অর্থনীতির অনিশ্চয়তা কেটে গেছে

আলী রিয়াজ
অগ্রণী ব্যাংক পিএলসির চেয়ারম্যান অর্থনীতিবিদ জায়েদ বখ্ত বলেছেন, অর্থনীতির সব অনিশ্চয়তা কেটে গেছে। অচিরেই আমরা দেশের সামনে সব খাতে বড় ধরনের প্রবৃদ্ধি দেখতে পাব। অর্থবছর শেষে দেশের প্রবৃদ্ধি নিয়ে যে সংকট তা পুরোপুরি কেটে যাবে। সাধারণ মানুষের জন্য স্বস্তিকর অর্থনীতি আমরা দেখতে পাব। বাংলাদেশ প্রতিদিনের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে তিনি অর্থনীতি ও ব্যাংকিং নিয়ে কথা বলেন।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান তথা বিআইডিএসের অন্যতম অর্থনীতিবিদ জায়েদ বখ্ত বলেন, বাংলাদেশের গত কয়েক মাস ধরে বড় যে সংকট আমাদের সামনে ছিল তার মধ্যে অন্যতম ডলার সংকট, ব্যাংকিং সমস্যা এবং মূল্যস্ফীতি। রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে কিছু অনিশ্চয়তা কাজ করেছে। সরকার অনেক কিছুতে ঠিকমতো মনোযোগ দিতে পারেনি। বিপরীতে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে বিনিয়োগ, বাণিজ্য কিছুটা থমকে ছিল। যার কারণে মূল্যস্ফীতি সহনশীল পর্যায়ে থাকেনি। ডলার সংকটও কাটেনি। নির্বাচনের পরই সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করছে দ্রুত। ফলে তখন যেসব পদক্ষেপ ধীরগতিতে চলেছে তার গতিও বাড়বে। গত বছর মূল্যস্ফীতি দেশের সাধারণ মানুষের জীবনযাপনের খরচ বাড়িয়ে দেয়। একই সময়ে ছিল ডলার সংকটও। চাহিদা অনুযায়ী এলসি খুলতে পারেনি ব্যাংকগুলো। আমদানি বাণিজ্যে নানা রকম বিধিনিষেধ দিতে হয়েছে। উদ্যোক্তাদের জন্য বড় সমস্যা হিসেবে দেখা দেয় বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট। এতে উৎপাদন কমে। অর্থাৎ সামষ্টিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের চাপের মধ্য দিয়েই নতুন বছর শুরু হয়েছে। অগ্রণী ব্যাংক চেয়ারম্যান বলেন, নতুন বছরে মূল্যস্ফীতি কমানো, ডলারের সংকট মোকাবিলা এবং আর্থিক খাতের নিম্নমূখী সূচক কাটানো বড় চ্যালেঞ্জ। আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে কিছু পরিবর্তন হচ্ছে। ফলে আমাদের দেশের অর্থনীতিতে কিছুটা গতির সঞ্চার হবে। এ মুহূর্তে আন্তর্জাতিক বাজারে ডলারের যে পরিস্থিতি, তা অন্যান্য মুদ্রার (ডলার) মূল্যের তুলনায় একটু নিচের দিকেই রয়েছে। এতে বিশ্ব অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতির হারও কমে এসেছে। সুতরাং বিশ্ব অর্থনীতি স্থিতিশীল হলে তার প্রভাব আমাদের অর্থনীতিতে পড়বে। বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম পড়তে শুরু করায় মূল্যস্ফীতি নিম্নমুখী। এর সঙ্গে বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি কমে আসার প্রবণতা নতুন বছরে দেশের অর্থনীতিতেও প্রভাব ফেলবে। আর্থিক খাতে সংস্কারের অগ্রগতি পুরনো অস্থিরতা কাটিয়ে সূচকগুলোকে ভালো অবস্থানে নিয়ে যাবে। বাংলাদেশ এর সুফল পাবে। অর্থনীতিবিদ জায়েদ বখ্ত আরও বলেন, আরেকটি বিষয় হলো আমাদের নির্বাচন নিয়ে জল্পনাকল্পনার কারণে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড স্থবির ছিল। এখন নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে হয়ে গেছে। সরকারের সফলতার জন্য মূল্যস্ফীতি কমানো, মুদ্রার বিনিময় হার বাজারমুখী করা, বৈদেশিক মুদ্রার জোগান বা রিজার্ভ ব্যবস্থাপনায় বেশি জোর দেওয়াসহ ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতে সংস্কার করতে হবে। তিনি বলেন, দ্রব্যমূল্য, ডলারের রেট নিয়ন্ত্রণসহ আর্থিক খাতে সংস্কারে আরও জোর দিতে হবে। এসবের পাশাপাশি আইএমএফের নির্দেশনা পরিপালন করাও বড় চ্যালেঞ্জ হবে। প্রথম দিকে হয়তো মূল্যস্ফীতির হার আরেকটু বাড়তে পারে কিন্তু তা সাময়িক। পরে দ্রুত সময়ের মধ্যে তা কমে আসবে। বিনিময় হার বাজারমুখী হলে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপও কমে আসবে। এটি রেমিট্যান্স ও রপ্তানি আয় বাড়াতে ভূমিকা রাখবে। তাই বলা যায়, নতুন বছরে বাজারমুখী মুদ্রানীতি ডলার সংকটে সুফল বয়ে নিয়ে আসবে। এই অর্থনীতিবিদ বলেন, নির্বাচনের কারণে দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগকারীরা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেছে। এখন সরকারের যেসব পদক্ষেপ ধীরগতিতে চলছে সেসবের গতিও বাড়বে। নির্বাচনের পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে গেছে। সবাই বিনিয়োগে এগিয়ে আসবেন। এতে অর্থনীতিতে গতি সঞ্চার হবে। উৎপাদনশীল কোনো খাতে আমাদের কোনো বিপর্যয় হয়নি। আমরা যদি স্থিতিশীলতা ও বৈদেশিক অর্ডারগুলো ফিরিয়ে আনতে পারি, তাহলে আমাদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সাত শতাংশের ওপরে যাবে। মুদ্রা বিনিময় হার বাজারমূল্যের কাছাকাছি নিয়ে এলে মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ পড়বে। সেটি সামাল দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে দুটি পথ রয়েছে। একটি হলো আমদানিতে কিছু কর প্রত্যাহার করা আরেকটি হলো যারা দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করে, তাদের জন্য ন্যায্যমূল্যে পণ্য সরবরাহ করা। মূলকথা হলো দ্রব্যমূল্য ও ডলারের রেট নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। পাশাপাশি আইএমএফের যে নির্দেশনা, তা পরিপালন করা বড় চ্যালেঞ্জ বলে আমি মনে করি। বিশিষ্ট এই গবেষক বলেন, সামষ্টিক অর্থনীতিতে শিল্প উৎপাদন বাড়বে, কৃষি উৎপাদন ঠিক আছে। এ বছরও কৃষিপণ্যের উৎপাদন ভালো হয়েছে। সেবা খাতে বড় বিনিয়োগ হবে। সামষ্টিকভাবে অর্থনীতির প্রধান খাতগুলোই চাঙা থাকবে। যার প্রভাবে আমাদের অর্থনীতি অর্থবছর শেষেই বড় ধরনের বাক নেবে। রিজার্ভ নিয়ে যে সংকট আমরা মোকাবিলা করছি তা তুলনামূলক কেটে যাবে। ব্যাংকিং ক্ষেত্রে সমস্যা কিছুটা কমে যাবে। কারণ বাজারে যে উৎপাদন ব্যবস্থায় কিছুটা ঘাটতি ছিল সেটা স্বাভাবিক হলে ব্যাংক ব্যবস্থায়ও গতি ফিরে আসবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights