হীরা-সোনা চোরাচালান নেপথ্যে ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ড

নিজস্ব প্রতিবেদক

হীরা কিনতে ক্রেতাকে গুনতে হয় লাখ লাখ টাকা। মূল্যবান এই রত্নের প্রতি মানুষের আকর্ষণ যেমন বেশি, তেমন আসল-নকল শনাক্ত করাও সাধারণ ক্রেতার জন্য কঠিন। চকচকে পাথর, আকর্ষণীয় নকশা, অভিজাত শোরুম আর বিক্রেতার আশ্বাসে ভরসা করেই অনেকে কেনেন হীরার গয়না। কিন্তু সেই হীরার প্রকৃত পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন উঠলে কিংবা স্বাধীন পরীক্ষায় ঘোষিত মানের সঙ্গে অমিল পাওয়া গেলে সামনে আসে প্রতারণার আশঙ্কা। দেশের হীরা ও মূল্যবান রত্নের ব্যবসায় এমনই গুরুতর অভিযোগের মুখে আলোচনায় এসেছে ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ড এবং প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) দিলীপ কুমার আগরওয়ালার নাম।

অভিযোগ রয়েছে, ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ডের বিভিন্ন শোরুমে কাচ বা কৃত্রিম পাথরে তৈরি অলংকারকে আসল হীরা হিসেবে বিক্রি করে ক্রেতাদের কাছ থেকে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির হীরা ও স্বর্ণ আমদানি, স্থানীয় বাজার থেকে বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ ও হীরা সংগ্রহ এবং এসব পণ্যের বৈধ উৎস নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সিআইডির এক দিনের রিমান্ড শেষে উত্তরার একটি হত্যা মামলায় চার দিনের রিমান্ডে আছেন দিলীপ কুমার আগরওয়ালা। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) বলছে, আমদানি করা হীরার পরিমাণের তুলনায় অনেক বেশি হীরা বিক্রির হিসাব পাওয়া গেছে। অতিরিক্ত হীরা কোথা থেকে এলো, তার সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পারেননি আগরওয়ালা। সিআইডি সূত্র জানায়, ২০০৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৪ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ঋণপত্রের (এলসি) মাধ্যমে ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ড ৩৮ কোটি ৪৭ লাখ টাকার স্বর্ণের বার, অলংকার, লুজ ডায়মন্ড ও অন্যান্য পণ্য আমদানি করেছে। অন্যদিকে ক্রয়, বিনিময় ও পরিবর্তনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি স্থানীয় বাজার থেকে ৬৭৮ কোটি ১৯ লাখ টাকার স্বর্ণ ও হীরা সংগ্রহ করেছে। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এসব স্বর্ণ ও হীরা কোথা থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে এবং কারা সরবরাহ করেছেন, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় বৈধ নথিপত্র দেখাতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি। আমদানি ও বিক্রির হিসাবের মধ্যে অসংগতি এবং বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ ও হীরার উৎস নিয়ে তদন্তকারীদের প্রশ্ন রয়েছে। রিমান্ডে এসব বিষয়ে দিলীপ কুমার আগরওয়ালাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য, আমদানির তুলনায় বেশি পরিমাণ হীরা বিক্রির হিসাবের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে সন্তোষজনক তথ্য দিতে পারেননি তিনি। তবে হিসাবের এই অসংগতির সঙ্গে চোরাচালান বা প্রতারণার সরাসরি যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা তদন্তে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। গত বছরের ১৭ নভেম্বর দিলীপ কুমার আগরওয়ালার বিরুদ্ধে রাজধানীর গুলশান থানায় অর্থ পাচারের মামলা করে সিআইডি। ওই মামলায় স্বর্ণ ও হীরার উৎস, আমদানি-রপ্তানির হিসাব এবং অর্থের লেনদেন খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ডের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো কাচ বা কৃত্রিম পাথরের অলংকারকে আসল হীরা হিসেবে বিক্রি করা। সূত্র জানায়, প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন শোরুম থেকে এসব অলংকার কিনে প্রতারিত হয়েছেন এমন কয়েকজন ক্রেতার অভিযোগ তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নজরে এসেছে। অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে ক্রয় রসিদ, হীরার সনদ এবং স্বাধীন পরীক্ষাগারের প্রতিবেদন সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। হীরা বেচাকেনায় পাথরটির প্রকৃত পরিচয় নির্ধারণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাজারে প্রাকৃতিক হীরা, পরীক্ষাগারে উৎপাদিত হীরা এবং হীরার মতো দেখতে বিভিন্ন বিকল্প পাথর পাওয়া যায়। এগুলোর উৎপাদনপদ্ধতি, বৈশিষ্ট্য, বাজারমূল্য ও শনাক্ত করার পদ্ধতিতে পার্থক্য রয়েছে। কাচের তৈরি পাথরও হীরার মতো চকচকে হতে পারে। তাই শুধু বাহ্যিক সৌন্দর্য বা বিক্রেতার বক্তব্যের ভিত্তিতে কোনো পাথরকে আসল হীরা বলে নিশ্চিত হওয়া যায় না। তদন্তসংশ্লিষ্টরা জানান, ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ডের বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ ও হীরা সংগ্রহের উৎস এবং সরবরাহকারীদের পরিচয় যাচাই করে দেখা হচ্ছে। দিলীপ কুমার আগরওয়ালার বিরুদ্ধে দুবাই ও সিঙ্গাপুরকেন্দ্রিক স্বর্ণ চোরাচালান সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণের অভিযোগও রয়েছে। এ ছাড়া ভারতের কলকাতায় তিনটি জুয়েলারি দোকান ও ১১টি বাড়ি এবং মালয়েশিয়া, দুবাই ও কানাডায় বিপুল সম্পদ অর্জনের তথ্য আছে। সোমবার রাজধানীর বনানী থেকে দিলীপ কুমার আগরওয়ালাকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। এর আগে ২০২৪ সালের ৩ সেপ্টেম্বর তৎকালীন র‌্যাব তাঁকে আটক করেছিল। পরে জুলাই গণ অভ্যুত্থানে রাজধানীর বাড্ডায় কিশোর হৃদয় আহমেদ হত্যার ঘটনায় করা মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। পরবর্তী সময়ে জামিনে মুক্তি পান তিনি। দিলীপ কুমার আগরওয়ালা বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বাজুস) সাবেক সভাপতি। তিনি ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সাবেক পরিচালক ও সহসভাপতিও। এ ছাড়া তিনি কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় শিল্প ও বাণিজ্যবিষয়ক উপকমিটির সদস্য ছিলেন। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চুয়াডাঙ্গা-১ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পরাজিত হন তিনি।

ওই আসনের মধ্যে আলমডাঙ্গা ও চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার একাংশ রয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights