আবারও অস্থির রোহিঙ্গা ক্যাম্প

মুহাম্মদ সেলিম, চট্টগ্রাম ও হাসানুর রশিদ, কক্সবাজার

রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্প পরিণত হয়েছে ‘মৃত্যু উপত্যকায়’। চলছে নিখুঁত ‘টার্গেট কিলিং’। মাদকের কোটি টাকার ট্রানজিট, চাঁদাবাজি আর ব্লকে ব্লকে একচ্ছত্র ‘অপারেশনাল কমান্ড’ প্রতিষ্ঠার রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ে গত তিন বছরেই প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ৫০ জন রোহিঙ্গা নেতা, হেড মাঝি ও সাব-মাঝি। সাতটি সশস্ত্র গোষ্ঠী এবং ৪০টি ডাকাত বাহিনীর ত্রাসের রাজত্বে পরিণত হওয়া এ ক্যাম্পগুলোতে এখন যাঁরা মিয়ানমারে প্রত্যাবাসন বা সাধারণ মানুষের অধিকারের পক্ষে কথা বলছেন, তাঁদেরও পরিকল্পিতভাবে চিরতরে স্তব্ধ করে দেওয়া হচ্ছে।

এপিবিএন-১৪-এর অধিনায়ক মোহাম্মদ সিরাজ আমিন বলেন, ‘সশস্ত্র বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে অভ্যন্তরীণ বিরোধ চলছে। এ কারণে খুনাখুনি বাড়ছে। আধিপত্য বিস্তার বন্ধ করতে পারলে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।’ নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর (অব.) এমদাদুল ইসলামের মতে ‘অর্থনৈতিক স্বার্থ ও আধিপত্য বিস্তার কেন্দ্র করে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোয় টার্গেট কিলিং হচ্ছে। এ হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে রয়েছে ক্যাম্পে সক্রিয় সশস্ত্র গোষ্ঠী ও বাহিনীগুলো। যত দিন হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় না আনা হবে, তত দিন বন্ধ হবে না ক্যাম্পে টার্গেট কিলিং।’

আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর তথ্যানুযায়ী, গত তিন বছরে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোয় খুনের ঘটনা গাণিতিক হারে কমলেও বেড়েছে টার্গেট কিলিংয়ের সংখ্যা। তিন বছরে টার্গেট কিলিংয়ের শিকার হয়েছেন অন্তত ৫০ রোহিঙ্গা নেতা, হেড মাঝি ও সাব-মাঝি। চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে ৩৪টি ক্যাম্পে খুন হয়েছেন অন্তত ছয়জন। ২০২৫ সালে খুন হন ৩৫ জন, ২০২৪ সালে ৪৯ জন, ২০২৩ সালে ৬৬ জন, ২০১৭ সালের আগস্ট থেকে ২০২২ সালের অক্টোবর পর্যন্ত ১২৪ জন।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, উখিয়া ও টেকনাফ উপজেলার ৩৪টি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সাতটি সশস্ত্র গোষ্ঠী এবং ছোটবড় ৪০টি ডাকাত গ্রুপ সক্রিয়। সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে রয়েছে আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি (আরসা), আরাকান রোহিঙ্গা আর্মি (এআরএ), রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশন (আরএসও), আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন অর্গানাইজেশন (এআরএসও), আরাকান রোহিঙ্গা লিবারেশন আর্মি, কোম্পানি গ্রুপ ও ইসলামী মাহাজ। এ ছাড়া অন্তত ৪০টি ডাকাত গ্রুপ রয়েছে ক্যাম্পগুলোয়। এর মধ্যে মাস্টার মুন্না বাহিনী, জাবু ডাকাত বাহিনী, চাকমা ডাকাত বাহিনী, নবী হোসেন ডাকাত বাহিনী, পুতিয়া ডাকাত বাহিনী, সালমান শাহ ডাকাত বাহিনী এবং খালেক ডাকাত বাহিনী ক্যাম্পে সবচেয়ে বেশি সক্রিয়। এসব গোষ্ঠী ও বাহিনীর কোন্দলের জেরে গত তিন বছরে অর্ধশতাধিক রোহিঙ্গা নেতা, হেড মাঝি ও সাব-মাঝি খুন হয়েছেন।

বাংলাদেশ প্রতিদিনের অনুসন্ধানে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে টার্গেট কিলিংয়ের কয়েকটি কারণ উঠে এসেছে। যেমন ক্যাম্পের প্রতিটি ব্লকে নিজেদের একচ্ছত্র ‘অপারেশনাল কমান্ড’ প্রতিষ্ঠা করতে চায় সশস্ত্র গ্রুপগুলো। নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে এবং সাধারণ রোহিঙ্গাদের ওপর একচ্ছত্র আধিপত্য বজায় রাখতে প্রতিপক্ষের সদস্যদের টার্গেট করে হত্যা করা হচ্ছে। ক্যাম্পের ভিতরে সশস্ত্র গ্রুপগুলোর শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের অংশ হিসেবেও রাতে কিংবা ভোরে প্রতিপক্ষের আস্তানায় বা বসতঘরে চালানো হচ্ছে অতর্কিত হামলা। সশস্ত্র গ্রুপগুলো চায় না ক্যাম্পের সাধারণ মানুষ তাদের বিরুদ্ধে কথা বলুক বা আন্তর্জাতিক মহলের কাছে তাদের অপরাধের চিত্র তুলে ধরুক। যারা মিয়ানমারে শান্তিপূর্ণ প্রত্যাবাসনের পক্ষে কথা বলেন বা রোহিঙ্গাদের অধিকার নিয়ে আন্তর্জাতিক ফোরামে সোচ্চার, তাদের পরিকল্পিতভাবে স্তব্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। ক্যাম্পের ভিতরে গড়ে ওঠা সিভিল সোসাইটি বা সাধারণ শিক্ষকদেরও টার্গেট করা হচ্ছে; যাতে নতুন প্রজন্ম সচেতন না হতে পারে এবং সশস্ত্র গ্রুপগুলো সহজেই তরুণদের রিক্রুট করতে পারে। ক্যাম্পের প্রশাসনিক কাঠামোর সবচেয়ে নিচের কিন্তু প্রভাবশালী স্তর হলো হেড মাঝি বা সাব-মাঝি। মাঝিদের হাতে রেশন বণ্টন থেকে শুরু করে ক্যাম্পের অনেক অভ্যন্তরীণ বিষয়ের নিয়ন্ত্রণ থাকে। সশস্ত্র গ্রুপগুলো নিজেদের অনুগত লোকদের মাঝি হিসেবে বসাতে চায়। কোনো মাঝি যদি তাদের কথা শুনতে অস্বীকৃতি জানায় বা অন্য গ্রুপের প্রতি সহানুভূতিশীল হয়, তবে তাকে টার্গেট করা হচ্ছে। মিয়ানমার থেকে আসা ইয়াবা ও ক্রিস্টাল মেথের (আইস) ট্রানজিট রুট হিসেবে ক্যাম্পগুলো ব্যবহার করা হচ্ছে। এই কোটি টাকার বাণিজ্যের একক নিয়ন্ত্রণ নিতে সশস্ত্র গ্রুপগুলোর মধ্যে তীব্র লড়াই চলছে। ক্যাম্পের ভিতরে দোকানপাট, বাজার এবং সাধারণ রোহিঙ্গাদের কাছ থেকে নিয়মিত চাঁদা আদায় করা হয়। ব্লকের নিয়ন্ত্রণ যার হাতে, চাঁদাবাজির নেটওয়ার্কও তার। এ নেটওয়ার্ক হাতছাড়া হওয়ার ভয়ে বা নতুন করে দখল নেওয়ার চেষ্টায় চলছে টার্গেট কিলিং।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights