ইরানে বড় হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছেন ট্রাম্প, দাবি বিশেষজ্ঞের

অনলাইন ডেস্ক

ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাত অবসানের পথ খুঁজছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে একই সময়ে ইরানের বিরুদ্ধে বড় ধরনের সামরিক হামলার প্রস্তুতিও নেওয়া হচ্ছে বলে দাবি করেছেন তেহরানের ইউনিভার্সিটি অব অ্যাপ্লায়েড সায়েন্সেসের অধ্যাপক মোস্তফা খোশচেশম।

কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করার ক্ষেত্রে ব্যর্থ হওয়ার পর ট্রাম্প এমন একটি পথ খুঁজছেন, যার মাধ্যমে সংঘাতের অবসান ঘটানো যাবে এবং তাকে পরাজয় স্বীকার করতে হবে না।

খোশচেশমের মতে, বাস্তব পরিস্থিতি তার বিপক্ষে গেলেও ট্রাম্প কখনওই নিজেকে পরাজিত হিসেবে উপস্থাপন করেন না। তাই সংঘাত থেকে বেরিয়ে যাওয়ার এমন একটি ‘দরজা’ খুঁজছেন তিনি, যেটিকে রাজনৈতিকভাবে বিজয় হিসেবে তুলে ধরা সম্ভব হবে।

খোশচেশম বলেন, “মাঠের বাস্তবতায় যা-ই ঘটুক না কেন, ট্রাম্প কখনও বলবেন না যে, তিনি পরাজিত হয়েছেন।”

তার ভাষ্য, মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারবার এমন একটি পথ খুঁজে বের করার চেষ্টা করছেন, যার মাধ্যমে তিনি সংঘাতের অবসান ঘটিয়ে নিজেকে বিজয়ী হিসেবে উপস্থাপন করতে পারবেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত সেই প্রচেষ্টা সফল হয়নি।

তিনি বলেন, “তিনি বিজয় দাবি করে বেরিয়ে যাওয়ার একটি দরজা খুঁজে বের করার চেষ্টা করছেন। কিন্তু বারবার ব্যর্থ হয়েছেন।”

বিশেষজ্ঞের মতে, হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতিই ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য বড় একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তার দাবি, বর্তমানে প্রণালিটি দিয়ে যেসব জাহাজ চলাচল করছে, সেগুলো মূলত ইরানের নিয়ন্ত্রিত করিডর ব্যবহার করেই পার হচ্ছে।

খোশচেশম বলেন, “প্রণালি দিয়ে যেসব জাহাজ যাচ্ছে, তারা ইরানের করিডর ব্যবহার করছে। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে এই যুদ্ধে ট্রাম্প ব্যর্থ হয়েছেন।”

হরমুজ প্রণালি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ
পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরের মধ্যবর্তী হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ। মধ্যপ্রাচ্যের তেল ও গ্যাসের বড় একটি অংশ এই সরু জলপথ দিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছায়।

প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে শুধু মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো নয়, বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ ও বাজারে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে। ফলে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান সংঘাতে হরমুজ প্রণালি অন্যতম প্রধান কৌশলগত ইস্যু হয়ে উঠেছে।

ইরানের জন্যও এই জলপথ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য প্রণালিটি উন্মুক্ত ও নিরাপদ রাখা আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ এবং মিত্র দেশগুলোর নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।

এই কারণে প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ও জাহাজ চলাচলকে কেন্দ্র করে দুই দেশের মধ্যে চাপ অব্যাহত রয়েছে।

বড় হামলার আশঙ্কা
খোশচেশমের দাবি, একদিকে সংঘাত থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পথ খুঁজলেও অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে আরও বড় সামরিক অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছে।

তিনি বলেন, ওয়াশিংটন মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলের মার্কিন দূতাবাসগুলোকে ন্যূনতম সক্ষমতায় পরিচালনার নির্দেশ দিয়েছে। তার মতে, এটি ইঙ্গিত দিতে পারে যে, আগামী কয়েক সপ্তাহ বা কয়েক মাসের মধ্যে ইরানের বিরুদ্ধে বড় ধরনের হামলা চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

তবে মার্কিন সরকার ইরানে সম্ভাব্য বড় ধরনের নতুন হামলার বিষয়ে এমন কোনও পরিকল্পনার কথা প্রকাশ্যে নিশ্চিত করেনি। ফলে বিশেষজ্ঞের এই বক্তব্যকে তার নিজস্ব মূল্যায়ন হিসেবেই দেখা হচ্ছে।

তবে দূতাবাসগুলোর কার্যক্রম সীমিত করার মতো পদক্ষেপ নেওয়া হলে তা সাধারণত নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগের ইঙ্গিত দিতে পারে। বিশেষ করে চলমান সামরিক সংঘাতের মধ্যে এমন সিদ্ধান্ত আঞ্চলিক উত্তেজনা আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি করছে।

সংঘাত থামানোর চেষ্টা নাকি নতুন হামলার প্রস্তুতি?
বর্তমান পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের সামনে দুটি পরস্পরবিরোধী লক্ষ্য রয়েছে- একদিকে সংঘাতের অবসান ঘটানো, অন্যদিকে সামরিক চাপ বজায় রেখে ইরানকে ছাড় দিতে বাধ্য করা।

খোশচেশমের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ট্রাম্প প্রশাসন এখনও এমন কোনও সমাধান খুঁজে পায়নি, যেটিকে প্রেসিডেন্ট রাজনৈতিকভাবে বিজয় হিসেবে উপস্থাপন করতে পারেন।

তার দাবি, হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি পুনরায় খুলে দেওয়া সম্ভব না হওয়া এবং ইরানের সঙ্গে সংঘাতের কাঙ্ক্ষিত ফল না আসার কারণে ওয়াশিংটন আরও বড় সামরিক পদক্ষেপের দিকে যেতে পারে।

এমন পরিস্থিতিতে আগামী কয়েক সপ্তাহ বা মাসে যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী পদক্ষেপই সংঘাতের গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

যদি বড় ধরনের সামরিক হামলা চালানো হয়, তাহলে তা শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সংঘাতকে আরও তীব্র করবে না; বরং হরমুজ প্রণালি, মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি সরবরাহ এবং পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতির ওপরও বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।

অন্যদিকে, ট্রাম্প যদি সংঘাতের অবসান ঘটানোর জন্য কোনও সমঝোতার পথ খুঁজে পান, তাহলে তাকে সেটিকে কীভাবে রাজনৈতিক বিজয় হিসেবে উপস্থাপন করা যায়- সেই চ্যালেঞ্জও সামলাতে হবে।

ফলে বর্তমান পরিস্থিতিতে ট্রাম্প প্রশাসনের সামনে বড় প্রশ্ন হলো- ওয়াশিংটন কি শেষ পর্যন্ত আলোচনার মাধ্যমে সংঘাত থেকে বেরিয়ে আসবে, নাকি আরও বড় সামরিক অভিযানের মাধ্যমে ইরানের ওপর চাপ বাড়াবে। সূত্র: আল-জাজিরা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights