অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় ছাড়াই সংশোধন হচ্ছে ৩৮ লাখ আইসিটি বই

বাসস

২০২৭ শিক্ষাবর্ষের ষষ্ঠ শ্রেণির তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বইয়ের জ্ঞানের পিরামিডে প্রজ্ঞার প্রতীক হিসেবে মস্তিষ্কের পরিবর্তে দাঁড়িপাল্লার ছবি ব্যবহার নিয়ে তৈরি হওয়া বিতর্ক সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মাঠপর্যায়ে সরবরাহ করা ১৭ লাখ বই ও প্রেসের গুদামে থাকা আরও ২১ লাখসহ প্রায় ৩৮ লাখ আইসিটি বইয়ের সংশ্লিষ্ট পৃষ্ঠা বা ফর্মা সংশোধন করে পুনরায় ছাপিয়ে বইগুলো ফের বাঁধাই করে উপজেলা পর্যায়ে পাঠানো হবে। এতে সরকারের বাড়তি কোনো খরচ হবে না।

জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) চেয়ারম্যান প্রফেসর মোহাম্মদ ফখরুল মওলা সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে এ তথ্য জানান।

সাক্ষাৎকারে তিনি আইসিটি বইয়ের অনাকাক্সিক্ষত ভুল সংশোধন, সরকারের আর্থিক সংশ্লেষ এবং নতুন পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণের সার্বিক অগ্রগতি নিয়ে বিস্তারিত কথা বলেন।

সাক্ষাৎকারের শুরুতে ষষ্ঠ শ্রেণির আইসিটি বইয়ের একটি পৃষ্ঠায় জ্ঞানের পিরামিডে প্রজ্ঞার প্রতীক হিসেবে দাঁড়িপাল্লা পরিবর্তন প্রসঙ্গে এনসিটিবি চেয়ারম্যান বলেন, ‘২০২৭ শিক্ষাবর্ষের ষষ্ঠ শ্রেণির আইসিটি বইয়ের মুদ্রণকাজ আগেই শেষ হয়েছিল। প্রায় ১৭ লাখ বই ইতোমধ্যে জেলা ও উপজেলা পর্যায়েও চলে গিয়েছিল। আমরা জানতে পেরেছি, চলতি শিক্ষাবর্ষের বইয়ে যেখানে মানুষের মস্তিষ্কের ছবি ছিল, সেটি পরিবর্তন হয়ে প্রজ্ঞার প্রতীক হিসেবে পূর্বের দাঁড়িপাল্লার একটি নকশা যুক্ত হয়েছে। বইয়ের বিতর্কিত পৃষ্ঠায় জ্ঞানের পিরামিডে কোনো প্রতীক থাকছে না। সেভাবেই আমরা পরিমার্জন করার চিন্তা করছি।’

তিনি বলেন, ‘বিষয়টি আমাদের নজরে আসার সঙ্গে সঙ্গেই মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে জরুরি সভা করি এবং প্রায় ৩৮ লাখ আইসিটি বইয়ের মধ্যে মাঠপর্যায়ে পাঠানো ১৭ লাখ বই ফেরত এনে দ্রুত সংশোধনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আগামী ৩০ নভেম্বরের মধ্যে সংশোধিত বইগুলো পুনরায় উপজেলা পর্যায়ে পৌঁছে যাবে।’

৩৮ লাখ আইসিটি বইয়ের পৃষ্ঠা সংশোধন করে পুনরায় ছাপিয়ে মাঠ পর্যায়ে পাঠানোর ক্ষেত্রে সরকারের অতিরিক্ত কোনো আর্থিক ব্যয় হবে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে প্রফেসর মোহাম্মদ ফখরুল মওলা বলেন, ‘বিষয়টি আমি অত্যন্ত পরিষ্কার করে বলতে চাই—এই ৩৮ লাখ বই পুনরায় ছাপানো ও পাঠানোর পেছনে সরকারের এক টাকাও অতিরিক্ত আর্থিক সংশ্লেষ বা খরচ হবে না। বইগুলোর ফর্মা বা নির্দিষ্ট পাতা পরিবর্তন করে পুনরায় ছাপানোর সম্পূর্ণ ব্যয় সংশ্লিষ্ট প্রেস মালিকরা নিজেদের দায়িত্বে বহন করবেন। প্রেস মালিকদের সঙ্গে আমাদের সুনির্দিষ্ট বৈঠক হয়েছে। তারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে এই দায়িত্ব পালনে সম্মত হয়েছেন। ফলে সরকারের কোষাগার থেকে এর জন্য একটি পয়সাও খরচ হচ্ছে না।’

পাঠ্যপুস্তকের মতো একটি সংবেদনশীল বিষয়ে এমন ভুল কীভাবে হলো এবং এনসিটিবি এর দায় এড়াতে পারে কি না?—এমন প্রশ্নে চেয়ারম্যান বলেন, ‘বইয়ের প্রতিটি পৃষ্ঠার পেছনে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ এবং প্রধান সমন্বয়কারীগণ থাকেন। তারা নিখুঁতভাবে যাচাই-বাছাই করার কথা। কিন্তু এখানে যেহেতু বিষয়টি নজর এড়িয়ে গেছে, তাই এটিকে নিছক অনিচ্ছাকৃত ভুল বা বড়জোর অবহেলা বলা চলে। তবে এটি কোনো উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কি না বা এর পেছনে অন্য কোনো উদ্দেশ্য রয়েছে কি না, তা গভীরভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘এজন্য কারিকুলামসংশ্লিষ্ট সদস্যকে প্রধান করে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। ইতোমধ্যে তদন্ত কাজ শুরু হয়েছে। প্রতিবেদন পাওয়ার পর দায়ীদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

পাঠ্যপুস্তকে প্রাথমিক স্তরের বিভিন্ন শ্রেণির বইয়ে মাত্রাতিরিক্ত নৌকার ছবি বা রাজনৈতিক প্রতীক ব্যবহারের অভিযোগ প্রসঙ্গে এনসিটিবি চেয়ারম্যান জানান, বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর প্রাক-প্রাথমিক থেকে নবম শ্রেণির সকল পাঠ্যপুস্তক পরিমার্জনের জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইইআরের চারজন শিক্ষকের সমন্বয়ে একটি বিশেষজ্ঞ প্যানেল গঠন করে। এবারের পাঠ্যবইয়ে শুধু তথ্য ও তত্ত্বগত পরিমার্জন করা হয়েছে। সাথে বাক্য ও বানান শুদ্ধির দিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে ইলাস্ট্রেশনে কোনো ধরনের পরিবর্তন করা হয়নি। যেহেতু আগের কন্টেন্ট রয়ে গেছে, সেহেতু কন্টেন্ট অনুযায়ী ইলাস্ট্রেশনগুলোও রয়ে গেছে।

বিশেষজ্ঞরা বইয়ের বিষয়বস্তু বা কন্টেন্টের চাহিদার ওপর ভিত্তি করেই ছবিগুলোর সামঞ্জস্য রয়েছে বলে অভিমত দিয়েছিলেন। তাছাড়া আগামী ২০২৮ শিক্ষাবর্ষের জন্য খুব শিগগিরই নতুন শিক্ষাক্রম (কারিকুলাম) প্রণয়নের কাজ শুরু করা হবে—এমনটা বিবেচনায় রেখে ওই সময়ে দ্রুততার সাথে পাঠ্যপুস্তকগুলো পরিমার্জন করা হয়। আর বইয়ে নৌকার ছবি ২০২৫, ২০২৬ সালেও হুবহু ছিল। ২০২৭ সালের তৈরিকৃত বইয়ে নৌকার ছবি নতুন করে যুক্ত হয়নি।

আগামী ২০২৮ সালের কারিকুলামে ব্যাপক পরিমার্জনের মাধ্যমে এসব বিষয় পুরোপুরি সংস্কার করা হবে জানিয়ে চেয়ারম্যান বলেন, তখন আমরা এসব বিতর্কিত বিষয় ও ছবিগুলো সংশোধন করতে পারব। কারণ কারিকুলাম ও বিষয়বস্তু পরিবর্তনের জন্য একটি পদ্ধতিগত ও দীর্ঘমেয়াদি নীতিমালা রয়েছে। খুব শিগগিরই সরকারের নীতিনির্ধারক মহলের সঙ্গে আলোচনা করে পরবর্তী কারিকুলাম সংস্কার ও পরিমার্জনের কাজ ধাপে ধাপে সম্পন্ন করা হবে।

নতুন শিক্ষাবর্ষের বই মুদ্রণের বর্তমান অগ্রগতি তুলে ধরে এনসিটিবি চেয়ারম্যান আরও জানান, ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের জন্য প্রাক-প্রাথমিক থেকে শুরু করে মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত প্রায় ৩১ কোটি পাঠ্যবই ছাপানোর কাজ অত্যন্ত গতিশীল রয়েছে। এর মধ্যে প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক স্তরের মুদ্রণ ও বাঁধাইয়ের কাজ প্রায় শতভাগের কাছাকাছি রয়েছে। আর ইবতেদায়ি ও মাধ্যমিক স্তর মিলে ছাপার অগ্রগতি প্রায় ৫৮ শতাংশের বেশি দাঁড়িয়েছে।

তিনি আরও বলেন, ‘এবার বইয়ের মানের বিষয়ে সরকার অত্যন্ত কঠোর অবস্থানে রয়েছে। দিন ও রাতের যৌথ মনিটরিংয়ের মাধ্যমে গুণগত মান বজায় রাখা হচ্ছে। মানদণ্ড পূরণ না করায় বিভিন্ন প্রেসের সাড়ে ৯ লাখ নিম্নমানের ফর্মা ও ১২ হাজারের মতো বই বাতিল করা হয়েছে।’

প্রফেসর মোহাম্মদ ফখরুল মওলা বলেন, আগামী ৩০ নভেম্বরের মধ্যে শতভাগ মানসম্মত ও নিখুঁত পাঠ্যপুস্তক প্রতিটি উপজেলায় পৌঁছে দিতে এনসিটিবি সম্পূর্ণ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, যাতে বছরের প্রথম দিনেই শিক্ষার্থীরা উৎসবমুখর পরিবেশে ক্লাস শুরু করতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights