আলোচনায় ২৫ কোটি টাকা

নিজস্ব প্রতিবেদক ও কুমিল্লা প্রতিনিধি

কুমিল্লা জেলা পরিষদের রাজস্ব তহবিল থেকে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া ১৫ কোটি এবং হাসনাত আবদুল্লাহ ১০ কোটি টাকা নিয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন পরিষদের প্রশাসক মো. মোস্তাক মিয়া।

গত শনিবার দুপুরে কুমিল্লা শিল্পকলা একাডেমিতে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ৪৫তম শাহাদাতবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভা ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন। এরপরই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ বিভিন্ন মহলে এই ২৫ কোটি টাকা নিয়ে আলোচনার ঝড় ওঠে। যদিও এ বিষয়ে এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া বলেন, কুমিল্লার প্রশাসক প্রথমত একেবারেই কাঁচা একটা মিথ্যা কথা বলেছেন। রাজস্ব খাত থেকে কারও এলাকায় কোনো ধরনের বরাদ্দ নিয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। এটা মূলত এডিপির বিশেষ বরাদ্দ। তো উনি এটাকে রাজস্ব খাতের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলেছেন।

কুমিল্লা জেলা পরিষদের প্রশাসকের বক্তব্যের জবাব দিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতা হাসনাত আবদুল্লাহ। কুমিল্লা-৪ আসনের (দেবিদ্বার) এই সংসদ সদস্য বলেছেন, জেলা পরিষদের প্রশাসক যে টাকার কথা বলেছেন, সেটি উপজেলার জন্য বাজেট বরাদ্দ। সে টাকা তাকে দেওয়া হয়নি।

যা বলেছেন প্রশাসক : কুমিল্লা জেলা পরিষদের প্রশাসক মো. মোস্তাক মিয়া বলেছেন, আগের যে অন্তর্বর্তী সরকার তাদের একটি চরিত্র ছিল। তারা সমন্বয়ের নামে লুটপাট করেছে। আমার জেলা পরিষদ থেকে মুরাদনগরের আসিফ মাহমুদ ১৫ কোটি টাকা নিয়ে গেছেন। তিনি আমাদের নিজস্ব রাজস্বের টাকা ১৫ কোটি টাকা নিয়ে গেছেন। আরেকজন হাসনাত আবদুল্লাহ। তিনি নিয়ে গেছেন ১০ কোটি টাকা। এটা হলো সমন্বয়ের অবস্থা। তারা চেয়েছিলেন যে, বাংলাদেশে বৈষম্যবিরোধী একটা সমন্বয়ের রাজনীতি, কিন্তু তাদের মধ্যে সেটা ছিল না।

কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা ও মহানগর বিএনপি এই কর্মসূচির আয়োজন করে। মোস্তাক মিয়া বিএনপির কুমিল্লা বিভাগীয় সহসাংগঠনিকের পদে রয়েছেন। অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া বর্তমানে এনসিপির মুখপাত্র এবং হাসনাত আবদুল্লাহ দলের দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠকের পাশাপাশি কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য। বক্তব্যের বিষয়ে জানতে চাইলে মোস্তাক মিয়া বলেন, আমি বলছি না ওই টাকা তারা ব্যক্তিগতভাবে নিয়েছেন। তারা দুজনই নিজেদের উপজেলায় বিশেষ বরাদ্দ বা উন্নয়ন বরাদ্দের নামে বিপুল পরিমাণ ওই টাকা নিয়ে অন্য উপজেলাগুলোকে বঞ্চিত করেছেন। আমার বক্তব্যের মাধমে সেটি বোঝাতে চেয়েছি। কারণ আসিফ মাহমুদ আর হাসনাত আবদুল্লাহ বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন করেছিলেন। কিন্তু তারাই অন্তর্র্বর্তী সরকারের সময় বিশেষ বরাদ্দ নিয়ে বাকি ১৫টি উপজেলাকে বঞ্চিত করেছেন। এই কারণে অন্য উপজেলাগুলো বৈষম্যের শিকার হয়েছে। ওই অর্থবছরে জেলার বাকি উপজেলাগুলো সেই অর্থে কোনো বরাদ্দই পাইনি। আমি এই বিষয়টি পরিষ্কার করতে চেয়েছিলাম।

যা বললেন আসিফ ও হাসনাত : এ বিষয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া বলেন, কুমিল্লার প্রশাসক প্রথমত একেবারেই কাঁচা একটা মিথ্যা কথা বলেছেন। রাজস্ব খাত থেকে কারও এলাকায় কোনো ধরনের বরাদ্দ নিয়ে যাওয়ার কারও কোনো সুযোগ নেই। রাজস্ব খাতের বাজেট বছরের শুরুতেই জেলা পরিষদ ঠিক করে যে, তারা কোথায় কতটুকু খরচ করবে। এটা মূলত এডিপির বিশেষ বরাদ্দ। তো উনি এটাকে রাজস্ব খাতের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলেছেন।

আসিফ মাহমুদ বলেন, এটা এক ধরনের হ্যারাসমেন্ট এবং মানহানি। আমি আশা করব কুমিল্লা জেলা পরিষদের প্রশাসক তাঁর বক্তব্য পরিষ্কার করবেন। অন্যথায় আইনি ব্যবস্থার দিকে যেতে হবে। বাংলাদেশের নাগরিকদের প্রতি আমার আহ্বান থাকবে, আপনারা সচেতন। এ ধরনের কিছু ছড়ানোর আগে দয়া করে ক্রস চেক করবেন। আমাদের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা রাখার চেষ্টা থাকবে। অনেকে বিভ্রান্ত হচ্ছেন দেখে এই ব্যাখ্যা দেওয়াটা জরুরি মনে করলাম। আপনারা চাইলে আমাদের সঙ্গে বসতে পারেন আরও স্পষ্টতার জন্য, যেমন আমেরিকাতে নতুন প্রশাসন আগের প্রশাসনের সঙ্গে বসে। জাস্ট উল্টাপাল্টা বক্তব্য না দিয়ে আপনারা আমাদের ডাকতে পারতেন। হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, উনি (মোস্তাক মিয়া) এমনভাবে বলেছেন মনে হচ্ছে, টাকা আমরা নিজেরা পকেটে নিয়ে গেছি। অথচ দেবিদ্বারের বিভিন্ন কাজে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। উনি বলেছেন, রাজস্ব খাত থেকে নেওয়া হয়েছে। কিন্তু এটি তো রাজস্ব খাতের বরাদ্দ নয়, এডিপি প্রকল্পের বরাদ্দ ছিল। তিনি উপজেলার জন্য বাজেট নেওয়ার কথা বুঝিয়েছেন। আর উপজেলার জন্য বাজেটের টাকা তো আমাকে দেওয়া হয়নি। এ বাজেট তো কোনো ব্যক্তিকে দেওয়া হয় না। দেওয়া হয়েছে উপজেলাকে। দেবিদ্বার উপজেলাকে কোন কোন খাতে, কোন কাজে টাকা দেওয়া, সে তালিকা জেলা প্রশাসনের কাছে আছে এবং সে তালিকা উপজেলাতেও আছে। কোন খাতে কত টাকা, কোথায় খরচ করেছে। তারা সেটি প্রকাশ করুক। উপজেলার উন্নয়নের জন্য সবকিছু করতে রাজি আছেন উল্লেখ করে হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, আমি আমার উপজেলার মানুষের জন্য কোথাও যদি কোনো কিছু ভিক্ষা চাইতে হয়, তা নিয়েও আমার আপত্তি নাই। কারণ, আমি তো আমার জন্য চাচ্ছি না। আমি মানুষের জন্য চাচ্ছি। হাসনাত আবদুল্লাহ আরও বলেন, এই বরাদ্দ স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে দেওয়া বিশেষ বরাদ্দ, যেটা জেলা পরিষদের মাধ্যমে ব্যয় হয়েছে। দেবিদ্বার উপজেলাকে ৫ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে। এই অর্থ এডিপি প্রকল্পের মাধ্যমে দেওয়া হয়েছে। জেলা পরিষদের রাজস্বের সঙ্গে এর কোনো সম্পৃক্ততা নেই। জেলা পরিষদ সূত্র মতে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিশেষ বরাদ্দে ওই টাকা গেছে মুরাদনগর ও দেবিদ্বার উপজেলায়। এই দুই উপজেলার মধ্যে মুরাদনগর আসিফ আহমদের বাড়ি এবং দেবিদ্বার হাসনাত আবদুল্লাহর বাড়ি। একই অর্থবছরে মুরাদনগর ও দেবিদ্বার উপজেলার বাইরে ১ কোটি টাকার মতো বরাদ্দ পেয়েছিল চৌদ্দগ্রাম উপজেলা। জেলার ১৭টি উপজেলার মধ্যে অন্য উপজেলাগুলো ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সেভাবে তেমন বরাদ্দ পায়নি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights