অপরিকল্পিত উন্নয়নের খড়গ
মুহাম্মদ সেলিম ও হাসানুর রশীদ, কক্সবাজার থেকে
বছরে হাজার কোটি টাকার বাণিজ্য, কোটি পর্যটকের পদচারণ। অথচ দেশের পর্যটন রাজধানী কক্সবাজার এখন পরিণত হয়েছে একটি ‘টিকিং টাইমবোমা’য়। একদিকে সাগরের বিশালতা, অন্যদিকে অপরিকল্পিত কংক্রিটের জঞ্জাল। ২ হাজারের বেশি হোটেল-রিসোর্টের বেশির ভাগের নেই কেন্দ্রীয় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, ড্রেনেজ সিস্টেম। স্বাধীনতার ৫৫ বছর পেরিয়ে গেলেও মাস্টারপ্ল্যানের অভাবে পর্যটকদের প্রত্যাশা আর প্রাপ্তির মাঝে তৈরি হয়েছে বিস্তর ফারাক। সামান্য বৃষ্টিতেই তলিয়ে যায় পর্যটন জোন। আর ‘টুপটুপ রিসোর্ট’-এর মতো অগ্নিকান্ড বা বড় কোনো ভূমিকম্প ডেকে আনতে পারে স্মরণকালের ভয়াবহ মহাবিপর্যয়। বিশ্বমানের পর্যটন নগরীর আড়ালে লুকিয়ে থাকা অব্যবস্থাপনার চরম খেসারত দিচ্ছে এখন পুরো কক্সবাজার। পর্যটকদের নিরাপত্তা ও শহরের উন্নয়ন প্রসঙ্গে স্থানীয় সংসদ সদস্য লুৎফুর রহমান কাজল বলেন, ‘কক্সবাজারকে সাজানোর জন্য বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, সড়ক নির্মাণ ও সৈকতে নিরাপত্তাসহ নানা উদ্যোগ নিয়ে আলোচনা চলছে। পর্যটনশিল্পের বিকাশে যা যা করণীয়, সবই করা হবে।’ কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সাবেক সভাপতি আবু মোর্শেদ চৌধুরী সতর্ক করে বলেন, ‘৫৫ বছরেও পরিকল্পিত নগরী না হওয়ায় যেভাবে অপরিকল্পিত সম্প্রসারণ হচ্ছে, তাতে আর কয়েক বছর পর এই শহর বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়বে। তাই কক্সবাজাকে রক্ষা করতে দ্রুত উদ্যোগ নিতে হবে।’ অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) তাসনীম জাহান বলেন, ‘যেসব প্রতিষ্ঠানে অগ্নিনিরোধক দরজা নেই, ফায়ার এক্সটিংগুইশার অপর্যাপ্ত এবং ফায়ার সার্ভিসের চূড়ান্ত সনদ নেই, তাদের দ্রুত ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে। অন্যথায় কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’ কক্সবাজার শহরে আড়াই লাখ স্থানীয় বাসিন্দা এবং রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বিশাল চাপের পাশাপাশি যুক্ত হয় কোটি পর্যটকের ভার। অথচ এই ছোট শহরটির সম্প্রসারণ হয়েছে সম্পূর্ণ খেয়ালখুশিমতো। পৌর এলাকার হলিডে মোড় থেকে শুরু করে দক্ষিণে মেরিন ড্রাইভের টেকনাফ সীমান্ত পর্যন্ত ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে উঠেছে ২ হাজারের বেশি হোটেল-মোটেল, গেস্টহাউস ও কটেজ। সৈকত থেকে ৩০০ মিটারের মধ্যে স্থাপনা নির্মাণ নিষিদ্ধ থাকলেও মেরিন ড্রাইভ ঘিরে কটেজের নামে গড়ে উঠেছে অসংখ্য ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনা। সাম্প্রতিক ‘টুপটুপ রিসোর্ট’ অগ্নিকান্ডের পর এসব অপরিকল্পিত কটেজগুলো পর্যটকদের জন্য বড় আতঙ্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে। হাজার কোটি টাকার ব্যবসা হলেও কক্সবাজারের পরিবেশ রক্ষায় নেই কোনো সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ। হোটেল-মোটেলগুলোর নেই নিজস্ব কোনো সুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট। পুরো শহরে প্রতিদিন প্রায় ২০০ টন পয়োবর্জ্য তৈরি হয়, অথচ পৌর প্রশাসনের সংরক্ষণ সক্ষমতা মাত্র ২০ টন। নালার মাধ্যমে বাকি বিপুল পরিমাণ বর্জ্যরে শেষ গন্তব্য হচ্ছে নদী ও সাগর। সুগন্ধা পয়েন্ট বা কলাতলী থেকে হলিডে মোড়- সব খানে ময়লার স্তূপ। কউকের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন বলেন, ‘২০২৬ সালের মধ্যে কক্সবাজারকে আন্তর্জাতিক পর্যটন হাবে রূপান্তরের সমন্বিত মাস্টারপ্ল্যান চূড়ান্ত করার লক্ষ্য রয়েছে। এটি সম্পন্ন হলে যেখানে-সেখানে স্থাপনা নির্মাণ বন্ধসহ এআইভিত্তিক ব্র্যান্ডিং এবং পর্যটকদের ডিজিটাল ট্র্যাকিং সম্ভব হবে।’ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের কক্সবাজারের উপপরিচালক সৈয়দ মুহাম্মদ মোরশেদ জানান, শহরে কতটি আবাসন প্রতিষ্ঠান রয়েছে তার সঠিক পরিসংখ্যানই কারও কাছে নেই। কক্সবাজার পৌরসভার প্রধান নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয় সূত্রও নিশ্চিত করেছে যে, ঝুঁকিপূর্ণ ভবন নিয়ে কোনো জরিপ হয়নি। এ বিষয়ে কক্সবাজার পৌরসভার প্রশাসক মো. শামীম আল ইমরান জানান, ড্রেনেজ ব্যবস্থা সংস্কার ও জলাবদ্ধতা নিরসনে কাজ চলছে। দ্রুতই সমস্যার সমাধান হবে।
