ইরান ‘ঘুঁটি’ দিয়ে কৌশলে যুক্তরাষ্ট্রকে বাগে আনছে রাশিয়া?

অনলাইন ডেস্ক
ইউক্রেন যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতাকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়ের একটি চাঞ্চল্যকর প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা চলছে। ক্রেমলিনের পক্ষ থেকে ওয়াশিংটনকে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র যদি ইউক্রেনকে রুশ অবস্থান সংক্রান্ত গোয়েন্দা তথ্য দেওয়া বন্ধ করে, তবে রাশিয়াও ইরানি বাহিনীকে দেওয়া মার্কিন সামরিক অবস্থানের তথ্য সরবরাহ বন্ধ রাখবে।

গত সপ্তাহে মিয়ামিতে মার্কিন প্রতিনিধি স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনারের সাথে রুশ দূত কিরিল দিমিত্রিভ এক বৈঠকে এই প্রস্তাব উত্থাপন করেন বলে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে দাবি করা হয়েছে। যদিও রাশিয়া এই প্রতিবেদনকে ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছে, তবে ট্রাম্প প্রশাসন তাৎক্ষণিকভাবে এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় দুই পরাশক্তির মধ্যে টানাপোড়েন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

রাশিয়ার এই অদ্ভুত ‘বিনিময়’ প্রস্তাব ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। ইউরোপীয় কূটনীতিবিদরা মনে করছেন, মস্কো মূলত ওয়াশিংটন ও ইউরোপের দীর্ঘদিনের মৈত্রীতে ফাটল ধরাতে চাইছে। বিশেষ করে ইউক্রেন সংকট সমাধানে যখন ন্যাটো মিত্ররা একটি ঐক্যবদ্ধ অবস্থানের চেষ্টা করছে, তখন রাশিয়ার এই দ্বি-পাক্ষিক গোপন আলোচনার প্রচেষ্টা ইউরোপকে কার্যত একঘরে করার কৌশল হিসেবে দেখা হচ্ছে।

রাশিয়ার পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, ইউক্রেন শান্তি আলোচনা বর্তমানে স্থগিত রয়েছে, যা ইউরোপীয় দেশগুলোকে আরও বিচলিত করে তুলেছে। কারণ তারা মনে করছে, মস্কো ওয়াশিংটনকে প্রলুব্ধ করে এমন কোনো চুক্তিতে পৌঁছাতে চায় যেখানে ইউরোপের স্বার্থ উপেক্ষিত হবে।

এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক মন্তব্য পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। হরমুজ প্রণালীতে যুদ্ধজাহাজ পাঠাতে অস্বীকার করায় তিনি ন্যাটো মিত্রদের তীব্র সমালোচনা করেছেন, তাদের ‘কাপুরুষ’ বলে সম্বোধন করেছেন।

ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন, রাশিয়া হয়তো ইরানকে কিছুটা সাহায্য করছে। কারণ, তারা মনে করে যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনকে সহায়তা করছে। এই ধরনের প্রকাশ্য সমালোচনা আটলান্টিক মহাসাগরের দুই পাড়ের মিত্রদের মধ্যে আস্থার সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে। বিশেষ করে জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মার্জের মতো নেতারা রাশিয়ার তেলের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার সিদ্ধান্তে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।

পেন্টাগন এবং হোয়াইট হাউসের জন্য এই প্রস্তাবটি একটি বড় নৈতিক ও কৌশলগত চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে ইউক্রেনের জন্য মার্কিন সামরিক ও আর্থিক সহায়তা সীমিত হয়ে এলেও গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান এখনও কিয়েভের টিকে থাকার অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। গত বছর ট্রাম্প ও জেলেনস্কির এক বৈঠকের পর এই তথ্য বিনিময় সাময়িকভাবে বন্ধ হওয়ায় যে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছিল, তা মিত্রদের মধ্যে এখনো দগদগে ক্ষত হিসেবে রয়ে গেছে। অন্যদিকে, মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন বাহিনীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও ওয়াশিংটনের জন্য অগ্রাধিকার। রাশিয়া যেভাবে ড্রোন প্রযুক্তি এবং স্যাটেলাইট ইমেজের মাধ্যমে তেহরানকে সহযোগিতা করছে, তা মার্কিন স্বার্থের জন্য সরাসরি হুমকি হিসেবে দেখা দিচ্ছে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অনেকাংশেই ফ্রান্সের মতো ইউরোপীয় মিত্রদের দেওয়া গোয়েন্দা তথ্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ সম্প্রতি জানিয়েছেন, ইউক্রেনের প্রয়োজনীয় সামরিক গোয়েন্দা তথ্যের দুই-তৃতীয়াংশ এখন প্যারিস সরবরাহ করছে। তবে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য প্রয়োজনীয় গোলাবারুদের সংকটে কিয়েভ এখনও ওয়াশিংটনের দিকে তাকিয়ে আছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights