আবার কেন শুরু হলো যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত?

অনলাইন ডেস্ক

কয়েক সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি ও শান্তি আলোচনার মধ্যেই আবারও সামরিক সংঘাতে জড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। বুধবার ভোরে ইরানের ৮০টিরও বেশি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে বিমান হামলা চালিয়েছে মার্কিন বাহিনী। এ ঘটনার পর দুই দেশের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। এর জেরে মধ্যপ্রাচ্যে আরেকটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে এবং অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে চলমান শান্তি আলোচনা।

হামলার পর তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারায় ন্যাটো সম্মেলনে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, ইরানের সঙ্গে হওয়া সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) কার্যত শেষ হয়ে গেছে বলে তিনি মনে করেন। যদিও আলোচকরা চাইলে আলোচনা চালিয়ে যেতে পারেন, ব্যক্তিগতভাবে তিনি এটিকে ‘সময়ের অপচয়’ বলে মন্তব্য করেন। একই সঙ্গে ইরানের নেতৃত্বের বিরুদ্ধে কড়া ভাষায় সমালোচনাও করেন তিনি।

ট্রাম্পের এই বক্তব্যের পর আন্তর্জাতিক বাজারে তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়ে। ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ৬ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৭৮ ডলারে পৌঁছে যায়। ইউরোপের শেয়ারবাজারে ১ দশমিক ৬ শতাংশ দরপতন হয়, শক্তিশালী হয় মার্কিন ডলার এবং সরকারি বন্ডের ফলনও বেড়ে যায়।

কেন আবার সংঘাত শুরু হলো?
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী তিনটি বাণিজ্যিক জাহাজে ইরানের হামলার জবাব হিসেবেই এই সামরিক অভিযান চালানো হয়েছে।

ওয়াশিংটনের দাবি, মার্শাল দ্বীপপুঞ্জের পতাকাবাহী এমটি আল-রেকাইয়াত, সৌদি আরবের এমটি ওয়েদিয়ান এবং লাইবেরিয়ার এমটি সাইপ্রাস প্রসপারিটি নামের তিনটি জাহাজে ইরানি বাহিনী হামলা চালায়।

ইরানের নির্দেশনা অনুযায়ী, সব জাহাজকে হরমুজ প্রণালীতে তাদের নির্ধারিত নিরাপদ রুট অনুসরণ করতে বলা হয়েছিল। স্থানীয় গণমাধ্যমের দাবি, ওই জাহাজগুলো ইরানি বাহিনীর সতর্কবার্তা উপেক্ষা করে নির্ধারিত পথ পরিবর্তন করেনি।

এরপরই যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, উপকূলীয় রাডার, কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল নেটওয়ার্ক, জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা এবং ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-এর ৬০টির বেশি ছোট নৌযান লক্ষ্য করে হামলা চালায়।

সেন্টকম সতর্ক করে বলেছে, ইরান যদি সমঝোতা লঙ্ঘন অব্যাহত রাখে, তাহলে আরও সামরিক অভিযান চালানো হবে।

অন্যদিকে তেহরানভিত্তিক বিশ্লেষক হোসেইন রয়ভারানের দাবি, জাহাজগুলো সম্ভবত এমন এলাকায় প্রবেশ করেছিল যেখানে ইরানি বাহিনী সমুদ্রে পাতা মাইন অপসারণের কাজ করছিল। ফলে নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হওয়ায় উত্তেজনা সৃষ্টি হয়।

কোথায় কোথায় হামলা হয়েছে?
ইরানের বিভিন্ন গণমাধ্যম জানিয়েছে, দক্ষিণাঞ্চলের সিরিক বন্দরে একাধিক বিস্ফোরণ হয়েছে। বাণিজ্যিক ও মাছ ধরার জেটিতে গোলাবর্ষণের ঘটনায় কয়েকজন আহত হয়েছেন।

এছাড়া হরমুজ প্রণালীর কৌশলগত কেশম দ্বীপ, বন্দর আব্বাসের আশপাশ এবং বুশেহর প্রদেশের দুটি সামরিক ঘাঁটিতেও হামলা চালানো হয়েছে।

বুশেহর প্রদেশের দাশতি কাউন্টি ও চোগাদাক এলাকার দুটি সামরিক ঘাঁটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে প্রাদেশিক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। তবে তাৎক্ষণিকভাবে প্রাণহানির খবর পাওয়া যায়নি।

নতুন করে নিষেধাজ্ঞা
সামরিক অভিযানের পাশাপাশি ইরানের তেল রফতানির ওপর পুনরায় নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র।

গত ১৭ জুন স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের আওতায় ইরানকে ৬০ দিনের জন্য তেল রফতানির পূর্ণ ছাড় দেওয়া হয়েছিল, যা ২১ আগস্ট পর্যন্ত কার্যকর থাকার কথা ছিল।

কিন্তু নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ৭ জুলাই থেকে নতুন তেল বিক্রির ক্ষেত্রে সেই ছাড় বাতিল করা হয়েছে। যদিও ইতোমধ্যে রফতানির পথে থাকা চালানগুলোর জন্য সীমিত সময়ের অবকাশ রাখা হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই সিদ্ধান্ত ইরানের অর্থনীতিতে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করবে, কারণ দেশটির বৈদেশিক আয়ের প্রধান উৎসই তেল ও পেট্রোকেমিক্যাল পণ্য রফতানি।

ইরানের পাল্টা জবাব
হামলার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আইআরজিসি জানায়, তারা বাহরাইন ও কুয়েতে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের ৮৫টি সামরিক স্থাপনায় পাল্টা হামলা চালিয়েছে।

তাদের দাবি, বাহরাইনের পঞ্চম মার্কিন নৌঘাঁটি, পোর্ট সালমান এবং কুয়েতের আলি সালেম বিমানঘাঁটিসহ বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা হয়েছে। পাশাপাশি একটি মার্কিন এমকিউ-৯ ড্রোনও ভূপাতিত করার দাবি করেছে তারা।

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যুক্তরাষ্ট্রের হামলাকে জাতিসংঘ সনদের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন এবং যুদ্ধবিরতি চুক্তির পরিপন্থী বলে উল্লেখ করেছে।

তেহরান আরও বলেছে, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক আগ্রাসনের উৎস যেখানেই হোক, তা লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হবে এবং দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এদিকে ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের হামলা, নতুন নিষেধাজ্ঞা এবং লেবাননে ইসরায়েলের অব্যাহত অভিযান- সবই সমঝোতা স্মারকের গুরুতর লঙ্ঘন।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচিও বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপ যুদ্ধ-পরবর্তী সমঝোতার মৌলিক ভিত্তিকেই কার্যত অকার্যকর করে দিয়েছে।

শান্তি আলোচনা কি ভেঙে গেল?
পরিস্থিতি এখন অত্যন্ত অনিশ্চিত। মাত্র তিন সপ্তাহ আগে স্বাক্ষরিত ৬০ দিনের সমঝোতা স্মারকের মাধ্যমে যুদ্ধ বন্ধ করে শান্তি আলোচনা শুরু হয়েছিল। ওই চুক্তি অনুযায়ী ইরান হরমুজ প্রণালীতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক রাখবে এবং যুক্তরাষ্ট্র ইরানের তেল রফতানির ওপর নিষেধাজ্ঞায় সাময়িক ছাড় দেবে।

কিন্তু চলমান আলোচনার মধ্যেই এটি তৃতীয়বারের মতো যুক্তরাষ্ট্রের বড় ধরনের সামরিক হামলা। ইরানের অভিযোগ, এমন পদক্ষেপ দুই দেশের মধ্যে বিশ্বাসের ভিত্তি নষ্ট করে দিয়েছে।

অন্যদিকে ট্রাম্পের বক্তব্য পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে সমঝোতা বাতিলের ঘোষণা দেওয়া হয়নি, তবে তা কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে বলে ধারণা করছেন পর্যবেক্ষকরা।

আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
ন্যাটোর মহাসচিব মার্ক রুটে যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপকে সমর্থন জানিয়ে বলেছেন, বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার পর ওয়াশিংটনের প্রতিক্রিয়া ছিল যৌক্তিক।

অন্যদিকে উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের (জিসিসি) মহাসচিব জাসেম মোহাম্মদ আলবুদাইউই ইরানের পাল্টা হামলাকে বাহরাইন ও কুয়েতের সার্বভৌমত্বের গুরুতর লঙ্ঘন বলে উল্লেখ করেছেন।

কুয়েত, ওমান, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং মিসরও ইরানের হামলার নিন্দা জানিয়ে উত্তেজনা কমাতে সংলাপ ও কূটনৈতিক উদ্যোগ অব্যাহত রাখার আহ্বান জানিয়েছে।

এরপর কী?
বিশ্লেষকদের মতে, উভয় পক্ষই আপাতত সীমিত পরিসরে শক্তি প্রদর্শনের চেষ্টা করছে। যুক্তরাষ্ট্র হামলার লক্ষ্য নির্ধারণে সংযত থেকেছে, অন্যদিকে ইরানও পাল্টা প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে রাজনৈতিক বার্তা দিতে চেয়েছে।

তবে ট্রাম্পের বক্তব্য এবং নতুন নিষেধাজ্ঞা পরিস্থিতিকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে। ফলে শান্তি আলোচনা টিকে থাকবে নাকি মধ্যপ্রাচ্য আবারও বড় ধরনের যুদ্ধের দিকে এগোবে- সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। সূত্র: আল-জাজিরা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights