অস্তিত্বসংকটে রাজশাহীর ২১ নদনদী
কাজী শাহেদ, রাজশাহী
রাজশাহী শহরের গা ঘেঁষে বয়ে গেছে পদ্মা নদী। নদীর তীরে অবস্থিত ‘লালন শাহ মুক্তমঞ্চ’-এর সামনে অবৈধভাবে গড়ে তোলা হয়েছে শতাধিক স্থায়ী ও অস্থায়ী দোকান। জেলার প্রায় ৫০টি স্থানে একই পরিস্থিতি। মহানগর এলাকার সমস্ত বর্জ্য ও পয়োনিষ্কাশনের পানি বারনই নদীর মাধ্যমে পবা উপজেলার সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ছে, যা ফসল উৎপাদনে ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে। দখল-দূষণ আর মূল নদীর সঙ্গে সংযোগ না থাকায় ধুঁকছে রাজশাহীর ২১টি নদনদী। দুই পাড় দখল ও দীর্ঘদিন থেকে নদী খনন না করায় বেশির ভাগ নদনদী মৃত প্রায় হয়ে পড়েছে। দখলদারদের তালিকা হলেও এসব অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা যায়নি। রাজশাহীর ২১টি নদীর মধ্যে বেশির ভাগ নদী মৃতপ্রায়। নদীগুলো হলো-নারদ, সন্ধ্যা, স্বরমঙ্গলা, দয়া, বারাহী, হোজা ও মুসা খান। এ ছাড়া রাজশাহীর বারনই, বাগমারার ফকিরনীসহ বাকি নদীগুলোর নেই কোনো পানি প্রবাহ। সবকটি নদীর উৎসমুখ রাজশাহীতে। নগরীর তালাইমারী এলাকায় ছিল স্বরমঙ্গলা নদীর উৎসমুখ। খরস্রোতা এ নদীটি মহানগরীর কাজলা-জামালপুর ও নামোভদ্রা এলাকা দিয়ে প্রবাহিত হতো। নদীটি রাজশাহীর পবা এলাকার ললিতাহার, ভালুকপুকুর, রামচন্দ্রপুর হয়ে ফলিয়ার বিলে গিয়ে পতিত হয়। এখন নদী বলে এর আর কোনো পরিচয় নেই। বারাহী নদীর উৎসমুখ রাজশাহী মহানগরীর ফুদকিপাড়া মহল্লায় পদ্মা থেকে। মহানগরীর ভিতর দিয়ে বয়ে যাওয়া তিনটি নদীর এটি অন্যতম। নদীটি পবা থানার মহানন্দখালী গ্রামে বারনই নদীতে গিয়ে পড়েছে। উৎস থেকে প্রথম পাঁচ কিলোমিটারে নদীর কোনো অস্তিত্ব নেই। ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ এ নদীটির বাকি অংশটুকুও মৃত। দয়া নদীটি স্বরমঙ্গলা নদীর একটি শাখা। নদীটি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পশ্চিম দেয়াল বরাবর উত্তর দিকে বয়ে গেছে। এখনো বিশ্ববিদ্যালয়ের পশ্চিম দেয়ালের পাশে তাকালে নদীর রেখা বোঝা যায়। রেললাইনের উত্তর পাশে দয়া নদীর খাতটি এখনো বেশ স্পষ্ট। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ খনন করে এটি একটি পুকুরের আকৃতি তৈরি করেছে। নদীটি রাজশাহীর মেহেরচণ্ডী, খড়খড়ি বাজার, কুখণ্ডী, বামন শিকড়, মল্লিকপুর, তেবাড়িয়া, সারাংপুর হয়ে ঘোলহারিয়া গ্রামে আবার স্বরমঙ্গলার সঙ্গে মিলিত হয়ে ফলিয়ার বিলে পতিত হয়। ফলিয়ার বিল থেকে স্বরমঙ্গলা এবং দয়া নদীর সম্মিলিত প্রবাহটি হোজা নাম ধারণ করে রাজশাহীর দুর্গাপুর থানার পলাশবাড়ী গ্রামের মধ্য দিয়ে পূর্বমুখী প্রবাহ পথে তিন কিলোমিটার বয়ে যায়। এরপর উত্তরমুখী হয়ে বর্ধনপুর, চৌপুকুরিয়া, সিংগা, দুর্গাপুর, পানানগর, দমদমা, চকপলাশী, গাঙধোপাপাড়া, গ্রগোহালি, গোবিন্দনগর হয়ে পুঠিয়ার কানাইপাড়ার মধ্য দিয়ে মুসা খান নদীতে পতিত হয়েছে। এ নদীর দমদমা থেকে কানাইপাড়া পর্যন্ত দীর্ঘ ৯ কিলোমিটার এলাকার প্রবাহ পথটি প্রায় সম্পূর্ণরূপে বেদখল হয়ে গেছে।
নারদ ঐতিহাসিক নদ। এর মোট তিনটি প্রবাহ। বর্তমানে এর উৎসমুখসহ প্রায় ১৫ কিলোমিটার অংশ সম্পূর্ণ বেদখল হয়ে ফসলি মাঠ ও বিভিন্ন স্থাপনা নির্মিত হয়েছে। বাকি অংশ এখনো নদীর আদলে মৃতপ্রায়। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) রাজশাহী জেলা শাখার সভাপতি জামাত খান বলেন, ‘সরকারি-বেসরকারি নানা উদ্যোগে নদী দখল হয়েছে। এখনো হচ্ছে। যেন দেখার কেউ নেই।’ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আরিফুল ইসলাম অঙ্কুর বলেন, ‘যে নদীগুলো এখনো দৃশ্যমান সেগুলো রক্ষায় আমরা কাজ করছি।’
