ঋণ ও আমানত বেড়েছে শরিয়াহ ব্যাংকগুলোর
শাহেদ আলী ইরশাদ
বাংলাদেশের ইসলামী (শরিয়াহভিত্তিক) ব্যাংক খাতে আবারও আস্থার আভাস মিলছে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে এসব ব্যাংকের আমানত ও বিনিয়োগে বছরওয়ারি মাঝারি প্রবৃদ্ধি লক্ষ করা গেছে, যা সাম্প্রতিক অস্থিরতার পর খাতটি ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত দেয়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারিতে ইসলামী ব্যাংকগুলোর মোট আমানত দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ৭৬ হাজার কোটি টাকা, যা এক বছর আগের থেকে ৯.২৭ শতাংশ বেশি। একই সময়ে বিনিয়োগ (ঋণ) বেড়ে হয়েছে ৫ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা, যা ১১.৩৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নির্দেশ করে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই প্রবৃদ্ধি মূলত আস্থা পুনরুদ্ধার এবং শরিয়াহসম্মত আর্থিক সেবার চাহিদা বৃদ্ধির ফল। তবে মাসওয়ারি চিত্রে প্রবৃদ্ধির গতি তুলনামূলক ধীর। জানুয়ারির ৪ লাখ ৭৪ হাজার কোটি টাকা থেকে ফেব্রুয়ারিতে আমানত বেড়ে ৪ লাখ ৭৬ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছালেও এই বৃদ্ধি খুবই সীমিত। একইভাবে বিনিয়োগও জানুয়ারির ৫ লাখ ৮৫ হাজার কোটি টাকা থেকে সামান্য বেড়ে ৫ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। এতে বোঝা যায়, ব্যাংকগুলো এখনো সতর্ক অবস্থানে রয়েছে এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় সংযত নীতি অনুসরণ করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৪ সালের জুলাইয়ের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতার পর ইসলামী ব্যাংক খাত কিছুটা চাপে পড়লেও বর্তমানে ধীরে ধীরে স্থিতিশীলতা ফিরে পাচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তারল্য সহায়তা, দুর্বলতা চিহ্নিতকরণ এবং প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ এই পুনরুদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
আমানতের কাঠামোতে এখনো মুদারাবা হিসাবের প্রাধান্য স্পষ্ট। মোট আমানতের প্রায় ৮৬.৮৫ শতাংশই মুদারাবাভিত্তিক, যা ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রতি গ্রাহকদের আস্থার প্রতিফলন। একই সঙ্গে বেসরকারি খাতের অংশীদার ৯০ শতাংশের বেশি হওয়ায় এ খাতে ব্যক্তি খাতের নির্ভরতা উচ্চমাত্রায় রয়েছে।
পুরো ব্যাংকিং খাতের সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায়, ইসলামী ব্যাংকের অবস্থান এখনো তুলনামূলক ছোট হলেও স্থিতিশীল। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে দেশের মোট ব্যাংকিং বিনিয়োগ দাঁড়িয়েছে ২৪ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা, যেখানে প্রচলিত ব্যাংকের অংশ ৭৫.৬২ শতাংশ এবং ইসলামী ব্যাংকের অংশ ২৪.৩৮ শতাংশ। সামষ্টিক অর্থনীতির চাপে ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগে সতর্কতা আরও স্পষ্ট। উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি, বিনিময় হার অস্থিরতা এবং কঠোর নিয়ন্ত্রক পরিবেশের কারণে ব্যাংকগুলো ঝুঁকি এড়িয়ে চলার কৌশল নিয়েছে। তবু শরিয়াহসম্মত অর্থায়ন, বিশেষ করে লাভ-ক্ষতি ভাগাভাগিভিত্তিক মডেলের চাহিদা অব্যাহত রয়েছে, যা বছরওয়ারি প্রবৃদ্ধিতে প্রতিফলিত হয়েছে।
সম্পদ (অ্যাসেট) বৃদ্ধিও ইতিবাচক ধারার ইঙ্গিত দেয়। ফেব্রুয়ারিতে ইসলামী ব্যাংকগুলোর মোট সম্পদ দাঁড়িয়েছে ৯ লাখ ৩৪ হাজার কোটি টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় ৯.৪৬ শতাংশ বেশি। দীর্ঘমেয়াদে এটি খাতটির সক্ষমতা ও বাজার উপস্থিতি শক্তিশালী হওয়ার ইঙ্গিত বহন করে। তবে বৈদেশিক লেনদেনে মিশ্র চিত্র দেখা যাচ্ছে। ইসলামী ব্যাংকের মাধ্যমে রপ্তানি আয় কমে ফেব্রুয়ারিতে ৬০ কোটি ৪০ লাখ ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা এক বছর আগে ছিল ৭১ কোটি ৩০ লাখ ডলার। একইভাবে আমদানি পরিশোধেও উল্লেখযোগ্য হ্রাস দেখা গেছে, যা সামগ্রিক বাণিজ্য কার্যক্রমে মন্থরতার প্রতিফলন।
এর বিপরীতে রেমিট্যান্স প্রবাহ আশাব্যঞ্জক। ফেব্রুয়ারিতে রেমিট্যান্স কিছুটা কমে ৬৬ কোটি ১০ লাখ ডলারে নামলেও বছরওয়ারি ভিত্তিতে ৩১.৬৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। এতে প্রবাসী আয় আহরণে ইসলামী ব্যাংকগুলোর শক্ত অবস্থান স্পষ্ট হয়।
এজেন্ট ব্যাংকিং খাতেও ইসলামী ব্যাংকগুলোর আধিপত্য বজায় রয়েছে। এ খাতে আমানত বেড়ে ২৬ হাজার ৯০০ কোটি টাকায় পৌঁছেছে, যার মধ্যে ৫৪.৬৭ শতাংশই ইসলামী ব্যাংকের দখলে। গ্রামীণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে ব্যাংকিং সেবা পৌঁছে দিতে এ খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। অন্যদিকে ডিজিটাল রূপান্তর ও স্বয়ংক্রিয়তার প্রভাবে ব্যাংকগুলোর জনবল কমেছে। এক বছরে কর্মীর সংখ্যা ৫.৭৯ শতাংশ হ্রাস পেয়ে ৪৫,২৪০ জনে নেমেছে।
নীতিনির্ধারক ও বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বর্তমান প্রবৃদ্ধি খাতে আস্থা ফেরার ইঙ্গিত দিলেও মাসওয়ারি ধীরগতি এখনো সতর্কতার বার্তা বহন করে। পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান মাসরুর রিয়াজ বলেন, আমানত ও বিনিয়োগের বছরওয়ারি বৃদ্ধি ইসলামী ব্যাংকিং খাতে আস্থা পুনরুদ্ধারের প্রতিফলন, যা নিয়ন্ত্রক সংস্কারের ফল। তবে মাসওয়ারি ধীরগতি প্রমাণ করে যে ব্যাংকগুলো এখনো ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, রেমিট্যান্স প্রবাহ খাতটির স্থিতিস্থাপকতা তুলে ধরলেও দুর্বল বাণিজ্য প্রবাহ ভবিষ্যতের জন্য একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়ে গেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, নীতিগত স্থিতিশীলতা, সুশাসন জোরদার এবং আর্থিক খাতের সংস্কার অব্যাহত থাকলে ইসলামী ব্যাংকগুলো আগামী দিনে আরও শক্তিশালী অবস্থানে ফিরে আসতে পারে।
