উত্তরাঞ্চলে ফের বন্যার পদধ্বনি
নিজস্ব প্রতিবেদক
দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল, উত্তরাঞ্চল ও ব্রহ্মপুত্র-যমুনা অববাহিকার কয়েকটি জেলায় আগামী দুই দিনের মধ্যে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র (এফএফডব্লিউসি)। বিশেষ করে সিলেট, সুনামগঞ্জ, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, জামালপুর, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ, টাঙ্গাইল, নওগাঁ ও নাটোর জেলার নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে সাময়িক প্লাবনের আশঙ্কা রয়েছে। অন্যদিকে তিস্তা নদীসংলগ্ন গাইবান্ধার নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হতে পারে।
গতকাল সকাল ৯টার তথ্যের ভিত্তিতে প্রকাশিত বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের বুলেটিনে বলা হয়েছে, পর্যবেক্ষণাধীন নদীগুলোর মধ্যে মাত্র দুটি নদী গাইবান্ধার তারাপুর পয়েন্টে তিস্তা এবং সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ পয়েন্টে কুশিয়ারা বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। আগামী দুই দিন সিলেট ও ময়মনসিংহ বিভাগ এবং এর উজানে মাঝারি থেকে ভারী, কোথাও কোথাও অতি ভারী বৃষ্টিপাত হতে পারে। একই সঙ্গে গাঙ্গেয় পশ্চিমবঙ্গ ও তৎসংলগ্ন উত্তর-পশ্চিম বঙ্গোপসাগরে একটি লঘুচাপ সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নদনদীর পানি বৃদ্ধি পেতে পারে। এফএফডব্লিউসি জানিয়েছে, ২৪ ঘণ্টায় সুরমা নদীর পানি কিছুটা কমলেও কুশিয়ারার পানি বেড়েছে। দুই দিন পানি প্রায় স্থিতিশীল থেকে তৃতীয় দিনে কমতে পারে। তবে এ সময়ের মধ্যে সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলার কয়েকটি স্থানে নদীর পানি সতর্কসীমা অতিক্রম করতে পারে এবং নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চল সাময়িকভাবে প্লাবিত হতে পারে। কুশিয়ারা নদীসংলগ্ন সিলেটের বিদ্যমান বন্যা পরিস্থিতি আপাতত স্থিতিশীল থাকতে পারে। ব্রহ্মপুত্র-যমুনা অববাহিকায়ও পানি বাড়ার প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে। আগামী দুই দিন পানি আরও বৃদ্ধি পেয়ে পরবর্তী দুই দিন স্থিতিশীল থাকতে পারে। এ কারণে কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, জামালপুর, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ ও টাঙ্গাইল জেলার নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে সতর্কতা জারি করা হয়েছে। একই সময়ে গঙ্গা-পদ্মা নদীর পানিও আগামী চার দিন বাড়তে পারে বলে জানিয়েছে কেন্দ্রটি।
অন্যদিকে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের আত্রাই নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় আগামী দুই দিনের মধ্যে নওগাঁ ও নাটোর জেলার কিছু এলাকায় সতর্কসীমা অতিক্রম করে সাময়িক বন্যা দেখা দিতে পারে। এ ছাড়া চট্টগ্রাম বিভাগের গোমতী, মুহুরী, সেলোনিয়া ও ফেনী নদীর পানি আরও একদিন বাড়তে পারে। বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, দেশের অধিকাংশ নদীর পানি এখনো বিপৎসীমার নিচে থাকলেও উজানের বৃষ্টিপাত ও সম্ভাব্য লঘুচাপের কারণে পরিস্থিতির ওপর সার্বক্ষণিক নজর রাখা হচ্ছে। বিভিন্ন স্থান থেকে আমাদের নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর-
সিলেট : সিলেটের সীমান্তবর্তী দুই উপজেলা কানাইঘাট ও জকিগঞ্জ। উপজেলার বুক চিড়ে বয়ে চলেছে সুরমা ও কুশিয়ারা নদী এখন পরিণত হয়েছে সীমাহীন দুর্ভোগের প্রতীকে। প্রতি বর্ষায় পানি বৃদ্ধি পেলেই শুরু হয় ভয়াবহ নদীভাঙন। নাব্য সংকট, তীব্র স্রোত ও অপরিকল্পিত নদী ব্যবস্থাপনার কারণে বছরের পর বছর ধরে ভাঙনের কবলে পড়ে শত শত পরিবার বসতভিটা হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়ছে। বিশেষ করে জকিগঞ্জ উপজেলার সীমান্তঘেঁষা এলাকায় অব্যাহত নদীভাঙনের ফলে বাংলাদেশ-ভারতের সীমারেখাও বিভিন্ন স্থানে পরিবর্তনের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে বলে স্থানীয়রা উদ্বেগ প্রকাশ করছেন। ভাঙনকবলিত এলাকা ঘুরে এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রতিদিনই নদী কয়েক ফুট করে গ্রাস করছে জনপদ। ফলে আতঙ্কে দিন কাটছে নদীপারের হাজারো মানুষের।
কানাইঘাট উপজেলার সদর ইউনিয়নের গোসাইনপুর গ্রাম বর্তমানে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার অন্যতম। সম্প্রতি সেখানে নতুন করে ভয়াবহ ভাঙন দেখা দিয়েছে। এর আগে নদীতে বিলীন হয়েছিল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও কমিউনিটি ক্লিনিক। পরে সরকার সেগুলো পুনর্নির্মাণ করলেও বর্তমানে সেগুলোও আবার ঝুঁকির মুখে পড়েছে। এ ছাড়া উপজেলার দিঘীরপাড় ইউনিয়নের খুলুরমাটি ও জিতপুর গ্রাম, নয়াগ্রাম, পৌরসভার ডালাইচর, বায়মপুর, সাতবাক ইউনিয়নের চরিপাড়া এবং লক্ষ্মীপ্রসাদ পূর্ব ইউনিয়নের উজান বারাফৈইত এলাকায়ও নতুন করে নদীভাঙন শুরু হয়েছে। অন্যদিকে জকিগঞ্জ উপজেলায়ও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। উপজেলা সদরের জকিগঞ্জ বাজার এলাকায় নদীভাঙনের কারণে ব্যবসায়ীদের মধ্যে চরম উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে। এ ছাড়া লালগ্রাম, ভাখরশাল, পৌরসভার বাজার এলাকা, মাইজকান্দি গ্রাম এবং বীরশ্রী ইউনিয়নের পীরনগর, পিয়াইপুর ও মাঝরগ্রাম এলাকায়ও নতুন করে ভাঙন দেখা দিয়েছে। স্থানীয়রা বলছেন, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে এসব এলাকায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। লালমনিরহাট : লালমনিরহাটের পাটগ্রামে তিস্তা নদীর পানি বেড়ে সৃষ্ট বন্যায় দহগ্রাম ইউনিয়নের আঞ্চলিক সড়ক ভেঙে চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। এতে প্রায় ৩ হাজার পরিবার দুর্ভোগে পড়েছে। গত বুধবার সন্ধ্যায় তিস্তা নদীর পানি হঠাৎ বেড়ে এই আকস্মিক বন্যার দেখা দেয়। বন্যায় ইউনিয়নের অন্তত ১০টি এলাকা প্লাবিত হয়েছে। বৃহস্পতিবার রাতে পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পানির চাপে ওই সড়কটি ভেঙে যায়, ফলে পানি লোকালয়ে ঢুকে দশ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন দহগ্রামের ওই এলাকার বাসিন্দারা। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, উজান থেকে নেমে আসা ঢলে তিস্তা নদীর পানি সন্ধ্যা থেকে দুই থেকে তিন ফুট বাড়ে। পানিতে এ ইউনিয়নের ১, ২ ও ৩ নম্বর ওয়ার্ডের বেশ কয়েকটি এলাকা প্লাবিত হয়। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, এলাকার প্রায় ৫০০ একর আমন ধানের খেত বন্যার পানিতে প্লাবিত হয়েছে। পরে পানি নেমে যায়। এ সময় দহগ্রামের ১ নম্বর ওয়ার্ডের সৃষ্টিয়ারপাড় এলাকার সাকোয়া নদীর ওপর নির্মিত সেতুর দুই দিকের সংযোগ-সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে ৩ নম্বর ওয়ার্ডের সিসটিয়ারপাড় এলাকা থেকে আঙ্গরপোতা ও পাটগ্রাম যাওয়ার আঞ্চলিক পাকা সড়কটির ২০ ফুট এলাকা ভেঙে প্রায় ১০ ফুট গর্ত হয়েছে। ২ ও ৩ নম্বর ওয়ার্ডের ডাঙ্গাপাড়া, মিস্ত্রিপাড়া, প্রধানপাড়া, ওলেরপাড় ও সাকোয়াপাড়া এলাকার প্রায় ২ হাজার পরিবারের চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। পরিবারগুলো শিশু, বৃদ্ধ ও গৃহপালিত পশু নিয়ে চরম দুর্ভোগে পড়েছে।
লালমনিরহাট সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী দেবাশীষ সাহা বলেন, ‘হঠাৎ করে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের (ফ্লাশ ফ্লাড) স্রোতে দহগ্রামের এ সড়ক ভেঙে যায়। আমরা ঘটনাস্থলে এসেছি, কাজ করছি। আজ-কালের মধ্যে সড়কটি মেরামত করে চলাচলের উপযোগী করা হবে।’
গাইবান্ধা : গাইবান্ধায় ব্রহ্মপুত্র-ঘাঘট-করতোয়ার নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে কমেছে তিস্তা নদীর পানি। এসব নদনদীর পানি কখনো বৃদ্ধি পাচ্ছে আবার কখনো কমছে। এতে স্থানীয়দের মাঝে দেখা দিয়েছে বন্যা আতঙ্ক। তবে এখনো এসব নদনদীর পানি বিপৎসীমার নিচে অবস্থান করছে।
