এক মহীয়সী মুহাদ্দিসার গৌরবময় ইতিহাস

মুফতি ইবরাহিম সুলতান

ইসলামী ইতিহাসে ইলমের উজ্জ্বল বাতিঘরের নাম আইনুশ শামস বিনতে আহমদ বিন আবিল ফারজ (রহ.)। যিনি স্বীয় যুগেই মুসনিদা তথা হাদিস বর্ণনায় নির্ভরযোগ্য ব্যক্তি হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। তার মূল নাম আইনুশ শামস আর উপনাম উম্মে নুর। বংশীয় পরিচিতির দিক থেকে তিনি আরবের প্রসিদ্ধ বনু ছাকিফ গোত্রের সঙ্গে সম্পৃক্ত।

এই গোত্রের একটি অংশ আরব থেকে বর্তমান ইরানে অবস্থিত ইস্পাহানে চলে আসে। এই গোত্র থেকেই যুগে যুগে অনেক ইমাম, মুহাদ্দিস ও গবেষক জন্ম নিয়েছেন। যারা সুদূর অনারব থেকেও নিজেদের শিকড় ও ইলমি ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন। এ জন্য জন্মস্থানের সঙ্গে সম্পৃক্ত করে আইনুশ শামসকেও ইস্পাহানি বলা হয়।

জন্মের পর থেকেই তিনি ইলমি পরিবেশে জীবন যাপন করার সুযোগ পান। সে সুবাদে অল্প বয়সেই ইলমচর্চায় আগ্রহী হয়ে ওঠেন। এ ব্যাপারে ইমাম জাহাবি (রহ.) বলেন, তিনি ছিলেন রিওয়ায়াত ও ইসনাদের ঘরে বেড়ে ওঠা শিশু। তা ছাড়া তার পরিবার ছোটবেলায়ই তাকে উলামায়ে কেরামের মজলিসে নিয়ে যেত।

পরিবার ও পরিবেশের প্রভাবে চার বছর বয়স থেকেই হাদিস আত্মস্থ করা শুরু করেন। অতঃপর ২৪ বছর বয়সে ইসমাইল বিন ইশখিজ (রহ.) থেকে হাদিস শ্রবণ ও স্বীকৃতি লাভ করেন।

তিনি শায়খ ইস্পাহানির আল জুজ নামক কিতাব শ্রবণের সৌভাগ্য অর্জন করেন শায়খ মুহাম্মদ বিন আলি বিন আবি জর (রহ.)-এর কাছ থেকে। তা ছাড়া ইবনে আসেম (রহ.)-এর কিতাবুদ দিয়াত, কিতাবুত তাওবা, আওয়ালিল কুবাব, বকর বিন বাককার (রহ.)-এর হাদিসসমূহ, আবু জুবাইর (রহ.)-এর জুজ নামক কিতাবসমূহ শায়খকে মুখস্থ শোনান। আইনুশ শামস তাঁর শায়খদ্বয়ের সর্বশেষ ও একমাত্র শিক্ষার্থী হিসেবে দীর্ঘদিন দুনিয়াতে বেঁচে ছিলেন।

যে কারণে তিনি একাই তাদের থেকে বহু হাদিস বর্ণনা করেন। ইলম শিক্ষার পাশাপাশি তার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছিল চারদিকে। মিসর, শাম, স্পেন, মরক্কো ও সুদূর আন্দালুসের ইলমপিপাসুদের গন্তব্য ছিলেন তিনি। আহলে বাইতের সদস্যগণ ও রাজবংশের আইয়ুবি পরিবারের ছেলেরাও হাদিস বর্ণনার ক্ষেত্রে তাঁর স্বীকৃতি নিতেন।
তাঁর প্রসিদ্ধ ছাত্রদের মধ্যে ছিলেন জাকি বারজালি, আবু আবদিল্লাহ মুহাম্মদ বিন ইউসুফ ইশবিলি। যিনি ছিলেন পর্যটক, হাফিজুল হাদিস, শামের প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিস ও সেখানকার নির্ভরযোগ্য ব্যক্তি। আর আইনুশ শামস ছিলেন তাঁর প্রথম সারির উস্তাজা।

ইরাক থেকে তার ছাত্রদের মধ্যে ছিলেন প্রসিদ্ধ আলেম, হাফেজ, ইরাকের শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস মুহিবুদ্দিন আবু আবদিল্লাহ মুহাম্মদ বিন মাহমুদ বিন হাসান বিন হিবাতিল্লাহ বিন মাহাসিনুল বাগদাদি, ইবনে নাজ্জার, তারিখে বাগদাদ প্রণেতা খতিবে বাগদাদি (রহ.)।

পূর্ব স্পেনের ইলমপিপাসুদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন হাফেজ নাজিমুদ্দিন আবু মুহাম্মদ আবদুল আজিজ বিন সেনাপতি আবুল হাসান বিন আবদুল আজিজ বিন হেলাল লাখিমি উন্দুলুসি (রহ.)। তিনি জন্মস্থান স্পেন থেকে সুদূর ইস্পাহান সফর করেন এবং আইনুশ শামসসহ আরো অনেকের কাছ থেকেই ইলম অর্জন করেন।

রাষ্ট্রের বড় ব্যক্তিদের মধ্য থেকে তার ছাত্র ছিলেন রাষ্ট্রদূত সদরুদ্দিন আবু আলি হাসান বিন মুহাম্মদ বিন মুহাম্মদ বাকিরি নিশাপুরি (রহ.)।

এ ছাড়া তার বর্ণনাকারীদের মধ্যে আরো রয়েছেন জিয়া মুহাম্মদ, তাকি বিন ইজ, আবুল আব্বাস আহমদ বিন উসমান বিন আবদুর রহমান সুলামি, আবু আলি মুহাম্মদ বিন আবুল ফাত্তাহ মুহাম্মদ ওসাবি ইস্পাহানি, শরিফ ফখরুদ্দিন আবু আবদিল্লাহ আলাভি হুসাইনি, আবু আবদিল্লাহ মুহাম্মদ বিন আবদুল খালিক বিন তুরখান উমাভি ইস্পাহানি (রহ.) প্রমুখ।

আইনুশ শামস (রহ.) থেকে যারা হাদিস বর্ণনার অনুমতি পেয়েছেন তারা হলেন ফখর আলি, শায়খ শামসুদ্দিন আবুল ফারজ আবদুর রহমান মাকদিসি হাম্বলি, বুরহান ইবরাহিম বিন দারজা, শামসুদ্দিন আবদুল ওয়াসি আবহারি শাফেয়ি, শামসুদ্দিন আবুল গানায়েম মুসাল্লাম বিন মুহাম্মদ বিন আল্লান কায়েসি, দামেস্কের উম্মে মুহাম্মদ হারামিয়াহ বিনতে তামাম সুলামিয়া, উম্মে মুহাম্মদ সাইয়েদা বিনতে মুসা বিন উসমান বিন দিরবাস মারানি আরো অনেকে।

হাফেজ জাহাবি (রহ.) হুফফাজুল হাদিসের সতেরোতম স্তরে তার নাম উল্লেখ করে বলেন, আইনুশ শামস স্বীয় যুগের মুসনিদা। তিনি ছিলেন নেককার, সতীসাধ্বী এক মহান উস্তাজা।

ইবনে ইমাদ হাম্বলি (রহ.) বলেন, আইনুশ শামস বিনতে আহমদ বিন আবিল ফারজ হলেন ইস্পাহানের ফকিহা।

মহীয়সী এই নারী মুহাদ্দিস দীর্ঘ হায়াত লাভ করেছিলেন। তবে তার ইন্তেকালের সময়ের ব্যাপারে মতভিন্নতা রয়েছে। ইমাম জাহাবি (রহ.)-এর বর্ণনানুযায়ী বোঝা যায় যে তিনি ৬১০ হিজরিতে ইন্তেকাল করেন। আল্লাহ তার ওপর রহম করুন।

তথ্যঋণ : (সিয়ারু আলামিন নুবালা : ২২/২৪, তারিখুল ইসলাম : ১৩/২৪৬)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights