আমি তোমার কথা বলবো কাকে?

অনলাইন ডেস্ক

আমি তোমার কথা বলবো কাকে? প্রশ্নটা রোনালদো নিজেকে করতেই পারেন। কারণ, তার ভেতরে যে তুমি ঘুরে বেড়ায়, সেই তুমি যা চায়, তার কথা এই মুহূর্তে কাউকেই বলতে পারছেন না এই কিংবদন্তি। সবাই তাকে সাজাচ্ছে নানা ব্যাখ্যায়। আর সেই বাছবিচারে রোনালদোর মাহাত্ম্য হয়ে পড়ছে নগণ্য, বড় হয়ে উঠছে ধাতব ট্রফি। আর এই আলোচক কিংবা সমালোচকরা সবকিছু মাপতে চান কেবল শিরোপার নিক্তিতেই।

সে যাইহোক, ফুটবল বিশ্বের অন্যতম মহাতারকা ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর জন্য যেন একটি যুগের অবসান ঘটল। বিশ্বকাপের মঞ্চ থেকে পর্তুগালের বিদায়ের সাথে সাথেই সম্ভবত জাতীয় দলের জার্সি গায়ে শেষবারের মতো মাঠে নেমেছিলেন এই কিংবদন্তি। স্পেনের কাছে পরাজয়ের পর চোখের জলে মাঠ ছাড়ার দৃশ্যটি শুধু পর্তুগালের সমর্থকদেরই নয়, কাঁদিয়েছে পুরো ফুটবল বিশ্বকে।

টুর্নামেন্টজুড়ে মোটামুটি দাপট দেখানো স্পেনের কাছে হেরে শিরোপার স্বপ্ন অধরাই রয়ে গেল রোনালদোর। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে প্রায় সবকিছু জেতা রোনালদোর সাফল্যের ঝুলি থেকে কেবল বিশ্বকাপ ট্রফিটিই দূরে থেকে গেল।

ফুটবল মাঝে মাঝে বড় নিষ্ঠুর। মাঠের সেরা খেলোয়াড় বা ইতিহাসের অন্যতম সেরা মহাতারকা হয়েও যে সবসময় বিশ্বকাপ জয় করা সম্ভব হয় না, রোনালদোর বিদায় তারই প্রমাণ। তবে পরাজয়ের পর রোনালদোর দৃষ্টিভঙ্গি ছিল অনেকের ধারণার চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। বিশ্বকাপের মঞ্চে ব্যর্থতাকে তিনি আরব্য রজনীর কোনো পরাজয় হিসেবে দেখেননি। সমর্থকদের অনেকেই হয়তো মনে করেন, লিওনেল মেসির সাথে দীর্ঘদিনের দ্বৈরথে পিছিয়ে থাকার হতাশায় রোনালদো ভারাক্রান্ত, কিন্তু বাস্তবে পরিস্থিতি ভিন্ন।

রোনালদো জানিয়েছেন, ক্যারিয়ারের এই পর্যায়ে এসে তার আর নতুন করে প্রমাণ করার কিছু নেই। তিনি নিজের অর্জনে তৃপ্ত এবং ফুটবলের প্রতি তার যে আজন্ম ভালোবাসা, তা থেকেই তিনি এই দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়েছেন।

ফুটবল একটি দলীয় খেলা, আর কোনো খেলোয়াড়ই এককভাবে পুরো দলের ভাগ্য বদলে দিতে পারেন না। রোনালদোকে অনেক সময় ব্যক্তিকেন্দ্রিক মনে করা হলেও, ইতিহাসের পাতায় অমর হয়ে থাকার পেছনে দলের সম্মিলিত প্রচেষ্টাই বড় ভূমিকা রেখেছে। পর্তুগাল দল সবসময়ই বিশ্বমঞ্চে লড়াই করার মতো শক্তিশালী ছিল, কিন্তু চূড়ান্ত সাফল্যের জন্য যে নিখুঁত সমীকরণ প্রয়োজন, তা যেন শেষ পর্যন্ত তাদের পক্ষে আসেনি। শুধু বিশ্বকাপের অভাবকে মাপকাঠি ধরে রোনালদোর পুরো ক্যারিয়ারকে বিচার করাটা হবে চরম অবিচার।

ম্যাচ শেষে রোনালদোর সেই কান্নার কারণ কি তবে বিশ্বকাপ না জেতার হতাশা ছিল? অনেকেই মনে করছেন, সেটি হয়তো কোনো ট্রফি জেতার আকাঙ্ক্ষা বা মেসির চেয়ে নিজেকে এগিয়ে রাখার জেদ ছিল না; বরং শৈশবের সেই স্বপ্নের বিদায় নেওয়া, যা পৃথিবীর প্রতিটি ফুটবলার বড় বড় চোখ নিয়ে দেখে। বিশ্বের শ্রেষ্ঠ খেলোয়াড়দের ক্যারিয়ারেও অনেক সময় অপূর্ণতা থেকে যায়, আর রোনালদোর ক্ষেত্রে সেই অপূর্ণতা হয়তো বিশ্বকাপ ট্রফি হয়েই রয়ে গেল। তবে সাফল্যের পাহাড় গড়ে তোলা এই ফুটবলার এখন এক পরম শান্তিতেই বিদায় নিচ্ছেন, কারণ তিনি জানেন, ফুটবলকে তিনি নিজের সর্বোচ্চটাই উজাড় করে দিয়েছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights