্রম্বেকটমির মাধ্যমে রক্তপ্রবাহ ফিরিয়ে আনা সম্ভব।’ নিয়মিতভাবে মেকানিক্যাল থ্রম্বেকটমি হচ্ছে শুধু ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেসে (নিনস)। অল্প পরিসরে বাংলাদেশ স্পেশালাইজড হাসপাতাল ও ইবনে সিনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, কল্যাণপুরে এ চিকিৎসা দেওয়া হয়।
লালমনিরহাটের হাতীবান্ধার পরিতোষ সাহার মেয়ে নিপা সাহার বয়স মাত্র ১৬ বছর। অজ্ঞান হয়ে যাওয়ায় চিকিৎসকের কাছে নিয়ে গেলে চিকিৎসক জানান, নিপা স্ট্রোক করেছে। নিপার স্বজন পরশ সাহা বলেন, ‘উন্নত চিকিৎসার জন্য লালমনিরহাট থেকে ১২ ঘণ্টা রাস্তা পাড়ি দিয়ে নিপাকে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস (নিনস) হাসপাতালে আনা হলে চিকিৎসকরা জানান নিপার অবস্থা সংকটাপন্ন। দ্রুত ভর্তি করে চিকিৎসা শুরু করতে হবে রোগীর। কিন্তু শয্যা ফাঁকা না থাকায় ওই হাসপাতালে ভর্তি করাতে পারিনি।’ জানা যায়, দেশে প্রতি ১ হাজার জনের মধ্যে প্রায় ১৩ দশমিক ৬ জন স্ট্রোকে আক্রান্ত হন। আশঙ্কার বিষয় হলো, এর মধ্যে ২৩ শতাংশের বয়স ৫০ বছরের কম। অর্থাৎ প্রতি চারজন স্ট্রোক রোগীর একজনের বয়স ৫০ বছরের নিচে। বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে। ২০২৪ সালে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের পাবলিক হেলথ অ্যান্ড ইনফরমেটিকস বিভাগ পরিচালিত এ গবেষণার তথ্য বলছে, ৬০ থেকে ৬৯ বছর বয়সি মানুষের মধ্যে স্ট্রোকের হার সবচেয়ে বেশি। এ বয়সসীমার ২৮ শতাংশ মানুষ স্ট্রোকে আক্রান্ত হন। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিউরোসার্জারি বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘স্ট্রোকের হার বাড়ার পেছনে বিভিন্ন কারণ রয়েছে। এর মধ্যে চাপের জীবনযাত্রা, ফাস্টফুড খাওয়া, শারীরিক পরিশ্রম কম করা এবং ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ বৃদ্ধি অন্যতম।’
