অনলাইন ভার্সন খামেনিকে হত্যা নাকি সামরিক ঘাঁটিতে আক্রমণ, কোন পথে হাঁটছেন ট্রাম্প?
অনলাইন ডেস্ক
মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার উত্তেজনা এখন চরম ও ঝুঁকিপূর্ণ মোড় নিচ্ছে প্রতিদিনই।সাম্প্রতিক গোয়েন্দা প্রতিবেদন এবং সমরবিদদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তেহরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাকে পুঁজি করে যুক্তরাষ্ট্র ভিন্নরকম সামরিক পদক্ষেপের কথা ভাবছে।
গত বছরের জুন মাসে ইসরায়েলি যুদ্ধবিমানগুলো যেভাবে ইরানের বিশাল আকাশসীমা বিনা বাধায় অতিক্রম করেছিল এবং ফোরদোর ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক স্থাপনায় মার্কিন বোমা হামলার পথ প্রশস্ত করেছিল, তা ইরানের প্রতিরক্ষা সক্ষমতার দুর্বলতাকে স্পষ্ট করে দিয়েছে।
এমনকি ভেনেজুয়েলার আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে মার্কিন বাহিনী যেভাবে অকেজো করে দিয়েছিল, সেই একই কৌশলের পুনরাবৃত্তি ইরানেও ঘটার সম্ভাবনা দেখছেন বিশ্লেষকরা। তবে এবার আলোচনা কেবল স্থাপনায় হামলার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই বরং খোদ ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে লক্ষ্যবস্তু করার মতো চরম উত্তেজনাকর পরিস্থিতির আভাস পাওয়া যাচ্ছে।
ভারত মহাসাগর থেকে তেহরানের দূরত্ব প্রায় এক হাজার মাইল হওয়ায় কোনো বিশেষ বাহিনীর মাধ্যমে সরাসরি আটকের অভিযান চালানো অত্যন্ত জটিল ও সময়সাপেক্ষ। সমর বিশেষজ্ঞদের মতে, সরাসরি আটকের চেয়ে দূরপাল্লার নিখুঁত লক্ষ্যভেদী ক্ষেপণাস্ত্রের মাধ্যমে গুপ্তহত্যার পথ বেছে নেওয়া পেন্টাগনের জন্য কৌশলগতভাবে সহজ হতে পারে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন পশ্চিমা বিশ্লেষক জানিয়েছেন, এই ধরণের অভিযানে প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো নির্ভুল গোয়েন্দা তথ্য এবং খামেনির ব্যক্তিগত নিরাপত্তা বলয়ের ভেতরে কাউকে নিজেদের পক্ষে টেনে নেওয়া। তবে এমন কোনো পদক্ষেপ হবে আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন এবং এক ভয়াবহ উস্কানি, কারণ যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে ইরানের সাথে কোনো যুদ্ধে লিপ্ত নয় এবং দেশটির পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো বড় হামলার হুমকিও নেই। এই পদক্ষেপের ফলে পুরো অঞ্চলে যে রক্তক্ষয়ী সংঘাত শুরু হতে পারে, তার পরিণতি কারো পক্ষেই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে না।
ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে খামেনির বিকল্প হিসেবে ইতোমধ্যে তিনজনের নাম শোনা গেলেও, তার অনুপস্থিতিতে দেশটির শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়বে কি না তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। দেশটির বর্তমান শাসন কাঠামো এখন পর্যন্ত অত্যন্ত সুসংহত এবং বিক্ষোভ দমনে তারা কঠোর অবস্থান বজায় রেখেছে। তবে সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যু হলে ক্ষমতার লড়াই শুরু হতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে মার্কিন স্বার্থের প্রতিকূলে যাওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
এদিকে তেহরানও হাত গুটিয়ে বসে নেই। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে, তাদের সর্বোচ্চ নেতার ওপর যেকোনো হামলা হবে সরাসরি যুদ্ধ ঘোষণা। ইরানের সবচেয়ে বড় শক্তির জায়গা হলো তাদের মাটির গভীরে সুরক্ষিত ক্ষেপণাস্ত্র নগরীগুলো, যেখানে অন্তত দুই হাজার উচ্চগতির ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র মজুত রয়েছে। হামলা শুরু হলে ইরান যে সর্বাত্মক পাল্টাপাল্টি আক্রমণ শুরু করবে, তা নিশ্চিত।
ইরানের পরবর্তী পদক্ষেপ হিসেবে মার্কিন রণতরী আব্রাহাম লিংকন এবং এর সহযোগী জাহাজগুলো বড় লক্ষ্যবস্তু হতে পারে। যদিও ভারত মহাসাগরের বিস্তীর্ণ জলরাশিতে চলমান রণতরীর সঠিক অবস্থান চিহ্নিত করা ইরানের জন্য কঠিন, তবে পারস্য উপসাগরের কাছাকাছি এলে মার্কিন নৌবহর ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মুখে পড়ার প্রবল ঝুঁকি থাকে। এর পাশাপাশি কাতারের আল-উদেইদ বিমান ঘাঁটির মতো মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলোও ইরানের নিশানায় রয়েছে।
যদিও এসব ঘাঁটিতে অত্যাধুনিক প্যাট্রিয়ট প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েন করা হয়েছে, তবুও গত জুনের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে যে, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও ১৪ শতাংশ ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র লক্ষ্যভেদ করতে সক্ষম হয়েছিল।
এই সংঘাত কেবল দুই দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না বরং উপসাগরীয় দেশগুলোকেও অনিবার্যভাবে টেনে আনবে। ইতোমধ্যে ব্রিটেন তাদের ১২ নম্বর স্কোয়াড্রনকে কাতারের প্রতিরক্ষায় নিয়োজিত করেছে। অন্যদিকে ইরান যদি হরমুজ প্রণালী মাইন পুঁতে বন্ধ করে দেওয়ার চেষ্টা করে, তবে বিশ্ব অর্থনীতিতে নেমে আসবে মহাবিপর্যয়।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একদিকে যেমন বিশাল নৌবহরের শক্তি প্রদর্শন করছেন, অন্যদিকে আবার ইরানের সাথে সমঝোতার ইচ্ছাও প্রকাশ করছেন। তবে হোয়াইট হাউসের এই দোদুল্যমান নীতি এবং তড়িঘড়ি করে কোনো ‘নকআউট’ সিদ্ধান্ত মধ্যপ্রাচ্যকে চিরস্থায়ী অশান্তির দিকে ঠেলে দিতে পারে। সামরিক সক্ষমতা যতই থাক না কেন, ইরানকে মোকাবিলা করা এবং মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা ওয়াশিংটনের জন্য এখন সময়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
সূত্র: গার্ডিয়ান
