৫০০ কুমিরের নদীতেই হবে অলিম্পিক নৌকাবাইচ
অনলাইন ডেস্ক
অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ড রাজ্যের রকব্যান্ড শহরে অবস্থিত ফিটজরয় নদীতে প্রতি বছর অনুষ্ঠিত হওয়া স্কুল রেগাটা প্রতিযোগিতায় সাধারণত সংবাদমাধ্যমের তেমন আগ্রহ থাকে না। তবে চলতি সপ্তাহে সেই দৃশ্যপট বদলে গেছে। রাজ্যের সবচেয়ে প্রতিশ্রুতিশীল ছয় শতাধিক কিশোর নৌকা বাইচ প্রতিযোগীকে ঘিরে দেশি-বিদেশি গণমাধ্যমের নজর কাড়ছে এই ইভেন্ট। রোয়িং কুইন্সল্যান্ডের প্রধান অ্যান্থিয়া ও’লাফলিন জানান, এর আগে কখনো কোনো মিডিয়া তাদের এই প্রতিযোগিতার দিকে মনোযোগ দেয়নি।
কিন্তু এবারের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। আগামী ২০৩২ সালের ব্রিসবেন অলিম্পিক এবং প্যারালিম্পিকের রোয়িং ও ক্যানু স্প্রিন্ট প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে এই ফিটজরয় নদীতেই। সাম্প্রতিক এক কারিগরি মূল্যায়নে স্থানটি অ্যাথলেটদের জন্য নিরাপদ ও নিরপেক্ষ প্রতিযোগিতা আয়োজনের উপযোগী হিসেবে অনুমোদিত এবং সমর্থিত হয়েছে।
তবে এই সিদ্ধান্তের পর থেকেই আলোচনায় উঠে এসেছে নদীর এক অন্যরকম অধিবাসী; লোনা পানির কুমির। প্রায় ৫০০টি লোনা পানির কুমিরের আবাসস্থল এই নদীতে প্রায় চার মিটার বা ১৩ ফুট দীর্ঘ কুমিরের দেখা মেলা মোটেও অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু গত ৪০ বছরেরও বেশি সময় ধরে রাজ্য সরকারের নথিপত্রে এই অঞ্চলে মানুষের ওপর কোনো কুমিরের আক্রমণের ঘটনা রেকর্ড করা হয়নি।
গত মাসে আমস্টারডামে অনুষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড রোয়িং কংগ্রেসে প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বদের মুখে ‘নিরাপত্তা’ শব্দটি কয়েকবার উচ্চারিত হলেও, এই সরীসৃপ প্রাণীদের উপস্থিতি কিন্তু আন্তর্জাতিক ক্রীড়া সংস্থাসমূহের প্রধান উদ্বেগের বিষয় ছিল না।
ব্রিটিশ রোয়িংয়ের প্রধান নির্বাহী টম সোলেসবারির কাছে যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়ে উত্থাপিত হয়েছে তা হলো ‘প্রতিযোগিতার সততা ও নিরপেক্ষতা’। জোয়ার-ভাটার এই নদীর প্রাকৃতিক বাঁক এবং তীব্র স্রোতকে অনেক আন্তর্জাতিক রোয়িং বিশেষজ্ঞই শীর্ষ পর্যায়ের অলিম্পিক প্রতিযোগিতার জন্য অনুপযোগী বলে মনে করছেন।
অস্ট্রেলিয়ার হয়ে তিনটি অলিম্পিক স্বর্ণজয়ী ড্রু জিন ফিটজরয় নদীর বন্যা পরিস্থিতি এবং প্রতিযোগিতার ‘সততা ও নিরপেক্ষতা’ নিয়ে তার আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ব্যক্তিগতভাবে আমি অস্ট্রেলিয়ার বন্যপ্রাণীদের ভয় পাই না, তবে আমার কাছাকাছি কখনও কোনো কুমির আসেনি। যদি তেমনটা হতো, আমি নিশ্চিত যে আমি আরও দ্রুত নৌকা চালাতাম, সমস্ত অ্যাথলেটরাই আরও দ্রুত চালাত। উদ্বেগের তালিকায় কুমিরের বিষয়টি নিশ্চিতভাবেই আগে উঠেছিল, তবে এটা তাদের সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকারের উদ্বেগ ছিল না।
জার্মান রোয়িং সংস্থার সভাপতি মরিস পেট্রি আবার এই ইভেন্টটি মূল আয়োজক শহর ব্রিসবেন থেকে প্রায় ৬০০ কিলোমিটার (৩৭৩ মাইল) দূরে আয়োজনের দীর্ঘমেয়াদী স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
তবে এই ধরনের সমস্ত প্রতিবন্ধকতার কথা উড়িয়ে দিয়েছেন কুইন্সল্যান্ডের প্রিমিয়ার ডেভিড ক্রিসাফুলি। কড়া ভাষায় তিনি প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেন, চলুন সত্যের মুখোমুখি হই এবং সবকিছুর আড়ালে না গিয়ে যা সত্যি তা-ই বলি। এটি হলো আন্তঃরাজ্য এবং বিদেশি কিছু এলিটদের একটি দল, যারা জোর জবরদস্তি করার চেষ্টা করছে। কারণ তারা আঞ্চলিক কুইন্সল্যান্ডে আসতে চায় না, যা মোটেও ঠিক নয়।
ক্রিসাফুলির এই ‘এলিট’ মন্তব্যের বিষয়ে সরাসরি মন্তব্য করতে রাজি হননি রোয়িং কর্তারা। তবে জার্মান সংস্থার প্রধান মরিস পেট্রি এবং রোয়িং নিউজিল্যান্ডের প্রধান নির্বাহী সাইমন উইকম উভয়ই স্পষ্ট করেছেন যে, তাদের আপত্তির সাথে নগর বা আঞ্চলিক পছন্দের কোনো সম্পর্ক নেই, বরং তারা চান প্রতিযোগীরা যেন একটি নিরপেক্ষ ট্র্যাকে খেলার সুযোগ পায়। পেট্রি যোগ করেন, যে অ্যাথলেটরা চার বছর ধরে কঠোর অনুশীলন করে অলিম্পিক চ্যাম্পিয়ন হওয়ার স্বপ্ন দেখেন, তাদের নিরাপত্তার বিষয়টিই এখানে মুখ্য। অন্যদিকে ড্রু জিন বলেন, বিগত ২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে এই খেলায় অভিজ্ঞতা থাকার কারণে যদি কেউ আমাকে এলিট বলে, তবে আমি তাতে গর্বিত।
কুমির বা নদীর স্রোত; বিতর্ক যাই থাক না কেন, আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটি (আইওসি) এবং ওয়ার্ল্ড রোয়িং কারিগরি মূল্যায়নে সবুজ সংকেত দেওয়ার পর ভেন্যু হিসেবে এটি নিশ্চিত হয়েছে। নদীর তলদেশ, প্রতিযোগিতার গতিপথ, পানির প্রবাহ, পানির স্তর এবং আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ করে ওয়ার্ল্ড রোয়িংয়ের সভাপতি জঁ-ক্রিস্টোফ রোল্যান্ড জানান, ফিটজরয় নদী অলিম্পিকের সময় সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ প্রতিযোগিতা উপহার দিতে সক্ষম। অন্যদিকে প্যাডেল ওয়ার্ল্ডের সভাপতি থমাস কোনিয়েটজকো ক্যানু স্প্রিন্ট অ্যাথলেটদের জন্য এই ভেন্যুর ওপর তাদের পূর্ণ আস্থা প্রকাশ করেছেন।
কুইন্সল্যান্ডের প্রিমিয়ার ডেভিড ক্রিসাফুলি এই অনুমোদনে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে সংসদে ঘোষণা করেন, ফিটজরয় নদী অত্যন্ত সাফল্যের সাথে উত্তীর্ণ হয়েছে। এটি এখন অফিসিয়াল।
সূত্র: বিবিসি
