আদানির সাথে চুক্তিটি সঠিক হয়নি : জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. তামিম

অনলাইন ডেস্ক

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. ম. তামিম বলেছেন, রাজনীতিবিদ, আমলা ও ব্যবসায়ী এই তিন পক্ষের যোগসাজশেই জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে দুর্নীতি হয়েছে। আওয়ামী লীগের শাসন আমলে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিনিময় ছাড়া কোনো বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপিত হয়নি। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ও পিএম অফিসের একক ক্ষমতার কারণেই এসব দুনীর্তির বিস্তার হয়েছে। ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ করা হলে দুনীর্তি কমানো সম্ভব।

ড. ম. তামিম বলেন, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) দেশের সবচেয়ে অস্বচ্ছ একটি প্রতিষ্ঠান। এই অস্বচ্ছতার পিছনে বিগত সরকারের স্বার্থ জড়িত ছিল। লস দেখিয়ে দেখিয়ে উচ্চমূল্য নির্ধারণের জন্যই প্রতিষ্ঠানটিকে অস্বচ্ছ রাখা হতো। বর্তমান সরকার এসেও এখন পর্যন্ত প্রক্রিয়াটিকে স্বচ্ছ করতে পারেনি। তিন দিনের মধ্যে কোনো আলাপ আলোচনা ছাড়াই তড়িঘড়ি করে আদানির সাথে বিদ্যুৎ চুক্তি করা হয়। আদানির সঙ্গে চুক্তিটি অসম। এক্ষেত্রে শতভাগ ক্যাপাসিটি চার্জ পেমেন্টের পরেও ৪০ ভাগ আরো অতিরিক্ত বিদ্যুতের মূল্য দিতে হয়। এই চুক্তিটি পুনঃবিবেচনা করা দরকার।

তিনি আরো বলেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে মাফিয়াদের আইনের আওতায় না আনলে মাফিয়াতন্ত্র দমন হবে না। জবাবদিহিতাকে এড়ানোর জন্য বিগত সরকার গণশুনানির পরিবর্তে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের মাধ্যমে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দাম নির্ধারণ করতো, যা ছিল অস্বচ্ছ।

শনিবার রাজধানীর এফডিসিতে বিগত সরকারের আমলে জ্বালানি ও বিদ্যুতখাতের দুনীর্তি নিয়ে আয়োজিত এক ছায়া সংসদে প্রধান অতিথির বক্তব্যে ড. ম. তামিম এসব কথা বলেন।

ছায়া সংসদটির আয়োজন করে ডিবেট ফর ডেমোক্রেসি। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ডিবেট ফর ডেমোক্রেসির চেয়ারম্যান হাসান আহমেদ চৌধুরী কিরণ।

সভাপতির বক্তব্যে হাসান আহমেদ চৌধুরী কিরণ বলেন, ডাকাতরা বাংলাদেশে আর্থিক খাতের মত জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতেও অনিয়ম, দুর্নীতি ও লুটপাটের স্বর্গরাজ্যে পরিণত করেছিল। লুটেরাদের সুযোগ করে দিতে ২০১০ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বিতর্কিত ইনডেমনিটি আইন পাস করেছিল, যার মেয়াদ দফায় দফায় বাড়িয়ে দুর্নীতির ক্ষেত্র তৈরি করা হয়েছিল। বিদ্যুৎ উৎপাদন ছাড়াও বিতরণ, সঞ্চালন ও মিটার কেনাকাটার নামে হাজার হাজার কোটি টাকার প্রকল্প নেয়া হয়েছিল। যাতে ব্যাপক দুর্নীতি ও অনিয়মের তথ্য মিলেছে।

তিনি আরো বলেন, আমাদের বিদ্যুৎ উৎপাদনে সক্ষমতা ও চাহিদা কতটুকু তার কোনো সঠিক হিসাব নেই। গত সাড়ে ১৫ বছরে কোনো দরপত্র ছাড়াই বেসরকারি খাতে শতাধিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়েছে। যার বেশিরভাগই কোনো কাজে আসেনি। বিগত সরকার সঞ্চালন ও বিতরণ লাইন না করেই বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করেছে। ফলে যতটুকু বিদ্যুৎ উৎপাদন হতো তা সঞ্চালন লাইনের অভাবে বিতরণ সম্ভব হতো না। তাই বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে কোটি কোটি টাকা লুটপাট হওয়া স্বত্ত্বেও লোডশেডিং থেকে আমাদের মুক্তি মিলেনি।

ডিবেট ফর ডেমোক্রেসির চেয়ারম্যান বলেন, শতভাগ জনগোষ্ঠীকে বিদ্যুতের আওতায় আনা হয়েছে বলে বিগত সরকার মানুষকে মিথ্যা গল্প শুনিয়েছে। ফেরি করে বিদ্যুৎ দেওয়ার কথা বলা হলেও বিদ্যুতের ফেরিওয়ালারা এখন জেলে অথবা পলাতক। বিদ্যুতের এমন মিটার বসিয়েছে বাতি না জ্বললেও মিটার ঘোরে। প্রিপেইড মিটারে রিচার্জ করার সাথে সাথে এক চতুর্থাংশ টাকা মিটার খেয়ে ফেলে। শিল্প কারখানাগুলোতে গ্যাসের পাইপে গ্যাসের পরিবর্তে বাতাস দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। আদানির সঙ্গে বিদ্যুৎ কেনার চুক্তিটি সম্পূর্ণ একপাক্ষিক ও দেশবিরোধী। এতে বাংলাদেশের স্বার্থ সুরক্ষিত হয়নি। জনগণকে পাশকাটিয়ে গোপনীয় ভাবে আদানি গ্রুপের সাথে এই চুক্তি স্বাক্ষর করা হয়। চুক্তি স্বাক্ষরকারী তৎকালীন বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান চুক্তির কপি না দেখেই স্বাক্ষর করেছেন বলে জানা গেছে।

কিরণ বলেন, আদানির সাথে বিদ্যুৎ চুক্তি স্বাক্ষরকারী তৎকালীন পিডিবি চেয়ারম্যানকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে জানা যাবে কোন প্রেক্ষিতে কাদের চাপে তিনি চুক্তিপত্র না দেখেই এতে স্বাক্ষর করেছেন। অন্তবর্তীকালীন সরকার আদানির সাথে বিদ্যুৎ কেনার চুক্তিটি প্রকাশ করলে মানুষের মধ্যে বিষয়টি পরিষ্কার হবে। তবে যেহেতু ভারত থেকে এই বিদ্যুৎ কেনায় বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষিত হয়নি, তাই সরকার এই চুক্তি বাতিলের ব্যাপারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে পারে।

কিরণ আরো বলেন, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদনের পূর্বেই আমরা শুনেছি এই পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে ৫০০ কোটি ডলার আত্মসাৎ করার অভিযোগ উঠেছে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় ও ভাগনি টিউলিপ সিদ্দিকির বিরুদ্ধে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের পরিবেশগত ঝুঁকি ও দুর্ঘটনার শঙ্কা কখনোই বিবেচনায় আনা হয়নি। এই কেন্দ্রের পারমাণবিক বর্জ্য কিভাবে ধ্বংস বা সংরক্ষণ করা হবে তাও দেশবাসী জানে না। অথচ এই সকল পারমাণবিক বর্জ্য শত শত বছর রেডিয়েশন ছড়াতে পারে। বিদ্যুতের আরো দুই শ্বেতহস্তী হচ্ছে রামপাল ও মাতারবাড়ী বিদ্যুৎ কেন্দ্র। সুন্দরবনে সম্ভাব্য ক্ষতির আশঙ্কা থাকার পরেও ভারতের কঠিন শর্তের ঋণে রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়েছে। এই বিদ্যুৎ কেন্দ্র পরিচালনায় ভারতীয় কর্মকর্তাদের দাপটে পিডিবি কর্মকর্তারা কোণঠাসা থাকেন। রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি বাণিজ্যিক উৎপাদনে আসার পর কারিগরি ত্রুটি লেগেই রয়েছে। উৎপাদন শুরু হওয়ার পর এই পর্যন্ত বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি ৭ থেকে ৮ বার বন্ধ হয়েছে।

ডিবেট ফর ডেমোক্রেসি’র আয়োজনে ‘জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের দুর্নীতির জন্য বিগত সরকারের রাজনীতিবিদ অপেক্ষা আমলারাই বেশি দায়ী’ শীর্ষক ছায়া সংসদে আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি-বাংলাদেশ এর বিতার্কিকদের পরাজিত করে ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির বিতার্কিকরা বিজয়ী হয়।

প্রতিযোগিতায় বিচারক ছিলেন অধ্যাপক আবু মোহাম্মদ রইস, সাংবাদিক শাহনাজ বেগম, ড. তাজুল ইসলাম চৌধুরী তুহিন, সাংবাদিক রফিকুল বাসার, সাংবাদিক রিশান নসরুল্লাহ।

প্রতিযোগিতা শেষে অংশগ্রহণকারী দলকে ট্রফি, ক্রেস্ট ও সনদপত্র প্রদান করা হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights