অলাভজনক মডেল থেকে বহুমুখী চিকিৎসা কেন্দ্র: জিয়া হার্ট ফাউন্ডেশনের ৩০ বছর

আব্দুস সালাম, দিনাজপুর প্রতিনিধি :

তিন দশক আগে দিনাজপুর শহরের মুন্সিপাড়ায় একটি ভাড়া বাসায় যাত্রা শুরু করেছিল জিয়া হার্ট ফাউন্ডেশন। সময়ের সঙ্গে পরিধি বেড়ে এটি বর্তমানে একটি বহুমুখী চিকিৎসাসেবা ও স্বাস্থ্যশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে রূপ নিয়েছে। নিজস্ব অর্থায়ন, স্থানীয় অনুদান ও অলাভজনক মডেলে পরিচালিত এই চিকিৎসাকেন্দ্রে প্রতিদিন উত্তরাঞ্চলসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তের রোগীরা সেবা নিতে আসেন।
অসংক্রামক রোগ মোকাবিলা ও হৃদরোগ চিকিৎসায় সহায়তার লক্ষ্য নিয়ে ১৯৯২ সালে তৎকালীন মন্ত্রী বেগম খুরশিদ জাহান হক এই উদ্যোগ নেন। ১৯৯৩ সালে মুন্সিপাড়ার একটি ভাড়া বাসায় কার্যক্রম শুরু হলেও ১৯৯৪ সালে শহরের হাউজিং এস্টেট এলাকায় জমি কিনে নিজস্ব ভবন নির্মাণ করা হয়।
৫০ শয্যা নিয়ে শুরু করা হাসপাতালটি বর্তমানে ৩৫০ শয্যায় উন্নীত হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে একটি ২১ সদস্যের কার্যনির্বাহী কমিটির অধীনে পরিচালিত হয়। এখানে কর্মরত আছেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও মেডিকেল অফিসারসহ ১৫২ জন স্বাস্থ্যকর্মী এবং ১৫০ জন তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মী।
প্রতিষ্ঠানটির প্রশাসনিক তথ্য ও রেজিস্টার অনুযায়ী হাসপাতালের দৈনিক কার্যক্রম ও চিকিৎসা পরিসংখ্যানে দেখা যায়:
বহির্বিভাগ: প্রতিদিন গড়ে ৩০০ থেকে ৩৫০ জন রোগী সেবা নেন (অধিকাংশই হৃদরোগী)।
জরুরি বিভাগ: প্রতিদিন অর্ধশতাধিক রোগী আসেন।
ইনডোর/ভর্তি: নিয়মিত শতাধিক রোগী ভর্তি থাকেন (যার মধ্যে গড়ে ৩০ জন হৃদরোগী)।
অস্ত্রোপচার: দৈনিক গড়ে ১৫টির বেশি সার্জারি সম্পন্ন হয়।
হৃদরোগ চিকিৎসার অংশ হিসেবে ওপেন হার্ট সার্জারি, রিং পরানো ও পেসমেকার স্থাপনের সুবিধা রয়েছে। এ ছাড়া অন্যান্য বিভাগের মধ্যে নিউরো মেডিসিন, নিউরো সার্জারি, জেনারেল সার্জারি, অর্থোপেডিক, গাইনি, ডায়ালিসিস, ফিজিওথেরাপি ও ক্যানসার চিকিৎসা সুবিধা চালু রয়েছে। একই সাথে প্যাথলজি, সিটি স্ক্যান, ইকো ও ইটিটিসহ বিভিন্ন ডায়াগনস্টিক সুবিধাও এখানে বিদ্যমান।
হাসপাতাল কতৃপক্ষের তথ্যমতে, অসচ্ছল রোগীদের চিকিৎসা ব্যয় কমাতে বিশেষ ছাড় এবং জাকাত ফান্ডের ব্যবস্থা রয়েছে।
২০১০ সালে জাকাত ফান্ডটি গঠন করা হয়। স্থানীয় ও প্রবাসী দাতাদের অনুদানে এটি পরিচালিত হয়।
আবেদনের ভিত্তি ও আর্থিক অবস্থা বিবেচনা করে রোগীদের ৫ হাজার থেকে ৩৫ হাজার টাকা পর্যন্ত অনুদান দেওয়া হয়।
জাকাত ফান্ড শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ৫ হাজার রোগী আর্থিক সহায়তা পেয়েছেন। সর্বশেষ অর্থবছরে ৩২৭ জন রোগীকে মোট প্রায় ২৫ লাখ টাকা সহায়তা প্রদান করা হয়েছে।
জিয়া হার্ট ফাউন্ডেশন চত্বরে একাধিক সহযোগী ও স্বাস্থ্যশিক্ষামূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে: ১. কেয়ার স্পেশালাইজড হাসপাতাল: ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতাল। ২. দিনাজপুর কেয়ার নার্সিং কলেজ: ২০১০ সালে ৫০ জন শিক্ষার্থী নিয়ে যাত্রা শুরু করে। বর্তমানে এখানে বিএসসি ও ডিপ্লোমা নার্সিংয়ের ৪টি কোর্স চালু রয়েছে এবং এমএসসি কোর্স প্রক্রিয়াধীন। প্রতিষ্ঠাতা কর্তৃপক্ষের মতে, এ পর্যন্ত প্রায় দেড় হাজার শিক্ষার্থী এখান থেকে ডিগ্রি সম্পন্ন করে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন হাসপাতালে কর্মরত আছেন। ৩.মোজাম্মেল হক ইনস্টিটিউট অব কিডনি ডিজিজেস এবং খুরশিদ জাহান হক ইনস্টিটিউট অব ক্যানসার রিসার্চ অ্যান্ড হাসপাতাল। এ ছাড়া ‘ইম্পেরিয়াল মেডিকেল কলেজ’ ও ‘কেয়ার মেডিকেল টেকনোলজি ইনস্টিটিউট’ নামে দুটি প্রস্তাবিত প্রকল্প প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির সাধারণ সম্পাদক এ কে এম আজাদ জানান, দীর্ঘ দিন প্রতিষ্ঠানটি সরকারি অনুদান থেকে বঞ্চিত ছিল এবং স্থানীয় অনুদান ও নিজস্ব আয়ে পরিচালিত হয়ে আসছিল। তবে সম্প্রতি প্রতিষ্ঠানটির সেবা কার্যক্রম সম্প্রসারণের লক্ষ্যে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে ৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যা দিয়ে ভবিষ্যতে সেবার মান ও অবকাঠামো আরও বৃদ্ধির পরিকল্পনা করা হচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights