দীর্ঘ হচ্ছে হামে মৃত্যুর মিছিল

জয়শ্রী ভাদুড়ী

হামের উপসর্গ নিয়ে দেশে আরও ১৬ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। হামের উপসর্গ নিয়ে এটি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ মৃত্যু। এর আগে গত ৪ মে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে ১৭ শিশুর মৃত্যু দেখেছিল দেশ। এ নিয়ে হাম ও হামের উপসর্গে ৫২৮ শিশু মারা গেল।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সময়মতো ব্যাপক টিকাদান, রোগী শনাক্তকরণ, চিকিৎসা নির্দেশিকা, অক্সিজেনসহ জরুরি সেবা নিশ্চিত করা গেলে এত মৃত্যু এড়ানো সম্ভব ছিল। তাঁরা বলছেন, শুধু টিকাদান বাড়ালেই হবে না, একই সঙ্গে শিশুদের পুষ্টি, দ্রুত চিকিৎসা, অক্সিজেন সাপোর্ট এবং স্থানীয় পর্যায়ে নজরদারি জোরদার করতে হবে। কারণ এটি দেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার দুর্বলতাকেও স্পষ্ট করে তুলেছে। দেশে এর আগে সর্বোচ্চ হাম রোগী শনাক্ত হয়েছিল ২০০৫ সালে, তখন আক্রান্ত ছিল ২৫ হাজার ৯৩৪ জন। এরপর টিকাদান কর্মসূচির কারণে সংক্রমণ অনেক কমে আসে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশে মাত্র ১৩২ জন রোগী শনাক্ত হয়েছিল। তার আগের পাঁচ বছরে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ২ হাজার ৪১০, ২০৩, ৩১১, ২৮১ ও ২৪৭। কিন্তু ২০২৬ সালে এসে পরিস্থিতি পুরোপুরি বদলে গেছে। কিন্তু এর আগে কখনোই হামের রোগীর সংখ্যা ৫০ হাজার ছাড়ায়নি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহযোগিতায় দেশে হামের নজরদারি কার্যক্রম পরিচালিত হয়। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালে দেশে হামে একজনের মৃত্যু হয়েছিল। ২০১৭ সালে ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের ১০ শিশুর মৃত্যু হয়। ২০১৮ সালে আরও ছয় শিশুর মৃত্যু হলেও তাদের নমুনা সংগ্রহ করা যায়নি। সর্বশেষ ২০২০ সালে বান্দরবানে সাত শিশুর মৃত্যু হয়েছিল। তবে এবারের মতো এত ব্যাপক মৃত্যু ও সংক্রমণের নজির আগে দেখা যায়নি। গতকাল স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাম বিষয়ক নিয়মিত প্রতিবেদনে জানানো হয়, গত ২৪ ঘণ্টায় (গত শনিবার সকাল ৮টা থেকে গতকাল সকাল ৮টা) হামের উপসর্গে ঢাকায় ১০, রাজশাহীতে এক, সিলেটে এক, বরিশালে এক, ময়মনসিংহে দুই ও রংপুরে একজন মারা গেছে। এ সময়ে সারা দেশে হাম ও হামের উপসর্গে আক্রান্ত হয়েছে ১ হাজার ৪৩৪ জন। গত ১৫ মার্চ থেকে হামের উপসর্গে দেশে ৪৪২ শিশুর মৃত্যুর তথ্য জানা গেছে। এ সময়ে হাম শনাক্তের পর মারা গেছে ৮৬ শিশু। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত হামের উপসর্গ দেখা দিয়েছে ৬৩ হাজার ৮১৩ শিশুর। এ সময় হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৫০ হাজার ৫৫৮ শিশু। তবে এর মধ্যে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ৪৬ হাজার ২১৪ শিশু বাড়ি ফিরেছে। বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞ ডা. জিয়াউল হক বলেন, হাম অত্যন্ত সংক্রামক হলেও দ্রুত চিকিৎসা শুরু করা গেলে ৯৯ শতাংশ রোগী সুস্থ হয়ে ওঠে। কিন্তু নিউমোনিয়া, শ্বাসকষ্ট দ্রুত শনাক্ত করা না গেলে মৃত্যুঝুঁকি বেড়ে যায়। প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী ডা. এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার বলেন, যেসব শিশু মারা যাচ্ছে, তাদের বড় অংশ অপুষ্টিতে ভুগছিল। মায়েদের পুষ্টিহীনতাও শিশুদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে। ফলে হাম ও এর জটিলতা মারাত্মক আকার নিচ্ছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় এখন হামের টিকার বয়সসীমা ৯ মাস থেকে কমিয়ে ছয় মাস করা হয়েছে। যেসব শিশু আগে দুই ডোজ টিকা পেয়েছে, তাদেরও ক্যাম্পেইনের আওতায় টিকা নিতে আহ্বান জানানো হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সতর্ক করেছে, টিকাদানের হার কমে যাওয়ায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আবার হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিচ্ছে। ভারত, পাকিস্তান, ইয়েমেন, ইন্দোনেশিয়া, কাজাখস্তান, সুদান, ক্যামেরুনসহ বিভিন্ন দেশে সংক্রমণ বাড়লেও মৃত্যুর সংখ্যার কারণে বাংলাদেশ নিয়ে বিশেষ উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে দেশব্যাপী হাম-রুবেলা টিকাদান ক্যাম্পেইন শুরু করেছে সরকার। এ পর্যন্ত এক কোটি ৮৩ লাখের বেশি শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে, যা লক্ষ্যমাত্রার ১০২ শতাংশ। সরকার ৮৩ দশমিক ৬ মিলিয়ন ডলার মূল্যের টিকা সংগ্রহ করেছে। ইউনিসেফ অতিরিক্ত ২ কোটি ৬০ লাখ ডোজ টিকা ও এক কোটি ৭৫ লাখ সিরিঞ্জ সরবরাহ করেছে। বিভিন্ন হাসপাতালে অস্থায়ী ট্রায়াজ ও আইসোলেশন ইউনিট চালু করা হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জাতীয় চিকিৎসা নির্দেশিকা তৈরির জন্য বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করেছে। ইউনিসেফের সহায়তায় ১৫টি অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত হাসপাতালে চিকিৎসক, নার্স ও জরুরি সেবা বাড়ানো হয়েছে। তিনটি হাসপাতালে শিশু আইসিইউ স্থাপনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা মাঠপর্যায়ে নজরদারি ও ল্যাব সক্ষমতা বাড়াতে কাজ করছে। আট লাখের বেশি শিশুর বাড়ি বাড়ি গিয়ে টিকাদান অবস্থা যাচাই করা হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights