ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতি শেষ পর্যন্ত চুক্তিতে গড়াবে কি?
অনলাইন ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দীর্ঘ ৩৯ দিনের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষিত দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি বিশ্বজুড়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে। হোয়াইট হাউস থেকে আসা এই ঘোষণা মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের অবসান ঘটাতে একটি ক্ষীণ আশার আলো দেখালেও বিশ্লেষকরা একে চূড়ান্ত কোনো শান্তি চুক্তি হিসেবে দেখতে নারাজ। আপাতত যুদ্ধের ময়দানে কামানের গর্জন থামলেও দুই সপ্তাহের এই বিরতি শেষ পর্যন্ত স্থায়ী শান্তিতে রূপ নেবে নাকি নতুন কোনো ভয়াবহ সংঘাতের সূচনা করবে, তা নিয়ে কূটনৈতিক মহলে ব্যাপক জল্পনা চলছে। এই নাজুক পরিস্থিতিতে যুদ্ধবিরতি যেকোনো মুহূর্তে ভেঙে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
বিশেষ করে ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো অনিশ্চিত স্বভাবের নেতার অধীনে ওয়াশিংটনের অবস্থান যেকোনো সময় বদলে যেতে পারে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প হয়তো কয়েক দিনের মধ্যেই তেহরানের বিরুদ্ধে চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে পুনরায় সামরিক অভিযানের নির্দেশ দিতে পারেন। তবে এবারের যুদ্ধবিরতির কাঠামোটি বেশ কৌতূহলোদ্দীপক, কারণ এতে ইরানের পক্ষ থেকে দেওয়া ১০ দফার একটি প্রস্তাবকে আলোচনার ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করেছে আমেরিকা। খোদ ওয়াশিংটন যেখানে দাবি করছিল ইরান যুদ্ধে প্রায় ধ্বংস হয়ে গেছে, সেখানে পরাজিতের প্রস্তাবকে মেনে নিয়ে আলোচনায় বসা বড় ধরনের কূটনৈতিক ধাঁধার জন্ম দিয়েছে।
পাকিস্তানের ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিতব্য এই সম্ভাব্য শান্তি আলোচনায় ইরান যেসব শর্ত দিয়েছে তার মধ্যে বেশ কিছু পয়েন্ট অত্যন্ত স্পর্শকাতর। তেহরান তাদের প্রস্তাবে আঞ্চলিক নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ অব্যাহত রাখা এবং হরমুজ প্রণালীর ওপর পূর্ণ কর্তৃত্বের দাবি জানিয়েছে। একই সাথে তারা মধ্যপ্রাচ্য থেকে সমস্ত মার্কিন সেনা প্রত্যাহার এবং ইরানের ওপর থেকে সকল প্রকার অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। যদিও এই শর্তগুলোর অনেকগুলোই ওয়াশিংটনের জন্য মেনে নেওয়া প্রায় অসম্ভব। তবুও আলোচনার টেবিলে এসব বিষয় আসাকে ইরানের এক ধরনের কূটনৈতিক বিজয় হিসেবে দেখছেন অনেকে।
আমেরিকার জন্য মধ্যপ্রাচ্য থেকে সেনা প্রত্যাহার করা মানে কয়েক দশকের ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব এক নিমেষে বিসর্জন দেওয়া। ২৬০তম স্বাধীনতা দিবস এবং নিজের ৮০তম জন্মদিনের প্রাক্কালে ডোনাল্ড ট্রাম্প এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেবেন না যা বিশ্বমঞ্চে আমেরিকার আত্মসমর্পণ হিসেবে গণ্য হতে পারে। তাই সেনা প্রত্যাহারের বিষয়টি ইরান চাইলেও বাস্তবসম্মতভাবে কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। বরং এটি তেহরানের একটি কৌশলগত অবস্থান হতে পারে যাতে অন্যান্য ইস্যুতে তারা বেশি সুবিধা আদায় করে নিতে পারে।
লেবাননসহ অন্যান্য ফ্রন্টে যুদ্ধ বন্ধ করার বিষয়টিও সমানভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে আছে। একদিকে যখন শান্তি আলোচনার কথা চলছে, অন্যদিকে ইসরায়েল হিজবুল্লাহর অবস্থানে হামলা অব্যাহত রেখেছে। নেতানিয়াহু প্রশাসন নিজের বিজয় নিশ্চিত না করে পুরোপুরি পিছু হটবে এমন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। ফলে ইরানের এই শান্তি প্রস্তাবের বাস্তবায়ন মাঠপর্যায়ে কতটা সফল হবে তা নিয়ে সংশয় থেকেই যায়। লেবাননে শান্তি প্রতিষ্ঠা ইরানের জন্য রাজনৈতিক জয় হলেও ইসরায়েল ও আমেরিকার কাছে তা একটি কঠিন সমীকরণ।
সবচেয়ে বড় বিতর্কের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ এবং ইরানের ক্ষতিপূরণ আদায়ের পরিকল্পনা। ইরান প্রস্তাব করেছে, এই জলপথ দিয়ে যাতায়াতকারী ‘শত্রু’ জাহাজগুলোকে ২ মিলিয়ন ডলার করে মাশুল দিতে হবে। এটি কার্যকর হলে ইরান সরাসরি মার্কিন বাজেট থেকে ক্ষতিপূরণ না নিয়েও বিশ্ববাজার ও আরব দেশগুলোর কাছ থেকে পরোক্ষভাবে বিশাল অংকের অর্থ আদায় করতে পারবে। যদি আমেরিকা এই শর্ত মেনে নেয়, তবে তা হবে বৈশ্বিক জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ করিডোরে ইরানের একচ্ছত্র আধিপত্য স্বীকার করে নেওয়া।
নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং পরমাণু কর্মসূচির বিষয়ে কিছুটা নমনীয়তা দেখানোর সুযোগ থাকলেও ওয়াশিংটন সম্ভবত ইরানকে কঠিন শর্তের বেড়াজালে আটকে রাখতে চাইবে। ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অধিকার দিলেও তারা আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মাধ্যমে কঠোর তদারকির ব্যবস্থা করার চেষ্টা করবে। ফলে এই ১০ দফার প্রস্তাবটি পুরোপুরি বাস্তবায়িত হওয়ার চেয়ে বরং দুই পক্ষের দরকষাকষির একটি প্রাথমিক খসড়া হিসেবেই বেশি কার্যকর হবে। শেষ পর্যন্ত ইরান তার আঞ্চলিক ও সামরিক অবস্থান কতটা সংহত করতে পারে, তা নির্ভর করছে ইসলামাবাদের আলোচনার মোড় কোন দিকে ঘোরে তার ওপর।
মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তানের ভূমিকাও এই প্রক্রিয়ায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। পশ্চিমা বিশ্বের কোনো দেশ বা আন্তর্জাতিক সংস্থাকে এড়িয়ে ইসলামাবাদকে বেছে নেওয়া প্রমাণ করে যে বিশ্ব রাজনীতির মেরু বদলে যাচ্ছে। ইরান ও আমেরিকা উভয়ের সাথেই সুসম্পর্ক বজায় রাখা পাকিস্তান এখন দক্ষিণ বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী খেলোয়াড় হিসেবে আবির্ভূত হতে চাইছে। তবে এই পুরো প্রক্রিয়ার ভবিষ্যৎ এখনো অনিশ্চিত এবং আগামী কয়েক দিনের ঘটনাবলিই নির্ধারণ করবে মধ্যপ্রাচ্য কি দীর্ঘস্থায়ী শান্তির পথে হাঁটবে নাকি আরও বড় কোনো ধ্বংসযজ্ঞের দিকে এগোবে।
আরটির বিশ্লেষণ
