আল্লাহর একত্ববাদ ইসলামের প্রধান ও মূল স্তম্ভ

উম্মে আহমাদ ফারজানা
আল্লাহ তাআলা মানুষকে সৃষ্টি করেছেন একমাত্র তাঁর ইবাদত করার জন্য; আর এই ইবাদতের মূল ভিত্তি হলো তাওহিদ তথা একত্ববাদ। একত্ববাদ মানে শুধু আল্লাহকে উপাসনা করা নয়; বরং তাঁর সঙ্গে কাউকে বা কিছুকেই শরিক না করা এবং একমাত্র আল্লাহকে প্রভু, স্রষ্টা ও উপাস্য হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া। তাই নবী করিম (সা.) মানুষকে আল্লাহর একত্ববাদের পথে আহ্বান জানিয়েছেন, যাতে মানুষ দুনিয়া ও আখিরাতে সফলকাম হতে পারে। আল্লাহ তাআলা বলেন : ‘আর আমি জিন ও মানুষকে সৃষ্টি করেছি, কেবলমাত্র আমার ইবাদতের জন্য।’ (সুরা : জারিয়াত, আয়াত : ৫৬)
মানবজাতির প্রথম ও মূল দায়িত্ব হলো তাওহিদ তথা একত্ববাদ। কেননা আল্লাহ ছাড়া কোনো স্রষ্টা বা রিজিকদাতা নেই, এবং তাঁর তুল্য বা সমতুল্য কেউ নেই। যেমনটা আল্লাহ তাআলা নিজেই বলেন, ‘তাঁর কোনো সমতুল্য নেই, এবং তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।’ (সুরা : শুরা, আয়াত : ১১)

এই একত্ববাদই হলো ইসলামের মূল ভিত্তি।

নবী করিম (সা.) মক্কায় ১০ বছরেরও বেশি সময় ধরে মানুষকে একত্ববাদের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি প্রথমে মানুষকে আল্লাহ ছাড়া কাউকে উপাসনা না করার প্রতি উৎসাহিত করেছিলেন, তারপর নামাজ, রোজা এবং অন্যান্য ইবাদত ফরজ করেছিলেন। যখন নবী করিম (সা.) মুয়াজ ইবনে জাবাল (রা.)-কে ইয়েমেনে প্রেরণ করেছিলেন, তিনি তাঁকে নির্দেশ দিয়েছিলেন, ‘তোমরা প্রথমেই তাদের আল্লাহর একত্ববাদের প্রতি আহ্বান জানাও।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৭৩৭২)

আল্লাহর ডাককে যারা মেনে নেয় এবং একমাত্র তাঁকেই উপাসনা করে, তাদের জন্য আছে জান্নাত; এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তির প্রতিশ্রুতি।

নবী (সা.) মুয়াজ (রা.)-কে আরো বলেছিলেন, ‘হে মুয়াজ, তুমি কি জানো বান্দাদের ওপর আল্লাহর অধিকার কী এবং আল্লাহর ওপর বান্দার অধিকার কী? মুয়াজ (রা.) বললেন, ‘আমি জানি না, শুধু আল্লাহ ও তাঁর রাসুলই ভালো জানেন।’ নবী করিম (সা.) বললেন, ‘বান্দাদের ওপর আল্লাহর অধিকার হলো তাঁরা শুধু আল্লাহর ইবাদত করবে এবং কোনো কিছুকে তাঁর সঙ্গে শরিক করবে না। আর আল্লাহর ওপর বান্দাদের অধিকার হলো, যারা আল্লাহর সঙ্গে কোনো কিছুকে শরিক করে না, তাদের তিনি শাস্তি দেবেন না।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৩০)

অতএব, প্রত্যেক মুসলিমের কর্তব্য হলো একত্ববাদের ভিত্তিতে জীবন যাপন করা, যাতে আল্লাহ তার ঈমানকে দৃঢ় ও শক্তিশালী করেন; বিশেষ করে যখন সে এই জীবনের যাত্রা থেকে বিদায় নেয়। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যার এই পৃথিবীতে শেষকথা হবে ‘আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই’, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ৩১১৬)

আর একত্ববাদের বিরুদ্ধে অবস্থান এবং আল্লাহর সঙ্গে অংশীদার স্থাপন করা হলো সবচেয়ে মারাত্মক অপরাধ। এটি আল্লাহর দৃষ্টিতে সবচেয়ে বড় পাপ। এমনকি কেউ যদি এই অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে, আল্লাহ তাআলা তাকে ক্ষমা করবেন না। আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই, আল্লাহ তাঁর সঙ্গে শরিক করা ক্ষমা করবেন না, কিন্তু এর চেয়ে কম যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করবেন। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর সঙ্গে শরিক স্থাপন করে, সে নিশ্চয়ই মহাপাপ রচনা করেছে। (সুরা : নিসা, আয়াত : ৪৮)

রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বীকে ডাকতে গিয়ে মারা যায়, সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৪৪৯৭)

সুতরাং আল্লাহকে ভয় করা এবং তাঁর ওপর পূর্ণ আস্থা রাখা একজন মুমিনের একান্ত কর্তব্য। তাহলেই একজন মুমিন দুনিয়া ও আখিরাতে সফলকাম হতে পারবে। সেই কঠিন সময়ে যখন অন্যরা ভয়, দুঃখ-দুর্দশায় জর্জরিত থাকবে। সেদিন একত্ববাদীরা মহান আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করবে, যিনি তাদের সরল পথে অবিচল থাকার তাওফিক দিয়েছেন। আল্লাহ বলেন, ‘এবং তারা বলবে, সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর, যিনি আমাদের সঙ্গে করা তাঁর প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করেছেন এবং আমাদের পৃথিবীর উত্তরাধিকারী করেছেন, যাতে আমরা যেখানে ইচ্ছা জান্নাতে বসবাস করতে পারি। পরিশ্রমকারীদের প্রতিদান কতই না উত্তম!’ (সুরা : জুমার, আয়াত : ৭৪)

অন্যদিকে কাফির ও মুশরিকদের ভাগ্য হবে ভয়ংকর। তাদের ফুটন্ত পানিতে টেনে নিয়ে যাওয়া হবে এবং আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হবে। আল্লাহ বলেন, ‘যখন তাদের গলায় থাকবে শিকল, তখন তাদের টেনে নিয়ে যাওয়া হবে ফুটন্ত পানিতে, তারপর আগুনে পুড়িয়ে ফেলা হবে।’ (সুরা : গাফির, আয়াত : ৭১-৭২)

তাইতো নবী করিম (সা.) অনন্ত অসীম জান্নাতের সুসংবাদ দিয়ে এবং চিরস্থায়ী জাহান্নামের সতর্ক করে বলেন, ‘তোমাদের কারোর জন্য জান্নাত তার জুতার ফিতার চেয়েও নিকটবর্তী, এবং জাহান্নামও।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬৪৮৮)

প্রকৃত মুসলিম হওয়ার জন্য তিনটি ক্ষেত্রে আল্লাহকে এক বলে বিশ্বাস করা আবশ্যক। এই তিনটি বিষয় তাওহিদ তথা একত্ববাদের প্রকার বা শাখাবিশেষ।

১. (তাওহিদুর রুবুবিয়াহ) তথা রব (স্রষ্টা, পালনকারী, রক্ষণাবেক্ষণকারী ইত্যাদি) হিসেবে আল্লাহকে এক মানা।

২. (তাওহিদুল উলুহিয়াহ/ইবাদত) তথা ইবাদতের ক্ষেত্রে (একমাত্র ইবাদতের যোগ্য) আল্লাহকে এক মানা।

৩. (তাওহিদুল আসমা ওয়াস সিফাত) তথা আল্লাহর নামসমূহ ও গুণাবলির ক্ষেত্রে তাঁকে এক মানা। কেউ উল্লিখিত তিনটি ক্ষেত্রের কোনো একটিতে আল্লাহকে এক না মানলে সে ইসলাম থেকে খারিজ হয়ে যাবে। কাফিররা শুধু প্রথম ক্ষেত্রে (রুবুবিয়াহ) আল্লাহকে এক বলে বিশ্বাস করে। কিন্তু দ্বিতীয় (ইবাদত) ও তৃতীয় ক্ষেত্রে (আসমা ওয়াস সিফাত) আল্লাহকে এক বলে বিশ্বাস করে না। তাই তারা কাফির বা অস্বীকারকারী।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights