সাজানো নাকি বাস্তব, করেসপন্ডেন্টস ডিনারে হামলার ঘটনায় রহস্যের জট
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
গত শনিবার রাতে ওয়াশিংটন ডিসির হিলটন হোটেলে আয়োজিত হোয়াইট হাউস করেসপন্ডেন্টস ডিনারে বন্দুক হামলার চেষ্টার ঘটনাকে কেন্দ্র করে বর্তমানে উত্তাল হয়ে উঠেছে মার্কিন সাইবার জগৎ। ঘটনার পরপরই এক্স (সাবেক টুইটার), ব্লুস্কাই এবং ইনস্টাগ্রামের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো বিভিন্ন ষড়যন্ত্র তত্ত্বে সয়লাব হয়ে গেছে।
তত্ত্বের মেরুকরণ ও বিস্তার
একদিকে যখন পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ক্যালিফোর্নিয়ার বাসিন্দা কোল টমাস অ্যালেন নামক সন্দেহভাজনকে নিয়ে তদন্ত চালাচ্ছে, তখন নেটপাড়ার প্রভাবশালী ব্যক্তি ও সাধারণ ব্যবহারকারীরা কোনো প্রমাণ ছাড়াই দাবি করছেন যে, এই পুরো ঘটনাটিই আসলে ‘সাজানো’ বা ‘প্রি-প্ল্যানড’। রাজনৈতিক মতাদর্শ নির্বিশেষে ডান ও বাম— উভয়পক্ষের অ্যাকাউন্ট থেকেই এই ধরনের বিভ্রান্তিকর তত্ত্ব প্রচার করা হচ্ছে, যা জনমনে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে।
শনিবারের সেই জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সসহ প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তা ও বহু বিশিষ্ট সাংবাদিক উপস্থিত ছিলেন। ঠিক সেই সময় নিরাপত্তাবেষ্টনী ভেঙে কোল টমাস অ্যালেন নামক এক ব্যক্তি অনুষ্ঠানস্থলের দিকে ছুটে যাওয়ার চেষ্টা করেন। যদিও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতায় তাকে দ্রুত আটক করা হয় এবং প্রেসিডেন্ট ও ভাইস প্রেসিডেন্টকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়, তবু ঘটনার মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে নেটিজেনদের মন্তব্য।
ভারপ্রাপ্ত অ্যাটর্নি জেনারেল টড ব্ল্যাঞ্চ রবিবারের এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, সন্দেহভাজন ব্যক্তি সম্ভবত সরকারি কর্মকর্তাদের লক্ষ্যবস্তু করেছিলেন। তবে হামলাকারীর প্রকৃত উদ্দেশ্য বা মোটিভ সম্পর্কে এখনো অস্পষ্টতা রয়েছে, আর এই অস্পষ্টতাকেই পুঁজি করে ষড়যন্ত্রকারীরা তাদের তত্ত্বের জাল বুনছেন।
বামপন্থী ব্যবহারকারীদের আধিক্য থাকা ‘ব্লুস্কাই’ প্ল্যাটফর্মে অনেক ব্যবহারকারীকে দেখা গেছে বারংবার শুধুমাত্র ‘STAGED’ (সাজানো) শব্দটি লিখে পোস্ট করতে। ২০২৪ সালে পেনসিলভানিয়ার বাটলার শহরে ট্রাম্পের ওপর হওয়া হত্যা প্রচেষ্টার সময়ও ঠিক একইভাবে নেটিজেনরা একে সাজানো নাটক বলে অভিহিত করেছিলেন। বর্তমান ঘটনার ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। ডেমোক্র্যাট সমর্থক এবং প্রগতিশীল ঘরানার নেটিজেনদের একাংশ মনে করছেন, রাজনৈতিক সুবিধা হাসিল করার জন্যই এই পরিস্থিতির অবতারণা করা হয়েছে। তাদের মতে, যখন প্রশাসনের জনপ্রিয়তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে, ঠিক তখনই এমন একটি ঘটনা জনগণের সহানুভূতি আদায় এবং মনোযোগ অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেওয়ার একটি সুকৌশলী প্রচেষ্টা মাত্র।
নির্দিষ্ট অজুহাত ও সন্দেহ
অন্যদিকে, এক্স-এর মতো প্ল্যাটফর্মে এক দল ষড়যন্ত্রকারী দাবি তুলছেন যে, হোয়াইট হাউসে একটি নতুন ‘বলরুম’ বা বড় নাচঘর তৈরির পরিকল্পনাকে জোরালো করতেই এই হামলার নাটক সাজানো হয়েছে। উল্লেখ্য, ঘটনার পর এক সংবাদ সম্মেলনে এবং নিজস্ব সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প হোয়াইট হাউসে আরও সুরক্ষিত এবং বড় বলরুমের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেন। ট্রাম্পের কট্টর সমর্থক হিসেবে পরিচিত জ্যাক পসোবিয়েক এবং শায়া রাইচিকও একই সুরে কথা বলেছেন।
নেটিজেনদের দাবি, ঘটনার ঠিক পরপরই এই নির্দিষ্ট বিষয়ে এত দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেখানো প্রমাণ করে যে, এটি একটি পরিকল্পিত প্রচারণার অংশ ছিল। একটি পোস্ট যা ইতোমধ্যে ৫০ লক্ষাধিকবার দেখা হয়েছে, সেখানে সরাসরি প্রশ্ন তোলা হয়েছে—এটি কি আরও একটি সাজানো ঘটনা?
ষড়যন্ত্র তত্ত্বে নতুন মাত্রা যোগ করেছে ফক্স নিউজের একটি ভিডিও ক্লিপ। সেখানে হোয়াইট হাউস সংবাদদাতা আয়েশা হাসনি হিলটন হোটেল থেকে লাইভ করার সময় বলছিলেন, ঘটনার কিছুক্ষণ আগে প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিটের স্বামী তাকে অত্যন্ত সাবধানে থাকতে বলেছিলেন। ঠিক সেই মুহূর্তে কলটি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এই ভিডিওটি শেয়ার করে অনেকে দাবি করছেন, এটি ছিল একটি ‘ফলস ফ্ল্যাগ’ অপারেশন এবং ফক্স নিউজ ইচ্ছা করেই তাদের প্রতিবেদকের কথা মাঝপথে থামিয়ে দিয়েছে। যদিও আয়শা হাসনি পরে ব্যাখ্যা করেছেন যে, হোটেলের দুর্বল নেটওয়ার্কের কারণে তার সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছিল এবং তার নিরাপত্তার প্রতি উদ্বেগ থেকেই লেভিটের স্বামী ওই মন্তব্য করেছিলেন, কিন্তু নেটিজেনরা সেই ব্যাখ্যা গ্রহণ করতে নারাজ।
প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট নিজেও ষড়যন্ত্রকারীদের নিশানায় পড়েছেন তার একটি পুরোনো মন্তব্যের কারণে। অনুষ্ঠানের আগে এক সাক্ষাৎকারে তিনি রসিকতা করে বলেছিলেন যে, ডিনারে ট্রাম্পের কৌতুকগুলো এমন হবে যে সেখানে ‘গুলি ছোড়া হবে’ (shots will be fired)। আক্ষরিক অর্থে না বললেও, হামলার পর অনেকে এই শব্দচয়নকে ‘রহস্যজনক’ এবং ‘সন্দেহজনক’ বলে আখ্যা দিচ্ছেন। সামাজিক মাধ্যমে প্রচার করা হচ্ছে যে, লেভিট আগে থেকেই জানতেন কী ঘটতে চলেছে। এমনকি মূলধারার কিছু সংবাদমাধ্যমও লেভিটের এই মন্তব্যকে ‘অদ্ভুত’ বা ‘ভয়ংকর’ হিসেবে বর্ণনা করে এই ষড়যন্ত্র তত্ত্বে পরোক্ষভাবে হাওয়া দিয়েছে, যা বিতর্ককে আরও উসকে দিয়েছে।
প্রগতিশীল সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার মাজিদ পাডেলান, যিনি ‘ব্রুকলিন ড্যাড’ নামে পরিচিত, তার ১৩ লাখ অনুসারীর কাছে প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছেন, এই হামলা কি সাজানো নাকি বাস্তব? তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, ইরান যুদ্ধ এবং নিম্ন রেটিং থেকে মানুষের দৃষ্টি সরাতেই সম্ভবত এই নাটক। তার এই পোস্টে কয়েক হাজার মানুষ মন্তব্য করেছেন, যাদের বড় অংশই মনে করেন ঘটনাটি ‘পূর্বপরিকল্পিত’। রাজনৈতিক মেরুকরণের এই যুগে যেকোনো বড় ঘটনাকে এভাবেই দুই পক্ষ নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করার চেষ্টা করছে। এর ফলে সাধারণ মানুষের কাছে সঠিক তথ্য পৌঁছানোর চেয়ে গুজবই বেশি গ্রহণযোগ্যতা পাচ্ছে, যা গণতন্ত্রের জন্য একটি অশনিসংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, রিপাবলিকান শিবিরের কিছু