ইরান-ইসরায়েল সংঘাতের সুযোগে ডালপালা মেলছে সোমালিয়ার দস্যুরা

অনলাইন ডেস্ক

মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা এখন লোহিত সাগর ছাড়িয়ে হর্ন অফ আফ্রিকা অঞ্চলে ভয়াবহ অস্থিতিশীলতা তৈরি করেছে। সাম্প্রতিক গোয়েন্দা প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহী এবং সোমালি জলদস্যু গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে একটি ‘লেনদেনভিত্তিক’ গোপন আঁতাত গড়ে উঠেছে। এর ফলে ভারত মহাসাগর ও এডেন উপসাগরে বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর নিরাপত্তা চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছে।

সোমালিয়ার নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের দাবি, ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা সোমালি জলদস্যুদের অত্যাধুনিক জিপিএস ডিভাইস এবং সামরিক প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। এর ফলে দস্যুরা এখন অনেক দূর থেকেই বাণিজ্যিক জাহাজের গতিপথ নির্ভুলভাবে শনাক্ত করতে পারছে। গত জানুয়ারিতে পুন্টল্যান্ড মেরিটাইম পুলিশ ফোর্স জানিয়েছে, হুথির দেওয়া এই প্রযুক্তির সাহায্যেই দস্যুরা উপকূল থেকে অনেক গভীরে গিয়ে হামলা চালাতে সক্ষম হচ্ছে।

জাতিসংঘের সাম্প্রতিক একটি প্রতিবেদনে দেখা গেছে, আল-শাবাব এবং আইএস-এর মতো জঙ্গি সংগঠনগুলোও এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত হয়েছে। যদিও তাদের আদর্শ ভিন্ন, কিন্তু হুথির সঙ্গে তাদের সম্পর্ক পুরোপুরি ‘ব্যবসায়িক’। চুক্তির বিনিময়ে আল-শাবাব এডেন উপসাগরে জাহাজ চলাচল ব্যাহত করছে এবং মুক্তিপণের একটি অংশ হুথির কাছে পৌঁছে দিচ্ছে। গত ডিসেম্বরে একটি বিস্ফোরক ভর্তি নৌকা জব্দের ঘটনায় এই আন্তঃসীমান্ত অপরাধী চক্রের সক্রিয়তা আরও স্পষ্ট হয়েছে।

২০২০ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত সোমালি উপকূলে জলদস্যুতা প্রায় বন্ধ থাকলেও, ২০২৩ সাল থেকে তা পুনরায় বাড়তে শুরু করে। ২০২৪ সালে এক লাফে ২২টি হামলার ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে। দস্যুরা এখন ইয়েল শহরকে কেন্দ্র করে তাদের কার্যক্রম চালাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, লোহিত সাগরে হুতিদের হামলার কারণে আন্তর্জাতিক নৌবাহিনীর মনোযোগ সেদিকে সরে যাওয়ায় এই শূন্যস্থানের সুযোগ নিচ্ছে দস্যুরা।

এই আঞ্চলিক সংকটের মধ্যে নতুন মাত্রা যোগ করেছে ইসরায়েল কর্তৃক সোমালিল্যান্ডের স্বীকৃতি। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ইসরায়েল প্রথম দেশ হিসেবে সোমালিল্যান্ডের স্বাধীনতাকে স্বীকৃতি দেয়। বর্তমানে ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্র এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত মিলে সেখানে একটি সামরিক ঘাঁটি নির্মাণ করছে। এই ঘাঁটিটি মূলত হুথির ওপর নজরদারি এবং ড্রোন হামলা চালানোর কৌশলগত কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

আফ্রিকার এই অঞ্চলে এখন স্পষ্টত দুটি অক্ষশক্তি তৈরি হয়েছে। একদিকে ‘বারবারা অক্ষ’ (ইসরায়েল-ইউএই-ইথিওপিয়া-সোমালিল্যান্ড), যারা লোহিত সাগরের নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহে আগ্রহী। অন্যদিকে ‘মোগাদিশু অক্ষ’ (সোমালিয়া-তুরস্ক-মিশর-সৌদি আরব), যারা সোমালিয়ার সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং ইসরায়েলি প্রভাব ঠেকাতে বদ্ধপরিকর। তুরস্ক ইতিমধ্যে মোগাদিশুতে তাদের বৃহত্তম সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করেছে এবং সোমালি নৌবাহিনীকে প্রশিক্ষণ দিচ্ছে।

ইরান সরাসরি এই সংঘাতে না থাকলেও তারা ‘অ্যাক্সিস অফ রেজিস্ট্যান্স’-এর মাধ্যমে হুথিকে অস্ত্র সরবরাহ চালিয়ে যাচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, সোমালিয়ার উপকূলকে হুথির কাছে অস্ত্র পাঠানোর ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে ব্যবহার করছে তেহরান। এর ফলে একদিকে যেমন হুথি শক্তিশালী হচ্ছে, অন্যদিকে আল-শাবাব ও জলদস্যুদের হাতেও পৌঁছে যাচ্ছে উন্নত মানের মারণাস্ত্র।

হরমুজ প্রণালী ও লোহিত সাগরের এই অস্থিরতা বিশ্ব বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। সোমালিয়ার মানবিক সংকট আরও ঘনীভূত হচ্ছে কারণ সাহায্যবাহী জাহাজগুলোও এখন দস্যুদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, ইরান ও ইসরায়েলের এই ছায়া যুদ্ধ যদি নিয়ন্ত্রণ করা না যায়, তবে হর্ন অফ আফ্রিকা অঞ্চলটি বৈশ্বিক সন্ত্রাসের নতুন এক আখড়ায় পরিণত হতে পারে।

আরটির বিশ্লেষণ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights