এক কাপ চায়ের দামে ছাগলের চামড়া, সংকটে দিনাজপুরের ব্যবসায়ীরা
দিনাজপুর প্রতিনিধি
কোরবানির ঈদকে ঘিরে দিনাজপুরে পশুর চামড়ার সরবরাহ বাড়লেও কাঙ্ক্ষিত দাম না পাওয়ায় চরম হতাশার মধ্যে পড়েছেন ব্যবসায়ী ও সাধারণ বিক্রেতারা। কোথাও গরুর চামড়া বিক্রি হয়েছে মাত্র ১০০ থেকে ৩০০ টাকায়, আবার একটি ছাগলের চামড়া বিক্রি হয়েছে এক কাপ চায়ের সমমূল্য মাত্র ৫ থেকে ১০ টাকায়। অনেক ক্ষেত্রে ক্রেতা না পেয়ে চামড়া ফেলে দিতে বাধ্য হয়েছেন মানুষ।
জেলার বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে দেখা গেছে, চামড়ার বাজারে আগের সেই প্রাণচাঞ্চল্য নেই। ব্যবসায়ীরা বলছেন, ট্যানারি মালিকদের কাছে বছরের পর বছর বকেয়া অর্থ আটকে থাকায় তারা পর্যাপ্ত মূলধন নিয়ে বাজারে নামতে পারেননি। তার ওপর ল্যাম্পি রোগে আক্রান্ত পশুর চামড়া ট্যানারিগুলো গ্রহণ না করায় বিপুল পরিমাণ চামড়া অবিক্রীত থেকে গেছে।
ফুলবাড়ী উপজেলার কয়েকটি এলাকায় দেখা গেছে, নামমাত্র মূল্যে চামড়া বিক্রি হলেও অধিকাংশ ছাগলের চামড়ার কোনো ক্রেতা পাওয়া যায়নি। ফলে অনেকে সেগুলো ছোট যমুনা নদীর তীর ও বিভিন্ন আবর্জনার স্তূপে ফেলে দিয়েছেন।
চামড়া বিক্রি করতে আসা দেলওয়ার হোসেন বলেন, ‘একটি ছাগলের চামড়া নিয়ে বাজারে এসেছিলাম। দাম এত কম যে বিক্রি না করে শেষ পর্যন্ত ফেলে দিতে হয়েছে। একসময় দেশের চামড়া বিদেশে রপ্তানি হতো, ভালো দামও মিলত। এখন শিল্পটি ধ্বংসের মুখে।’
স্থানীয় ব্যবসায়ী কোরবান আলীর অভিযোগ, সরকারি নির্ধারিত মূল্য বাস্তবে কার্যকর হচ্ছে না। তিনি বলেন, ‘সরকার যে দাম নির্ধারণ করেছে, তা লবণযুক্ত চামড়ার জন্য। কিন্তু লবণ, শ্রমিক, পরিবহন ও সংরক্ষণ মিলিয়ে একটি গরুর চামড়ার পেছনে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত খরচ হয়ে যায়। ট্যানারি মালিকরা সরকারি দামে চামড়া না কেনায় আমরাও ন্যায্য মূল্য দিতে পারছি না।’
উত্তরাঞ্চলের অন্যতম বৃহৎ চামড়ার বাজার দিনাজপুরের রামনগরেও একই চিত্র। একসময় যেখানে শতাধিক ব্যবসায়ী সক্রিয় ছিলেন, বর্তমানে সেখানে মাত্র ২০ জন ব্যবসায়ী নিয়মিত চামড়া কেনাবেচার সঙ্গে যুক্ত আছেন। মৌসুমি ব্যবসায়ীর সংখ্যাও কমে এসেছে। খরচ বেশি এবং লাভ কম হওয়ায় বিশেষ করে ছাগলের চামড়া কিনতে আগ্রহ হারাচ্ছেন ব্যবসায়ীরা।
দিনাজপুর চামড়া ব্যবসায়ী মালিক গ্রুপের নেতারা জানান, এবার গরুর চামড়া আকারভেদে ২০০ থেকে ৭০০ টাকায় কেনাবেচা হয়েছে। কিন্তু লবণের উচ্চমূল্য, শ্রমিক ব্যয় এবং পরিবহন খরচ বৃদ্ধির কারণে ব্যবসায়ীরা লাভের মুখ দেখতে পারছেন না। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ট্যানারিগুলোর বকেয়া অর্থ পরিশোধে দীর্ঘসূত্রতা।
সংগঠনটির সদস্য সচিব আবেদ আলী বলেন, ‘এবার চামড়ার সরবরাহ ভালো ছিল। কিন্তু অর্থসংকটের কারণে আমরা সব চামড়া কিনতে পারিনি। ঢাকার ট্যানারি মালিকদের কাছে আগের পাওনা এখনও বকেয়া রয়েছে। ফলে অনেক ব্যবসায়ী মূলধন হারিয়ে বাজার থেকে সরে যাচ্ছেন। ল্যাম্পি রোগে আক্রান্ত পশুর চামড়াও ট্যানারিগুলো নেয়নি, তাই সেগুলো ফেলে দিতে হয়েছে।’
চামড়া ব্যবসায়ীদের মতে, দেশের অন্যতম রফতানিমুখী এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে হলে ট্যানারি মালিকদের বকেয়া পরিশোধ নিশ্চিত করা, ন্যায্যমূল্য বাস্তবায়ন এবং জেলা পর্যায়ের ব্যবসায়ীদের জন্য সহজ অর্থায়নের ব্যবস্থা করা জরুরি। অন্যথায় একসময় বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা চামড়া শিল্প আরও গভীর সংকটে পড়বে বলে আশঙ্কা তাদের।
