ইরান অভিযানে গিয়ে ভয়ংকর ক্ষতির সম্মুখীন মার্কিন বাহিনী

অনলাইন ডেস্ক

ইরানের মধ্যাঞ্চলীয় প্রদেশ ইসফাহানে সাম্প্রতিক সামরিক অভিযানে মার্কিন-ইসরায়েলি জোট নজিরবিহীন কৌশলগত পরাজয়ের সম্মুখীন হয়েছে। প্রেস টিভির বিশেষ প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, এই ব্যর্থ অভিযানটি শুধু সামরিক বিপর্যয়ই নয় বরং তেহরানের বিরুদ্ধে ওয়াশিংটনের এক বড় ধরনের কৌশলগত পরাজয়। মূলত এই পরাজয়ের গ্লানি ঢাকতেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত কয়েক দিন ধরে ইরানের বিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং সেতুর মতো বেসামরিক অবকাঠামোগুলোতে হামলার অবাস্তব ও উগ্র হুমকি দিচ্ছেন।

অভিযানের বিস্তারিত বিবরণে জানা গেছে, হামলার আগে মার্কিন বাহিনী ওই অঞ্চলে ব্যাপক বিমান পর্যবেক্ষণ ও গোয়েন্দা তৎপরতা চালিয়েছিল। কিন্তু সেই প্রাথমিক অনুপ্রবেশ এবং অনুসন্ধান মিশনের সময়ই যুক্তরাষ্ট্র এবং তাদের মিত্র ইসরায়েলি বাহিনী বড় ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হয়। ইরানের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার হাতে অন্তত একটি এ-১০ থান্ডারবোল্ট যুদ্ধবিমান এবং দুটি ব্ল্যাক হক হেলিকপ্টার ধ্বংস হয়েছে বলে প্রাপ্ত তথ্যে নিশ্চিত হওয়া গেছে। এটি ছিল মূলত অভিযানের শুরুতেই মার্কিনিদের জন্য একটি বড় ধাক্কা।

হোয়াইট হাউসে মার্কিন প্রেসিডেন্টের সরাসরি তত্ত্বাবধানে অনুষ্ঠিত গোপন বৈঠকে এই অভিযানের সময় বা ‘জিরো আওয়ার’ নির্ধারণ করা হয়েছিল। প্রাথমিকভাবে মার্কিন কর্মকর্তারা দাবি করেছিলেন, এটি ছিল একজন ভূপাতিত এফ-১৫ যুদ্ধবিমানের পাইলটকে উদ্ধারের মিশন। কিন্তু প্রেস টিভির অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে, এই দাবিটি ছিল সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও বানোয়াট। মূলত ইসফাহানের একটি গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক স্থাপনায় অনুপ্রবেশ এবং সেখানে বড় ধরনের নাশকতামূলক হামলা চালানোই ছিল এই অভিযানের আসল উদ্দেশ্য।

মার্কিন কমান্ডোদের বহনকারী সি-১৩০ পরিবহন বিমানগুলো অবতরণের জন্য ইসফাহানের একটি পরিত্যক্ত মাটির রানওয়েকে বেছে নেওয়া হয়েছিল, যা ইরানের পারমাণবিক স্থাপনার অত্যন্ত কাছে অবস্থিত। মার্কিন গোয়েন্দারা ধারণা করেছিল যে ইরানের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তাদের শনাক্ত করতে পারবে না। কিন্তু বাস্তবতা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। ইরানের সশস্ত্র বাহিনী আগে থেকেই এই পরিকল্পনার কথা জানতে পেরে পূর্ণ সতর্ক অবস্থায় ছিল এবং মার্কিন বিশেষ বাহিনীর জন্য এক সুনিপুণ ফাঁদ পেতে রেখেছিল।

যখন প্রথম সি-১৩০ বিমানটি কয়েক ডজন কমান্ডো নিয়ে অবতরণ করে, তখন ইরানি বাহিনী কৌশলে কোনো তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দেখায়নি। এর কিছুক্ষণ পর বিশেষায়িত যানবাহন এবং লিটল বার্ড হেলিকপ্টার নিয়ে দ্বিতীয় একটি সি-১৩০ বিমান অবতরণের চেষ্টা করলে ইরানি বাহিনী সেটির ওপর প্রচণ্ড আক্রমণ চালায়। এতে বিমানটি জরুরি অবতরণ করতে বাধ্য হয়। ঠিক সেই মুহূর্তে সেখানে অপেক্ষমাণ মার্কিন কমান্ডো এবং হেলিকপ্টারগুলো ইরানি বাহিনীর লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয় এবং তারা চারদিক থেকে অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে।

মাঠে থাকা বিশেষ বাহিনীর সদস্যরা যখন বুঝতে পারে যে তারা ফাঁদে পড়েছে, তখন হোয়াইট হাউসের সিচুয়েশন রুম থেকে অভিযানের লক্ষ্য পরিবর্তন করা হয়। অনুপ্রবেশের মূল মিশনটি তখন প্রাণ বাঁচাতে একটি মরিয়া উদ্ধার অভিযানে পরিণত হয়। মার্কিন কমান্ডোদের সেখান থেকে সরিয়ে নিতে ওয়াশিংটন তড়িঘড়ি করে আরও কিছু ছোট বিমান পাঠায়। ইরানি বাহিনীর গোলাবর্ষণের মুখে মার্কিন সেনারা এতটাই আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিল যে, তারা তাদের অত্যাধুনিক সরঞ্জাম এমনকি একজন উচ্চপদস্থ অফিসারের পরিচয়পত্র পর্যন্ত সেখানে ফেলে জীবন নিয়ে পালিয়ে যায়।

পরবর্তীতে ইরানি বাহিনী যেন তাদের ফেলে যাওয়া সি-১৩০ বিমান এবং অন্যান্য সরঞ্জামের কাছে পৌঁছাতে না পারে, সেজন্য মার্কিন যুদ্ধবিমানগুলো ওই এলাকায় ভারী বোমাবর্ষণ শুরু করে। তারা নিজেদের সরঞ্জাম নিজেরাই ধ্বংস করে দেওয়ার চেষ্টা করে যাতে সেগুলোর কোনো প্রযুক্তি ইরানের হাতে না পড়ে। এই অভিযানে মার্কিন স্পেশাল ফোর্সের লিটল বার্ড হেলিকপ্টারগুলো ওড়ার সুযোগই পায়নি; সেগুলোর কিছু মাটিতেই ধ্বংস হয়েছে আর বাকিগুলো দ্বিতীয় সি-১৩০ বিমানের ভেতরেই ভস্মীভূত হয়ে গেছে।

এই অপমানজনক পরাজয় লুকানোর জন্য ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তার যুদ্ধ সচিব পিট হেগসেথ একের পর এক সংবাদ সম্মেলন করে এটিকে পাইলট উদ্ধারের বীরত্বপূর্ণ অভিযান হিসেবে প্রচার করার চেষ্টা করছেন। প্রেস টিভির সূত্রগুলো এই প্রচারণাকে হলিউড সিনেমার গল্পের সাথে তুলনা করে জানিয়েছে যে, বিশ্ববাসী এখন আর ট্রাম্পের এই গোয়েবলসীয় কায়দার মিথ্যাচার বিশ্বাস করছে না। এই বিপর্যয়টি ১৯৮০ সালের ব্যর্থ তাবাস অভিযানের চেয়েও বড় অপমান হিসেবে ইতিহাসের পাতায় চিহ্নিত হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights