অযত্নে ম্লান ইতিহাসের দুর্লভ নিদর্শন
আবদুর রহমান টুলু, বগুড়া
জাদুঘরে রাখা বেশির ভাগ নিদর্শনই দুর্লভ। কিছু রয়েছে যিশুখ্রিস্টের জন্মেরও বহু বছর আগের। এদিকে তালাবদ্ধ গুদামে পড়ে থাকা নিদর্শনগুলো প্রদর্শনীর উদ্যোগের কথা জানিয়েছেন কর্মকর্তারা। জাদুঘরে ঘুরতে আসা দর্শনার্থীরা জানান, ঐতিহাসিক এসব নিদর্শন তুলে ধরা হলে আরও সমৃদ্ধ হবে বগুড়ার এই জাদুঘরের সংগ্রহশালা
৬০ বছর আগে নির্মিত বগুড়ার ঐতিহাসিক মহাস্থানগড় জাদুঘরে ৪৪টি শোকেসে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন রাখার পর্যাপ্ত ধারণক্ষমতা নেই। ১৯৩৬ সালের পর থেকে বিভিন্ন সময় খননে পাওয়া গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শনগুলোর মধ্যে ৮৪৫টি প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন জাদুঘরে থাকলেও মৌর্য, গুপ্ত, পাল, সেন এবং মুসলিম শাসকদের আমলসহ অন্যান্য সময়ের আরও সাড়ে ৩ হাজার নিদর্শন অযত্নে-অবহেলায় পড়ে আছে জাদুঘরটির গুদামে। এ ছাড়াও ১৯৯০ সালের পর থেকে ফ্রান্স ও বাংলাদেশের যৌথ খননে পাওয়া অনেক গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন পড়ে আছে অন্য আরেকটি গুদামে। তবে জাদুঘরে রাখা বেশির ভাগ নিদর্শনই দুর্লভ। কিছু রয়েছে যিশুখ্রিস্টের জন্মেরও বহু বছর আগের। এদিকে তালাবদ্ধ গুদামে পড়ে থাকা নিদর্শনগুলো প্রদর্শনীর উদ্যোগের কথা জানিয়েছেন কর্মকর্তারা। জাদুঘরে ঘুরতে আসা দর্শনার্থীরা জানান, ঐতিহাসিক এসব নিদর্শন তুলে ধরা হলে আরও সমৃদ্ধ হবে বগুড়ার এই জাদুঘরের সংগ্রহশালা। জানা গেছে, মহাস্থান প্রত্নতাত্ত্বিক এলাকা খননে বিভিন্ন সময়ে উঠে এসেছে প্রাচীন রাজা-সুলতানদের সময়কার পাথর, মাটি, ধাতব বস্তু ও নানা গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। মহাস্থান প্রত্নতাত্ত্বিক জাদুঘরটি প্রায় আড়াই হাজার বছরের ইতিহাসের এক অনন্য নিদর্শন। ১৯৬৭ সালে প্রতিষ্ঠিত এই জাদুঘরে মৌর্য, গুপ্ত, পাল ও মুসলিম আমলের বহু প্রত্নতাত্ত্বিক সামগ্রী সংরক্ষিত আছে। জাদুঘরে মহাস্থানগড় ও আশপাশের অঞ্চল থেকে সংগ্রহ করা অসংখ্য প্রত্নবস্তুর নমুনা রয়েছে। ২০০৭ সালে দেশের বিভিন্ন জাদুঘরের গুরুত্বপূর্ণ প্রত্ননিদর্শন ফ্রান্সে প্রদর্শনীর জন্য পাঠানো হয়। এর মধ্যে মহাস্থান জাদুঘরের অন্তত ৪৭টি মূল্যবান প্রত্নসম্পদ ছিল। তৎকালীন সময়ে ফ্রান্সের গিমে জাদুঘরে প্রদর্শনীর জন্য সেদেশের দূতাবাস সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠায়। পরে এ বিষয়ে একটি কমিটি গঠন করা হয় এবং প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর, জাতীয় জাদুঘর ও বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘরের সঙ্গে ফ্রান্সের তিনটি পৃথক চুক্তি স্বাক্ষর হয়। ২০০৭ সালের ১৮ নভেম্বর সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সচিবের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় প্রত্ননিদর্শন পাঠানোর বিষয়ে চূড়ান্ত সম্মতি দেওয়া হয়। তবে প্রদর্শনীর দ্বিতীয় ধাপে একটি মূর্তি বিমানবন্দরে হারিয়ে যাওয়ার ঘটনায় পুরো প্রক্রিয়ায় জটিলতা তৈরি হয়। এরপর ফ্রান্সের সঙ্গে প্রদর্শনী চুক্তি বাতিল করা হয় এবং প্রত্ননিদর্শনগুলো দেশে ফিরিয়ে আনা হয়। এসব নিদর্শনের ঐতিহাসিক ও প্রত্নমূল্য হাজার কোটি টাকার হতে পারে। তবে দেশে ফেরার পর এসব প্রত্নসম্পদ আদৌ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়েছিল কি না, তার কোনো সুস্পষ্ট তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না। ফেরত আসা নিদর্শনের মধ্যে মাত্র দুই-তিনটি জাদুঘরে প্রদর্শনের জন্য রাখা হলেও অধিকাংশই দীর্ঘদিন ধরে স্টোররুমে পড়ে রয়েছে। এ নিয়ে এখন স্থানীয়দের মধ্যে নানা প্রশ্ন ও সন্দেহ তৈরি হয়েছে। বিষয়টি তদন্তে শিবগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জিয়াউল ইসলামকে প্রধান করে ৯ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। গত ১১ মে শিবগঞ্জ উপজেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় বিষয়টি নতুন করে উঠে আসে। বিষয়টির গুরুত্ব ও সংবেদনশীলতা বিবেচনায় তদন্ত কমিটির কার্যকাল আরও ১৫ কার্যদিবস বৃদ্ধি করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম জানান, মহাস্থানগড় দেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্য। মূর্তিগুলোর সত্যতা নিরূপণে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি টিম এনে মূর্তিগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