কট্টরপন্থীকেও এই ঘটনার সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে দেখা গেছে। স্যাম পার্কারের মতো কট্টর জাতীয়তাবাদী ব্যক্তিরাও লেভিটের মন্তব্য এবং এরিকা কার্কের কান্নাভেজা অবস্থায় অনুষ্ঠানস্থল ত্যাগ করার ভিডিও শেয়ার করে প্রশ্ন তুলেছেন এটি সাজানো কি না। এমনকি কুখ্যাত ষড়যন্ত্র তত্ত্ব প্রচারকারী অ্যালেক্স জোন্সও প্রথম দিকে এই ঘটনার সত্যতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন, যদিও কয়েক ঘণ্টা পর তিনি তার অবস্থান পরিবর্তন করে বলেন যে, এটি সাজানো ছিল না। এই ধরনের পরস্পরবিরোধী বক্তব্য প্রমাণ করে যে, ঘটনার প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটনের চেয়ে নেতিবাচক প্রচারণা চালানোর প্রতিযোগিতাই এখন সোশ্যাল মিডিয়ায় বেশি প্রকট।
তদন্ত বনাম প্রোপাগান্ডা
তদন্তকারী সংস্থাগুলো কোল টমাস অ্যালেন সম্পর্কে বিশদ তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করছে। এখনো পর্যন্ত তার কোনো সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ততা বা বড় কোনো ষড়যন্ত্রের প্রমাণ মেলেনি। তবে সাবেক কংগ্রেস সদস্য মার্জোরি টেলর গ্রিন এক্সে লিখেছেন যে, অ্যালেন সম্পর্কে মানুষ অনেক ‘আকর্ষণীয় জিনিস’ খুঁজে পেয়েছে এবং তার সম্পর্কে অনেক প্রশ্ন রয়ে গেছে। তিনি কোনো সিদ্ধান্তে না পৌঁছালেও তার এই রহস্যময় পোস্টটি ষড়যন্ত্রকারীদের নতুন করে অক্সিজেন জুগিয়েছে। সাধারণত যেকোনো বড় দুর্ঘটনার পর প্রথম কয়েক সপ্তাহ এভাবেই নানা রকম তত্ত্ব ডালপালা মেলে এবং তদন্ত প্রতিবেদন আসার আগে পর্যন্ত এগুলো থামার কোনো লক্ষণ দেখা যায় না।
পরিশেষে বলা যায়, হোয়াইট হাউস করেসপন্ডেন্টস ডিনারের হামলাটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য একটি বড় ধাক্কা হলেও, ডিজিটাল দুনিয়ায় এটি এখন একটি ‘প্রোপাগান্ডা’ যুদ্ধের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। সঠিক তথ্য ও প্রমাণের অভাব থাকা সত্ত্বেও সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সাররা যেভাবে জনমত গঠন করার চেষ্টা করছেন, তাতে মূল তদন্ত প্রক্রিয়া ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিচ্ছে।
একটি দেশের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের উপস্থিতিতে এ ধরনের হামলাচেষ্টার ঘটনা যেমন উদ্বেগজনক, ঠিক তেমনই তথ্যের বিকৃতি ও ষড়যন্ত্র তত্ত্বের ব্যাপক প্রচারও সমাজের স্থিতিশীলতার জন্য বড় হুমকি। মার্কিন প্রশাসনের পরবর্তী পদক্ষেপ এবং তদন্তের চূড়ান্ত ফলাফলই হয়তো এই ধোঁয়াশা কাটাতে সাহায্য করবে।
সূত্র: ওয়্যার্ড
