ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতাকে নিয়ে পশ্চিমাদের যতো সংশয়

গত সপ্তাহে কোমে অবস্থিত বিশেষজ্ঞ পরিষদের (অ্যাসেম্বলি অফ এক্সপার্টস) সচিবালয়ে ভয়াবহ বোমা হামলায় বেশ কয়েকজন কর্মী নিহত হওয়ার পর ইরানের রাজনৈতিক অঙ্গনে চরম অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এই রক্তক্ষয়ী ঘটনার মধ্য দিয়ে ইরানি শাসনব্যবস্থার সর্বোচ্চ স্তরে যে ঝুঁকি বিরাজ করছে তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এমতাবস্থায় দেশটির নেতৃত্ব নির্ধারণের প্রক্রিয়া নিয়ে নীতিনির্ধারকদের মধ্যে তীব্র মতপার্থক্য দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে বিশেষজ্ঞ পরিষদের নিয়ম অনুযায়ী সব আলেমকে সশরীরে উপস্থিত হয়ে ঐকমত্যে পৌঁছানো বাধ্যতামূলক কি না, তা নিয়ে বর্তমানে জোর বিতর্ক চলছে। আগের বিধান অনুসারে যেকোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের উপস্থিতিতে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার প্রয়োজন ছিল।

সাবেক মধ্যপন্থী প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতির মধ্যে কিছুটা সংযত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বর্তমান পরিস্থিতিতে নেতৃত্ব নির্বাচনের প্রক্রিয়া পিছিয়ে দেওয়ার এবং যুদ্ধ শেষে রাষ্ট্রের মৌলিক রাজনৈতিক সংস্কারের ওপর জোর দিয়েছেন। রুহানি মনে করছেন, তাড়াহুড়ো করে কোনো সিদ্ধান্ত নিলে তা দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। তবে রুহানির এই অবস্থানের বিপরীতে দাঁড়িয়েছে দেশটির প্রভাবশালী সামরিক বাহিনী আইআরজিসি এবং কট্টরপন্থী আলেমরা। তাদের মতে, কোনোভাবেই রাজনৈতিক শূন্যতা বজায় রাখা যাবে না এবং বর্তমান অস্থায়ী নেতৃত্ব দিয়ে অনির্দিষ্টকাল রাষ্ট্র চালানো সম্ভব নয়।

এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের এই নেতৃত্ব নির্ধারণ প্রক্রিয়ায় ব্যক্তিগতভাবে যুক্ত হওয়ার যে ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন, তা তেহরানকে আরও ক্ষুব্ধ করে তুলেছে। ট্রাম্পের এই ধরনের অযাচিত হস্তক্ষেপের চেষ্টা ইরানের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় কট্টরপন্থীদের আরও একতাবদ্ধ করেছে। ইরান যে কোনো বিদেশি শক্তির চাপে নতিস্বীকার করবে না এবং সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে নিজেদের নেতা নির্বাচন করবে, সেই বার্তাটি এখন সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প ইরানকে ভেনিজুয়েলার মতো ‘রেজিম ক্যাপচার’ কৌশলে ফেলার চেষ্টা করলেও তেহরানের পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন।

এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে নতুন নেতা মোজতবা খামেনি তার পিতার রেখে যাওয়া বিশাল ক্ষমতা ও প্রভাবশালী সংস্থাগুলোর সঙ্গে কীভাবে সম্পর্ক বজায় রাখবেন। তার পিতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি সর্বোচ্চ নেতার পদটিকে একটি তদারকি কাঠামো থেকে সরকারের মূল চালিকাশক্তিতে রূপান্তর করেছিলেন। আলি খামেনি সব সময় চেষ্টা করেছেন বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যকার লড়াইয়ে সরাসরি পক্ষ না নিতে এবং কোনো ব্যর্থতার দায় যেন নিজের ওপর না আসে তা নিশ্চিত করতে। একইসাথে তিনি আইআরজিসি-কে ইরানের অর্থনীতির প্রায় প্রতিটি খাতে একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ গড়ার সুযোগ করে দিয়েছিলেন।

সেন্ট অ্যান্টনিস কলেজ অক্সফোর্ডের ইরানি রাজনীতি ও ইতিহাস বিষয়ক সহযোগী অধ্যাপক মরিয়ম আলেমজাদে মনে করেন, আলি খামেনির বড় উত্তরাধিকার হলো আইআরজিসি-র এই বিশাল অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সাম্রাজ্য। এই সাম্রাজ্যই মূলত ইরানের বাইরে তাদের সামরিক কার্যক্রম পরিচালনার অর্থ জোগান দেয়। পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ করে মোজতবা খামেনিও সম্ভবত আইআরজিসি-র এই ব্যবসায়িক স্বার্থ রক্ষা করবেন। কারণ এই বিশাল অর্থনৈতিক কাঠামো থেকে তিনি নিজেও ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হয়েছেন, যা বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পদ্ধতিগত নিষেধাজ্ঞার মুখে রয়েছে।

আদর্শিক অবস্থানের ক্ষেত্রেও পিতার মতোই অটল থাকতে পারেন নতুন নেতা। আমেরিকা যে অবিশ্বস্ত, নৈতিকভাবে দেউলিয়া এবং শোষণকারী রাষ্ট্র, আলি খামেনির এই বিশ্বাসই ইরানের পরবর্তী নীতি নির্ধারণে প্রভাব ফেলবে। ফলে ট্রাম্প ভেনেজুয়েলার কাছ থেকে যেভাবে অর্থনৈতিক সহযোগিতা আদায় করছেন, ইরানের পক্ষ থেকে তেমন কোনো প্রস্তাবের সুযোগ নেই। বরং মোজতবা খামেনি তার শাসনের স্থিতিশীলতার জন্য চীন ও রাশিয়ার ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল হবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। পশ্চিমের সঙ্গে বন্ধুত্বের চেয়ে প্রাচ্যের শক্তির সঙ্গে ঘনিষ্ঠতাই হবে তার প্রধান রাজনৈতিক কৌশল।

মোজতবার নেতৃত্বের প্রথম অগ্নিপরীক্ষা হবে পারমাণবিক অস্ত্র রাখা বা না রাখার ব্যাপারে তার পিতার দেওয়া ঐতিহাসিক ফতোয়া তিনি নবায়ন করেন কি না। এছাড়া প্রতিবেশী দেশগুলো কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার ক্ষেত্রে তিনি কোনো বাস্তবসম্মত পূর্বশর্ত দেন কি না, সেদিকেও বিশ্ববাসীর কড়া নজর থাকবে। বর্তমান এই সন্ধিক্ষণে তার প্রতিটি পদক্ষেপই নির্ধারণ করবে মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের ভবিষ্যৎ অবস্থান। যদিও সমালোচকরা সংশয়ে আছেন, তবে কট্টরপন্থীরা মোজতবার আগমনে উচ্ছ্বসিত এবং তারা মনে করছেন এটি পশ্চিমা চাপের মুখে ইরানের এক বড় বিজয়।

সাবেক সংস্কৃতিমন্ত্রী এজাতুল্লাহ জারঘামি যিনি মোজতবার সাথে নিয়মিত ব্যক্তিগত সাক্ষাতের দাবি করেন, তিনি তাকে একজন সংলাপপ্রীতি ও বিনয়ী নেতা হিসেবে চিত্রিত করেছেন। জারঘামি বলেন, তরুণ এই নেতা ক্ষমতায় আসার আগেই ডোনাল্ড ট্রাম্পের অহংকার ধূলিসাৎ করে দিয়েছেন। তার মতে, মোজতবা খামেনি অন্যদের কথা শুনতে পছন্দ করেন এবং ব্যক্তিগত আচরণে তিনি অত্যন্ত নম্র। কট্টরপন্থীদের এই আত্মবিশ্বাস থেকে স্পষ্ট, তারা মোজতবাকে কেবল একজন উত্তরসূরি হিসেবে নয়, বরং আধুনিক ইরানের একজন শক্তিশালী ত্রাণকর্তা হিসেবে দেখছেন।

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights