অজ্ঞাত লাশ নিয়ে নানা প্রশ্ন

সাখাওয়াত কাওসার

রাজধানীর পার্শ্ববর্তী টঙ্গীর বাসিন্দা সোহেল শেখ। অটোরিকশা চালাতেন উত্তরায়। কাজের ফাঁকে অংশ নিতেন গণ আন্দোলনে। ৫ আগস্ট থেকে নিখোঁজ তিনি। সোহেল অবুঝ দুই সন্তানের জনক। দুই বছরের শিশু সায়মন শেখ এবং সাত বছরের সুমাইয়াকে প্রবোধ দেওয়া হয়। বলা হয়, তাদের বাবা কাজের জন্য বাইরে গেছেন। এ প্রতিবেদকের সঙ্গে গতকাল কথা বলতেই হাউমাউ করে কাঁদতে থাকেন স্ত্রী আয়েশা আক্তার। বলেন, সন্তানদের কোনো উত্তর দিতে পারি না। অর্থাভাবে টঙ্গী থেকে বাবার বাড়ি পিরোজপুরে চলে আসতে হয়েছে। স্বামীর সন্ধান চেয়ে উত্তরা পশ্চিম থানায় জিডি করেছিলাম। কেউ আমাদের খোঁজ করেনি।

গাজীপুর কোনাবাড়ি শরীফ মেডিকেলের সামনে ৫ আগস্ট গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন হৃদয় (২০)। নিখোঁজ হৃদয়ের বোনের স্বামী ইব্রাহীম বলেন, কলেজে পড়ার পাশাপাশি অটোরিকশা চালাত হৃদয়। কাজের ফাঁকে আন্দোলনে অংশ নিত। তাকে গুলি করে মেরে ফেলার দৃশ্য দেখেছেন অনেকে। তার হতভাগা বাবা লাল মিয়া কিংবা তার কোনো স্বজনের সঙ্গে যোগাযোগ তো দূরে থাক, কারও ডিএনএ স্যাম্পল নেওয়ারও প্রয়োজনবোধ করেনি কোনো হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগ।

সোহেল শেখ এবং হৃদয়ের স্বজনদের মতো অনেক নিখোঁজ পরিবারের স্বজনদের ডিএনএ নমুনা নেওয়া হয়নি ঢাকা মেডিকেল কলেজ কিংবা অন্য কোনো হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগ থেকে। তাদের স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ করেনি দায়িত্বপ্রাপ্ত কোনো সংস্থাও।

বেওয়ারিশ লাশ দাফনকারী দাতব্য সংস্থা আঞ্জুমানে মফিদুল ইসলামের লাশ দাফনের প্রক্রিয়া নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। কবরে দেওয়া হচ্ছে না কোনো চিহ্ন, যা দেখে লাশ এবং স্বজনের ডিএনএ স্যাম্পল মিললে কবর শনাক্ত করা যায়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মামলার অধিকতর তদন্তের জন্য আদালত কবর থেকে লাশ উত্তোলনের আদেশ দিলে কীভাবে এর বাস্তবায়ন হবে?

মানবাধিকার সংগঠন ‘অধিকার’-এর নির্বাহী পরিচালক নাসির উদ্দীন এলান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, আঞ্জুমানের লাশ দাফনের প্রক্রিয়া নিয়ে অনেক প্রশ্ন রয়েছে। কবরগুলোতে অন্তত নম্বর দিয়ে রাখা উচিত ছিল। পরবর্তী সময়ে লাশ শনাক্ত হলে স্বজনরা যাতে কবর শনাক্ত করতে পারেন। এর বাইরে চাঞ্চল্যকর মামলার জন্য লাশ তোলার প্রয়োজন হলে ভয়াবহ অবস্থার মুখোমুখি হতে হবে। জুলাই-আগস্ট গণ অভ্যুত্থানে শহীদদের স্বজনদের খোঁজ না নেওয়া এবং সহযোগিতা না দেওয়ার ঘটনায়ও ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানান তিনি।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, চলতি মাসের ১ থেকে ২৮ তারিখ পর্যন্ত বেওয়ারিশ হিসেবে ৪৯টি লাশ দাফন করা হয়েছে আঞ্জুমানের মাধ্যমে। কোনো কবরেই দেওয়া হয়নি শনাক্তকরণ চিহ্ন। হাসপাতালগুলোর ফরেনসিক বিভাগ থেকে অজ্ঞাত লাশের ডিএনএ নমুনা নেওয়ার কথা বলা হলেও লাশের সন্ধানে আসা স্বজনের ডিএনএ স্যাম্পল নেওয়ার ক্ষেত্রে চরম উদাসীনতার খবর পাওয়া গেছে। জুলাই-আগস্ট মাসে বেওয়ারিশ হিসেবে রায়ের বাজার কবরস্থানে দাফন হওয়া ১১৫ জনের মধ্যে গতকাল পর্যন্ত মাত্র চারজনের পরিচয় মিলেছে। অনেকেরই প্রশ্ন, তাহলে বেওয়ারিশ হিসেইে থাকবেন সময়ের সাহসী এই সূর্য সন্তানরা?

জুলাই আগস্ট ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী মীর মাহবুবুর রহমান স্নিগ্ধ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, জুলাই-আগস্টে বেওয়ারিশ হিসেবে যেসব লাশ দাফন করা হয়েছে সেগুলোর ডিএনএ নমুনা রাখা হয়েছে। তাদের সন্ধানে থাকা স্বজনরা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সহায়তা নিতে পারেন। যেসব পরিবারের খোঁজ নেওয়া হয়নি বা আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়নি শিগগিরই তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হবে।

ঢাকা মেডিকেল কলেজের (ঢামেক) ফরেনসিক বিভাগের প্রধান কাজী গোলাম মোখলেসুর রহমান বলেন, ২০২৪ সালে ২ হাজার ৯৬টি লাশের ময়নাতদন্ত হলেও অজ্ঞাত হিসেবে আঞ্জুমান মফিদুলকে দেওয়া হয়েছে ২৭৭টি। চলতি বছরের ২৮ জানুয়ারি পর্যন্ত ময়নাতদন্ত হয়েছে ১৬৩টি লাশের। বর্তমানে ঢামেকে লাশ রয়েছে আন্দোলনের সাতটি ও বেওয়ারিশ নয়টি। বিভিন্ন আইনি জটিলতার কারণে কারাবন্দি এবং বিদেশিসহ আটটি লাশ পড়ে আছে।

পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ফরেনসিক ইউনিটের অতিরিক্ত ডিআইজি সম্পা ইয়াসমীন বলেন, জুলাই-আগস্টে নিহত ১০টি লাশের ডিএনএ স্যাম্পল পেয়েছি, যার মধ্যে দুটির সঙ্গে স্বজনের স্যাম্পল মিলেছে। আরও দুটি প্রক্রিয়াধীন। ছয়টি লাশের স্যাম্পলের সঙ্গে এখনো কোনো সন্ধানকারীর স্যাম্পল মেলেনি। লাশ থেকে দেরিতে স্যাম্পল নেওয়া হলে ম্যাচিংয়ের সম্ভাবনা কমে যায়, বিষয়টিও যোগ করেন তিনি।

জানা গেছে, আঞ্জুমান মফিদুল ইসলাম গত এক বছরে ৫১৬টি বেওয়ারিশ লাশ দাফন করেছে। বেশির ভাগই দাফন করা হয়েছে রায়েরবাজারের বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে। জানুয়ারিতে ৪৪, ফেব্রুয়ারিতে ৩৩, মার্চে ৪৯, এপ্রিলে ৩৭, মে মাসে ৫৯, জুনে ৪৮, জুলাইয়ে ৮১, আগস্টে ৩৪, সেপ্টেম্বরে ৩৪, অক্টোবরে ৪৪, নভেম্বরে ৫৩ ও ডিসেম্বরে ৫৪টি লাশ উদ্ধার করে বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করে সংস্থাটি।

আঞ্জুমান মফিদুল ইসলামের দাফন সেবা কর্মকর্তা কামরুল আহমেদ বলেন, নানা সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক কিছুই সম্ভব হয় না। লাশ শনাক্তের পর আমরা শুধু কবরস্থানের সন্ধান দিতে পারি। আদালতের নির্দেশে কবর থেকে লাশ উত্তোলনের প্রয়োজন হলে কী হবে? এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তখন ওই তারিখে যতগুলো কবর দেওয়া হয়েছে সব তোলা লাগবে।

সম্প্রতি সরেজমিন রায়েরবাজার বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে গিয়ে দেখা গেছে, অজ্ঞাতনামা লাশগুলো কবরস্থানটির ৪ নম্বর ব্লকে সারিবদ্ধভাবে দাফন করা হয়েছে। এর কোনোটাতেই নেই নামফলক, চিহ্ন বা সাইন বোর্ড। নতুন কবরগুলো ছাড়া বেশির ভাগ কবরেরই উঁচু ঢিবি সমান হয়ে গেছে।

রায়ের বাজার বুদ্ধিজীবী কবরস্থানের ইনচার্জ মাওলানা ফেরদৌস বলেন, আমাদের কাছে লাশ এসেছে। দাফন করেছি। লাশের কাফন খুলে দেখার সুযোগ নেই। আর কে কোন কবরে তা আমাদের জানা নেই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights