আবার কেন বিশ্বজুড়ে পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্র তৈরির জয়জয়কার?

অনলাইন ডেস্ক

ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা, তীব্র জ্বালানি সংকট, জলবায়ু পরিবর্তনের ধাক্কা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)-এর অভাবনীয় প্রসারের কারণে বিশ্বজুড়ে পারমাণবিক শক্তির এক অভাবনীয় পুনরুত্থান ঘটছে। গত শতকের সাড়াজাগানো দুর্ঘটনাগুলোর পর যেখানে এই প্রযুক্তি থমকে গিয়েছিল, সেখানে বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ও জ্বালানি বাস্তবতা পরমাণু শক্তিকে আবারও আলোচনার মূল কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে।

আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে ৩১টি দেশে চার শতাধিক পারমাণবিক রিয়্যাক্টর চালু রয়েছে, যা বৈশ্বিক বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় ৯ শতাংশ মেটাচ্ছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এ খাতে নতুন করে বিনিয়োগ ও প্রকল্প সম্প্রসারণের যে ঢেউ উঠেছে, তা আগামী দশকগুলোতে পারমাণবিক বিদ্যুতের অংশ বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো।

এই পুনর্জাগরণের পেছনে কাজ করছে কতগুলো বড় ধরনের বৈশ্বিক নিয়ামক। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে ইউরোপের প্রাকৃতিক গ্যাসের বাজার অস্থির হয়ে ওঠা এবং মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সামরিক সংকটের কারণে আন্তর্জাতিক জ্বালানি তেল ও গ্যাসের বাজারে মারাত্মক অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এ ধরনের অনিশ্চয়তা এড়াতে ও নিজেদের বিদ্যুৎ খাতকে সুরক্ষিত রাখতে এশিয়া ও ইউরোপের বহু দেশ নিরবচ্ছিন্ন এবং স্বাবলম্বী জ্বালানি উৎস হিসেবে পরমাণু শক্তির দিকে ঝুঁকে পড়ছে।

একই সঙ্গে, চরম ভাবাপন্ন আবহাওয়া, খরা ও তাপমাত্রা বৃদ্ধির মোকাবিলায় কার্বন নিঃসরণ কমানোর বৈশ্বিক তাগিদও এই পুনরুত্থান ত্বরান্বিত করছে। সৌর বা বায়ু শক্তির মতো নবায়নযোগ্য উৎসগুলো আবহাওয়ার ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় ২৪ ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ (বেসলোড পাওয়ার) সরবরাহ করা তাদের পক্ষে সবসময় সম্ভব হয় না। সে জায়গায় পারমাণবিক শক্তি কোনো ধরনের গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন ছাড়াই বছরের পর বছর অবিরত বিদ্যুৎ জুগিয়ে যেতে পারে।

পারমাণবিক শক্তির চাহিদার পেছনে নতুন করে যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তি খাতের অভূতপূর্ব প্রসার, বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) বিকাশ। বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা এআই ডেটা সেন্টারগুলো বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ খরচ করছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার তথ্যানুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে বিদ্যুৎ চাহিদার একটা বড় অংশজুড়েই রয়েছে এসব ডেটা সেন্টার। ফলে আমাজন, গুগল, মেটা ও মাইক্রোসফটের মতো টেক জায়ান্টগুলো তাদের পরিবেশবান্ধব ও স্থিতিশীল বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে পারমাণবিক শক্তি চুক্তিতে স্বাক্ষর করছে।

বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের মতো পরাশক্তি যেমন তাদের উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনা করেছে, তেমনি চীন একক দেশ হিসেবে বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে বেশি নতুন রিয়্যাক্টর তৈরি করছে। ইউরোপে ফ্রান্স ঐতিহাসিকভাবেই তাদের মোট বিদ্যুতের সিংহভাগ পারমাণবিক উৎস থেকে তৈরি করে, আর হাঙ্গেরি ও স্লোভাকিয়ার মতো দেশগুলোও এই শক্তিনির্ভরতা বাড়াচ্ছে। পাশাপাশি, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সৌদি আরবের বেসামরিক পারমাণবিক চুক্তি সাক্ষরের মতো ঘটনা ভূ-রাজনীতিতে পরমাণু শক্তির গুরুত্বকে নতুন মাত্রায় নিয়ে গেছে।

তবে এই জোয়ারের সমান্তরালে রয়েছে মারাত্মক কিছু চ্যালেঞ্জ ও উদ্বেগ। দীর্ঘমেয়াদী তেজস্ক্রিয় বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সমাধান এখনো অনেক দেশে অনিশ্চিত। বেসামরিক পরমাণু কর্মসূচির আড়ালে পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তারের ঝুঁকি নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে। তাছাড়া, যুদ্ধবিধ্বস্ত বা সংকটপূর্ণ অঞ্চলের কাছে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও বড় একটি উদ্বেগের বিষয়।

নতুন পারমাণবিক কেন্দ্র স্থাপনের আকাশচুম্বী খরচ ও দীর্ঘ সময়সীমা এই পুনর্জাগরণের সামনে সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক প্রতিবন্ধকতা। নতুন প্রযুক্তির স্মল মডুলার রিয়্যাক্টর (এসএমআর) এবং নতুন কৌশলগত নীতি যদি কম খরচে দ্রুত বিদ্যুৎ কেন্দ্রে রূপ নিতে না পারে, তবে পরমাণু শক্তির এই উজ্জ্বল সম্ভাবনা আবার অর্থনৈতিক জটিলতায় ঢাকা পড়তে পারে বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা।

সূত্র: কাউন্সিল অব ফরেইন রিলেশন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights