একটি ঋণনির্ভর রাষ্ট্র?

ড. নিয়াজ মুর্তজা

পাকিস্তানের ভঙ্গুর অর্থনীতি ও রাজনৈতিক অবস্থা নিয়ে সম্প্রতি একটি কলাম লিখেছেন ড. নিয়াজ মুর্তজা। কলামটিতে তিনি পাকিস্তানের বর্তমান অবস্থার তীব্র সমালোচনা করার পাশাপাশি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির সঙ্গে তাদের চরম ব্যর্থতার তুলনা করেছেন। বাংলাদেশের পাঠকদের জন্য তার মতামতটির তুলে ধরা হলো।

বর্তমানে আমাদের দেশটির অর্থনীতি চলছে দুটি নড়বড়ে লাঠির ওপর ভর করে। এর একটি হলো আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) অন্তহীন ঋণ, আর অপরটি হলো মিত্র দেশগুলোর রাখা আমানত নবায়ন। কিন্তু এই দুই পন্থার জন্যই দেশটিকে চড়া অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মূল্য চোকাতে হচ্ছে।

প্রায় দেউলিয়া হয়ে যাওয়া রাষ্ট্রকে বাঁচাতে আমাদের শাসকরা মিত্র দেশগুলোকে প্রলুব্ধ করেন। এক্ষেত্রে তারা অর্থনীতির বদলে ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্বকে কাজে লাগান। আর এর পুরোটাই করা হয় জনগণের বদলে নিজেদের ব্যক্তিগত স্বার্থ উদ্ধারের জন্য। শাসকরা বিদেশি সাহায্য আনতে বেশ দক্ষ। তবে সেই সাহায্যকে জনগণের কল্যাণে কাজে লাগানোর চেয়ে নিজেদের পকেটে ভরতেই তারা বেশি সিদ্ধহস্ত। এ কারণেই আমাদের প্রবৃদ্ধি কখনোই রপ্তানিমুখী হতে পারেনি; বরং তা বরাবরই আমদানিনির্ভর। আমরা যে পরিমাণ ডলার আয় করি, তার চেয়ে অনেক বেশি গতিতে খরচ করি এবং নিজেরাই সংকট ডেকে আনি। আর এই সংকট কাটাতে রপ্তানির পাশাপাশি প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর বদলে উল্টো প্রবৃদ্ধির গতি থামিয়ে দেওয়া হয়। অতীতে ঘুরে দাঁড়ানোর বেশ কয়েকটি সুযোগ এলেও আমরা তার বেশিরভাগই নষ্ট করেছি।

এই শতকের সবচেয়ে বড় সুযোগটি হাতছাড়া করেছিলেন পারভেজ মোশাররফ। তিনি সবচেয়ে দীর্ঘ সময় দেশ শাসন করেছেন। সে সময় বিরোধী দল থেকে শুরু করে রাষ্ট্রযন্ত্রের সবকিছুই তার হাতের মুঠোয় ছিল। ৯/১১ হামলার পর মার্কিন সহায়তা, ঋণ মওকুফ, সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) এবং পোর্টফোলিও থেকে তার সরকার ৪৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি পেয়েছিল। এত কিছুর পরও একটি শক্তিশালী রপ্তানি ভিত্তি তিনি গড়ে তুলতে পারেননি। বিদেশি অর্থের প্রবাহ বাড়ায় মানুষের ভোগ ও আমদানি বেড়ে যায় এবং রিয়েল এস্টেট ব্যবসায় সাময়িক বুদবুদ তৈরি হয়। পরবর্তীতে অস্থিতিশীল পোর্টফোলিও ফান্ড এবং দেশের ভেতর আবদ্ধ এফডিআইয়ের কারণে মূলধন বাইরে চলে যেতে থাকে। শুরুতে তারা রুপির মান কৃত্রিমভাবে ধরে রাখায় রপ্তানি খাত চরম ক্ষতির মুখে পড়ে। রুপির মান দ্বিগুণ হলেও প্রকৃত মান সংযোজন থমকে যায়। এমনকি নব্বইয়ের দশকের চেয়েও নিচে নেমে যায় জিডিপি ও রপ্তানির অনুপাত। ২০০৮ সালে চলতি হিসাবের ঘাটতি জিডিপির ৮.২ শতাংশে পৌঁছালে বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়। ভুল নিরাপত্তা নীতির কারণে দুটি সংঘাত শুরু হয়, যা আজও আমাদের অগ্রগতির পথে বাধা। পরবর্তীতে পিপিপি সরকার এই ঘাটতি কমালেও জ্বালানি সংকট, নিরাপত্তাহীনতা, অদক্ষতা এবং ব্যর্থ সংস্কারের কারণে প্রবৃদ্ধি থমকে যায়।

এরপর চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর বা সিপেক (CPEC) প্রকল্পের হাত ধরে জ্বালানি ও সড়ক খাতে ২০ বিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগ আসে। এতে জ্বালানি সংকটের কিছুটা সুরাহা হলেও পিএমএল-এন সরকার দীর্ঘমেয়াদি রপ্তানি ভিত্তি গড়তে চরম ব্যর্থ হয়। রুপির অতিমূল্যায়নের কারণে আমদানি ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়। ফলে ২০১৮ সালের দিকে চলতি হিসাবের ঘাটতি দাঁড়ায় প্রায় ৬ শতাংশে। পিটিআই সরকার ২০২১ সাল নাগাদ এই ঘাটতি ০.৬ শতাংশে নামিয়ে আনে এবং কোভিড পরিস্থিতি বেশ ভালোভাবে সামাল দেয়। কিন্তু কোভিডের প্রণোদনার ফলে আবারও আমদানি বেড়ে যায়, আর পিছিয়ে পড়ে রপ্তানি। ২০২২ সালে বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি ও রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে ঘাটতি বেড়ে ৪.৬ শতাংশে দাঁড়ায়। পিএমএল-এন যে সংকটের বোঝা পিটিআইয়ের হাতে তুলে দিয়েছিল, কর্মফলের মতো সেটিই তারা আবারও ফেরত পায়।

মূলত আমদানিনির্ভর প্রবৃদ্ধির কারণেই ডলারের চরম সংকট তৈরি হয়েছে। আমাদের শাসকরা সংকট কমানোর বদলে প্রবৃদ্ধি দেখাতে আমদানি বাড়িয়েছেন। ফলে উচ্চ রিজার্ভ থাকার পরও সংকট ঘনীভূত হয়েছে। বারবার একই কারণে সংকট তৈরি হওয়ায় বর্তমান শাসকদের তা থেকে শিক্ষা নেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু নিয়মিত বন্যার মতো এই অর্থনৈতিক সংকট নিয়েও তারা পুরোপুরি উদাসীন। যদিও এ ধরনের সংকট আগে থেকেই আঁচ করা যায় এবং ঠেকানোও সম্ভব। এটি কেবল তাদের অদক্ষতা নয়; বরং ইচ্ছাকৃত অবহেলা। এ ধরনের সংকট তারাই তৈরি করেন এবং তারাই এর সুবিধা ভোগ করেন। আর দিন শেষে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার হয় সাধারণ মানুষ।

সিপেক-এর অর্থের প্রবাহ কমে যাওয়ায় আমরা আইএমএফের ঋণ এবং বিভিন্ন রাষ্ট্রের আমানতের দিকে হাত বাড়াই। ২০১৬ সালে স্টেট ব্যাংকের (এসবিপি) রিজার্ভে এসব আমানতের পরিমাণ ছিল মাত্র ৭০০ মিলিয়ন ডলার বা ৩৬ শতাংশ। ২০২৩ সালের শুরুতে তা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৬০০ শতাংশে! বর্তমানে আমাদের ঘাড়ে আইএমএফের ১১ বিলিয়ন ডলার, সৌদি আরবের ৮ বিলিয়ন ডলার এবং চীনের ৪ বিলিয়ন ডলারের আমানতের বোঝা রয়েছে। এই সবগুলোর যোগফল আমাদের ইতিহাসের সর্বোচ্চ রিজার্ভ ২১ বিলিয়ন ডলারের চেয়েও বেশি। বিশ্বজুড়ে আমরাই সবচেয়ে বেশি এই দুই ‘নড়বড়ে লাঠি’ বা সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। বর্তমানে বিশ্বে সবচেয়ে বেশি বিদেশি আমানত রাখা দেশের তালিকায় আমরা দ্বিতীয় এবং আইএমএফের সর্বোচ্চ ঋণগ্রহীতা হিসেবে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছি। এর পাশাপাশি আমাদের মাথার ওপর রয়েছে ৮০ বিলিয়ন ডলারের বেশি বৈদেশিক ঋণ। এসব ঋণ বা আমানত সরাসরি কোনো প্রকল্প বা কর্মসংস্থান তৈরিতে কাজে লাগে না। এগুলো থেকে সুদ মেটানোর মতো সরাসরি কোনো রাজস্বও আসে না। কেবল ডলারের চরম সংকট কাটাতেই এগুলো নেওয়া হয়। তবে নিজেদের এই বোকামির ভার বইতে ওই দুটি লাঠিও হয়তো আর যথেষ্ট নয়। তাই এখন আমরা আমাদের সবচেয়ে পুরোনো কিন্তু সবচেয়ে খামখেয়ালি মিত্র যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে ১০ বিলিয়ন ডলারের সহায়তা পাওয়ার আশায় দিন গুনছি।

অথচ একসময় আমাদেরই অংশ থাকা বাংলাদেশ আজ কতটা এগিয়ে! তাদের রিজার্ভে এমন কোনো বিদেশি আমানত নেই। তাদের আইএমএফের ঋণ রিজার্ভের মাত্র ১৩ শতাংশ। যেখানে আমাদের রপ্তানি ৩০ বিলিয়ন ডলারে আটকে আছে, সেখানে বাংলাদেশের রপ্তানির পরিমাণ ৪৮ বিলিয়ন ডলার! এই পরিসংখ্যানগুলোই আমাদের ব্যর্থতাকে উপহাস করছে।
অন্যের ওপর ভর করে চলার এই নীতি মারাত্মক ক্ষতিকর। পিএমএল-এন এবং পিটিআই—উভয় দলই রিজার্ভ সর্বোচ্চ চূড়ায় থাকার সময় প্রবৃদ্ধির গতি বাড়িয়েছিল। বর্তমানে স্টেট ব্যাংকের রিজার্ভ বেশি থাকলেও পরিস্থিতির কোনো মৌলিক পরিবর্তন হয়নি। কারণ এই রিজার্ভের উৎস সেই ধার করা অর্থ। একদিকে আইএমএফ আমাদের গলায় লাগাম পরিয়ে রেখেছে, অন্যদিকে মিত্র দেশগুলো চাইলেই যেকোনো সময় তাদের আমানত তুলে নিতে পারে (যেমনটা সংযুক্ত আরব আমিরাতের ক্ষেত্রে দেখা গেছে)। নির্দিষ্ট মেয়াদের বিনিয়োগের মতো এগুলো নিরাপদ নয়। এমনকি আমাদের পাওয়া বিদেশি সহায়তার মানও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নিচে নেমেছে। ৯/১১ পরবর্তী অনুদান ও ঋণ মওকুফ থেকে শুরু হয়ে সিপেকের বিনিয়োগ, আর এখন তা এসে ঠেকেছে আইএমএফের কঠোর শর্তের ঋণ ও মিত্রদের খামখেয়ালি আমানতে। আমরা এখন বিচক্ষণতার সঙ্গে বিনিয়োগ বা সৃজনশীল উপায়ে আয়ের বদলে বিপজ্জনকভাবে ধারের টাকায় রিজার্ভ বানাচ্ছি।

গত চার বছরের শাসনব্যবস্থার প্রাপ্তি বলতে কেবল সাময়িক এক স্থিতিশীলতা এবং অস্বচ্ছ বৈদেশিক পদক্ষেপ। কিন্তু শক্তিশালী রপ্তানি ভিত্তি ও প্রবৃদ্ধি ছাড়া এই স্থিতিশীলতা মূলত এক ধরনের স্থবিরতা ছাড়া আর কিছুই নয়। আমাদের বৈদেশিক নীতিগুলো অন্যের স্বার্থে নিজেদের নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ফেলে অন্তহীন এক যুদ্ধের দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। আমাদের সামনে এখন দুটি ঝুঁকিপূর্ণ পথ খোলা রয়েছে: এক. ধীর প্রবৃদ্ধি নিয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলা এবং জনরোষের ঝুঁকি নেওয়া। দুই. কোনো বাছবিচার না করেই আমদানিনির্ভর প্রবৃদ্ধির পথে হাঁটা এবং ডলার সংকট ও জনরোষের মুখে পড়া। যে মিত্রদের আমরা এতটা বিশ্বস্ততার সঙ্গে সেবা দিয়ে যাচ্ছি, খোদ তাদের কাছ থেকেও আজ বড় কোনো বিনিয়োগ আসছে না। একটি ‘বেইলআউট’ বা ঋণনির্ভর রাষ্ট্র কেবল এই দুটি লাঠির ওপর ভর করেই কোনোমতে দাঁড়িয়ে আছে। এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, এই দুর্বল লাইফ জ্যাকেটগুলো আর কতদিন দেশটিকে ডুবতে না দিয়ে ভাসিয়ে রাখতে পারবে?

লেখক: ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, বার্কলে থেকে পলিটিক্যাল ইকোনমিতে পিএইচডি করেছেন। বিশ্বের ৫০টি দেশে তৃণমূল থেকে উচ্চপর্যায়ে কাজ করার ২৫ বছরের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে তার।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights