১৭০০ কোটি টাকার রাজস্ব হারানোর শঙ্কা

ছয় সদস্যের উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের (জিসিসি) সঙ্গে প্রস্তাবিত মুক্তবাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) কার্যকর হলে পণ্য আমদানিতে শুল্ক প্রত্যাহারের কারণে বাংলাদেশ বছরে সর্বোচ্চ ১ হাজার ৭০০ কোটি টাকা রাজস্ব হারাতে পারে। সম্ভাব্য এ ক্ষতি এড়াতে সংবেদনশীল শিল্পের পণ্যে শুল্ক বহাল রাখা এবং পর্যায়ক্রমে শুল্ক কমানোর সুপারিশ করা হয়েছে। এতে একদিকে রাজস্বের ওপর চাপ কমানো, অন্যদিকে দেশীয় শিল্পকে প্রতিযোগিতার জন্য প্রস্তুত হওয়ার সময় দেওয়ার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের (বিটিটিসি) এক সমীক্ষায় এ সম্ভাব্য রাজস্ব ক্ষতির বিষয়টি উঠে এসেছে। চলতি মাসের শুরুতে বাণিজ্য সচিবের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক যাচাই কর্মশালায় সমীক্ষাটি পর্যালোচনা করা হয়। বাণিজ্য বাড়ানো এবং রপ্তানি পণ্যে বৈচিত্র্য আনার লক্ষ্যে সরকার জিসিসির সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তির বিষয়টি বিবেচনা করছে। সমীক্ষায় সংবেদনশীল শিল্পের পণ্য এবং যেসব পণ্য থেকে সরকারের উল্লেখযোগ্য রাজস্ব আসে, সেগুলোর ওপর ৫ শতাংশ শুল্ক বহাল রাখার সুপারিশ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, একবারে সব শুল্ক প্রত্যাহার না করে ধাপে ধাপে কমানো হলে রাজস্বের ওপর তাৎক্ষণিক চাপ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জিসিসিভুক্ত দেশগুলো থেকে বাংলাদেশ ৫৬৪ কোটি মার্কিন ডলারের পণ্য আমদানি করেছে। বিপরীতে রপ্তানি করেছে ৬৮ কোটি ৯২ লাখ ৬০ হাজার ডলারের পণ্য। ফলে দুই পক্ষের বাণিজ্যে বড় ব্যবধান রয়েছে। জিসিসি থেকে বাংলাদেশের আমদানির বড় অংশই পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য। বিটিটিসির সমীক্ষা অনুযায়ী, প্রস্তাবিত চুক্তি কার্যকর হলে জিসিসি থেকে বাংলাদেশের আমদানি আরও প্রায় ২০ কোটি ৬৮ লাখ ৮০ হাজার ডলার বাড়তে পারে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এফটিএ উইংয়ের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, পর্যায়ক্রমে শুল্ক কমানো হলে সরকারের রাজস্বের ওপর প্রভাব সামাল দেওয়া সহজ হবে। একই সঙ্গে দেশীয় শিল্পগুলোকে নতুন বাণিজ্য পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া যাবে। রপ্তানি বাড়ানোর সুযোগ : রাজস্ব হারানোর ঝুঁকি থাকলেও জিসিসির বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি সম্প্রসারণের সম্ভাবনা রয়েছে। জিসিসির সদস্য দেশগুলো হলো সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, কাতার, ওমান ও বাহরাইন। বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে জিসিসিভুক্ত দেশগুলো প্রায় ১ হাজার ৩৫৪ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক আমদানি করেছে। তবে এ বাজারে বাংলাদেশ এখনো উল্লেখযোগ্য অংশীদারি অর্জন করতে পারেনি। জিসিসির আমদানি শুল্কের সর্বোচ্চ হার ৫ শতাংশ হলেও বাজারটির সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো যায়নি। উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে জানানো হয়, জিসিসিতে আমদানি পণ্যের ওপর গড় সর্বাধিক সুবিধাপ্রাপ্ত দেশ (এমএফএন) শুল্কহার ৫ দশমিক ০৩ শতাংশ। কৃষিপণ্যে এ হার ৬ দশমিক ৬২ শতাংশ এবং অকৃষিপণ্যে ৪ দশমিক ৮ শতাংশ। প্রস্তাবিত চুক্তির মাধ্যমে তৈরি পোশাকের পাশাপাশি হালাল খাদ্যপণ্য, চামড়াজাত পণ্য, গৃহসজ্জার বস্ত্র, সিরামিক, ওষুধ, কৃষিপণ্য ও হালকা প্রকৌশল পণ্য রপ্তানি বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এ সুযোগ কাজে লাগানোর পাশাপাশি রাজস্ব ও দেশীয় শিল্পের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব বিবেচনায় নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। এফটিএর বদলে বৃহত্তর চুক্তির প্রস্তাব : জিসিসির সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তির ক্ষেত্রে শুধু আমদানি-রপ্তানি নয়, জ্বালানি নিরাপত্তা ও কৌশলগত সম্পর্কের বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে। বৈঠকে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) জিসিসির সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের এ দুই দিক তুলে ধরে আরও বিস্তৃত পরিসরের সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারি চুক্তি (সিইপিএ) অথবা অর্থনৈতিক অংশীদারি চুক্তি (ইপিএ) করার বিষয়টি বিবেচনার পরামর্শ দিয়েছে। বাংলাদেশ এরই মধ্যে জিসিসির সঙ্গে পাঁচটি খাত নিয়ে একটি সমঝোতা স্মারক সই করেছে। তবে পূর্ণাঙ্গ চুক্তির দিকে এগোনোর আগে দেশের প্রস্তুতি ও সক্ষমতা নিয়ে সামগ্রিক মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের একজন প্রতিনিধি। প্রস্তাবটি শিগগিরই প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে। অনুমোদন পাওয়া গেলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে জিসিসির সঙ্গে আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ করবে বাংলাদেশ। এদিকে প্রস্তাবিত এফটিএর স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব মূল্যায়ন করে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন জমা দিতে হবে। এ তালিকায় রয়েছে শিল্প, কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ, প্রবাসীকল্যাণ এবং নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়। পাশাপাশি জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগকেও তাদের মূল্যায়ন জমা দিতে হবে। সব মিলিয়ে জিসিসির সঙ্গে প্রস্তাবিত চুক্তিতে বাংলাদেশের সামনে রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণের সুযোগ থাকলেও সম্ভাব্য রাজস্ব ক্ষতি ও দেশীয় শিল্পের সক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। শুল্ক প্রত্যাহারের গতি, সংবেদনশীল পণ্যের সুরক্ষা এবং সংশ্লিষ্ট খাতগুলোর প্রভাব মূল্যায়ন এ চুক্তির গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights