উত্তরের বৃক্ষে দক্ষিণে বিলাসিতা
নজরুল মৃধা, রংপুর
দুই দশক আগেও দক্ষিণাঞ্চলের কাঠ দিয়ে উত্তরাঞ্চলের মানুষ নিজেদের আসবাবসহ বিভিন্ন কাজে ব্যবহারের চাহিদা মেটাত। বর্তমানে অবস্থা পাল্টে গেছে। এখন দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ উত্তরাঞ্চলের কাঠের ওপর নির্ভরশীল। প্রতিদিন এ অঞ্চল থেকে হাজার হাজার গাছ কেটে কাঠ করে ট্রাকসহ বিভিন্ন যানবাহনে খুলনা, চট্টগ্রামসহ দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় যাচ্ছে। অর্থাৎ মানুষের দৈনন্দিন চাহিদা মেটাতে গিয়ে উজাড় হচ্ছে বন। ফলে বিলীন হচ্ছে এ অঞ্চলের অক্সিজেনখ্যাত বনভূমিগুলো; যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে প্রকৃতি ও মানবজীবনে। অস্বাভাবিক হারে গাছপালা কমে যাওয়ায় মরূকরণের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে উত্তরাঞ্চল। বন বিভাগ ও স-মিল মালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, স্থানীয়ভাবে কাঠের চাহিদা থাকা সত্ত্বেও বেশি দামের আশায় উত্তরাঞ্চলের ১৬ জেলা থেকে প্রতিদিন মেহগনি, সেগুন, গজারি, ইউক্লিপটাসসহ বিভিন্ন প্রজাতির কয়েক হাজার গাছ নিধন করে দক্ষিণাঞ্চলে নেওয়া হচ্ছে। প্রকাশ্যে এসব গাছের কাঠ ট্রাকযোগে পাঠানো হচ্ছে। অবাধে গাছ কাটায় উত্তরাঞ্চলের প্রকৃতি ভারসাম্য হারাচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনে আশঙ্কাজনক হারে কমছে বৃষ্টিপাত। শীতের সময় প্রচণ্ড শীত আবার গরমের সময় প্রচণ্ড গরম অনুভূত হচ্ছে। এ ছাড়া গাছপালা কমে যাওয়ায় তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র, পদ্মাসহ বিভিন্ন নদনদী শুকনো মৌসুমে পানিশূন্য হয়ে যাচ্ছে।
বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, রংপুর, নীলফামারী, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধার ৩৫ উপজেলায় বন বিভাগের উদ্যোগে ছয় বছরে সুবিভাভোগীদের মাধ্যমে বিভিন্ন প্রজাতির গাছের চারা রোপণ করা হয়েছে ২৭ লাখ। এ ছাড়া মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লাখ শহীদের স্মরণে জনগণের মাঝে বিনামূল্যে বিতরণ করা হয়েছে ১৬ লাখ ১৪ হাজার ৯৯০টি গাছের চারা। এ চারা জনগণের নিজেদের পছন্দের স্থানে রোপণ করার কথা। কিন্তু সেসব গাছের অর্ধেকই বেড়ে ওঠার আগে মারা গেছে। ফলে বিগত সরকারের বনায়ন প্রকল্প ভেস্তে যায়। তোফাজ্জল হোসেন ও জহুরুল ইসলাম নামে দুই কাঠ ব্যবসায়ী জানান, উত্তরাঞ্চলের চেয়ে দক্ষিণাঞ্চলে কাঠের দাম প্রায় দ্বিগুণ। ফলে ওই অঞ্চলের ব্যবসায়ীরা এসে এখান থেকে কাঠ নিয়ে যান। ব্যবসায়ীদের ভাষ্যমতে, উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা থেকে প্রতিদিন কয়েক হাজার গাছ দক্ষিণাঞ্চলে যায়। রংপুর বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, রংপুরে সামগ্রিকভাবে গাছপালা রয়েছে ২৮১ দশমিক ৭২ বর্গকিলোমিটার এলাকায়, যা শতকরা হিসাবে ১১ দশমিক ৯৪ ভাগ। নীলফামারীতে ১১১ দশমিক ১২ বর্গকিলোমিটার রয়েছে গাছপালা, যা শতকরা হিসাবে ৬ দশমিক ৯৭ শতাংশ। গাইবান্ধায় গাছপালা রয়েছে ১৮১ দশমিক ২৭ বর্গকিলোমিটার এলাকায়, যা শতকরায় ৮ দশমিক ১১ শতাংশ। কুড়িগ্রামে ২৩৯ দশমিক ১৭ বর্গকিলোমিটার এলাকায়, যা শতকরায় ১০ দশমিক ৩২ শতাংশ। অন্যদিকে সরকারি সামাজিক বন বিভাগের বনভূমি রয়েছে ৭ হাজার ২৪০ একর; যা ১ শতাংশেরও কম। রংপুর বন বিভাগের রেঞ্জ অফিসার রেজাউল করিম বলেন, সরকারিভাবে লাগানো গাছের ২০ শতাংশ প্রাকৃতিক দুর্যোগসহ বিভিন্ন কারণে নষ্ট হতে পারে। এদিকে বন বিভাগ রংপুর বিভাগের পাঁচ জেলায় বিগত সরকারের ছয় বছরে ৪৩ লাখের বেশি বিভিন্ন প্রজাতির গাছের চারা রোপণ ও বিতরণ করে। এসব গাছের অধিকাংশেরই এখন অস্তিত্ব নেই। তবে বন বিভাগ বলছে, প্রাকৃতিক দুর্যোগসহ নানা কারণে ২০ শতাংশ গাছ নষ্ট হয়ে থাকতে পারে। তবে বাস্তবে ৫০ শতাংশের বেশি গাছের অস্তিত্ব নেই।
