এটাই কি সৌদি যুবরাজের শেষের শুরু?
অনলাইন ডেস্ক
১৪ শতকের খ্যাতনামা ইতিহাসবিদ ইবনে খালদুন তার কালজয়ী গ্রন্থ ‘আল-মুকাদ্দিমা’-য় লিখেছিলেন, সাধারণত তিন প্রজন্মের পর অনেক প্রভাবশালী রাজবংশের পতন ঘটে, কারণ তারা উপযুক্ত উত্তরসূরি তৈরি করতে ব্যর্থ হয়। বর্তমানে ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের নেতৃত্বে সৌদি আরব ঠিক এই প্রশ্নটির মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। তিনি কি সত্যিই সৌদি রাজবংশকে শক্তিশালী করার বদলে ভেতরে ভেতরে আরও দুর্বল ও ক্ষয়ে পড়া একটি জায়গায় নিয়ে গেছেন?
বর্তমানে ভেতর এবং বাইরে; উভয় দিক থেকেই প্রবল চাপের মুখে পড়েছে সৌদি রাজ্য। যুবরাজ সালমানের মূল রাজনৈতিক কৌশল এবং বাজির প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রই এখন একযোগে মুখ থুবড়ে পড়ছে। ইয়ামেনের হুতিদের পরাজিত করে সেখানে একটি অনুগত পুতুল সরকার বসানোর চেষ্টা, তেলনির্ভরতা কমিয়ে অর্থনীতিকে সম্পূর্ণ বদলে ফেলার পরিকল্পনা এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন যুক্তরাষ্ট্র বিপদের দিনে নির্ভরযোগ্য মিত্র হিসেবে পাশে থাকবে, এই তিনটি প্রধান ধারণাই এখন চরম ব্যর্থতার মুখোমুখি।
এমতাবস্থায় অনেকে মনে করছেন, সৌদি আরবকে বর্তমান সংকটের হাত থেকে রক্ষা করার একমাত্র উপায় হলো ক্ষমতা হস্তান্তরিত করা। যুবরাজ সালমানের জায়গায় একজন যোগ্য উত্তরসূরি এনে দেশের কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক নীতিতে আমূল পরিবর্তন আনা এবং বহু প্রতীক্ষিত গণতান্ত্রিক সংস্কার বাস্তবায়ন করা ছাড়া আর কোনো পথ খোলা নেই। এটি করতে ব্যর্থ হলে প্রতিযোগিতা ও লড়াইয়ের মুখে রাজত্বটি বিভিন্ন রাজপুত্রের নিয়ন্ত্রণে ছোট ছোট অঞ্চলে বিভক্ত হয়ে পড়তে পারে, যা একক রাষ্ট্র হিসেবে বর্তমান সৌদি আরবের অস্তিত্বকেই চিরতরে মুছে দিতে পারে। তদুপরি, সৌদি আরবের বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেল ও খনিজ সম্পদ, বিশেষ করে আনুমানিক ১১৪ মিলিয়ন টন বিরল খনিজ ও ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ আকরিকের ওপর যেসব বাইরের শক্তির নজর রয়েছে, তারা দেশটি ভেঙে টুকরো টুকরো করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করবে না। ইরানে নিজেদের কৌশল সফল না হওয়ায় বিদেশি শক্তিগুলোর পরবর্তী সহজ লক্ষ্যবস্তু হতে পারে সৌদি আরব। ইয়ামেনের হুতিদের বিরুদ্ধে প্রিন্স সালমানকে সহায়তা করতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও পশ্চিমা শক্তিগুলোর প্রকাশ্য অনিচ্ছা এই আশঙ্কাকে আরও জোরালো করে তুলছে।
ক্ষমতায় আসার পর থেকে ক্রাউন প্রিন্স দেশের উপকারের চেয়ে ক্ষতিই বেশি করেছেন বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। বিশেষ করে, দেশের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে না পেরে তিনি উল্টো চারদিকে অসংখ্য শত্রু তৈরি করেছেন। সৌদি আরব প্রতি বছর প্রতিরক্ষা খাতে প্রায় ৮৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয় করে, যা তাদের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ৬.৫ শতাংশ এবং বিশ্বব্যাপী সামরিক ব্যয়ের প্রায় ৩ শতাংশের সমান। তা সত্ত্বেও, গত ১০ অক্টোবর রিয়াদের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হুতিদের ভয়াবহ ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, যাতে অন্তত ১৩ জন নিহত হয়েছেন এবং আন্তর্জাতিক ভ্রমণকারীদের জন্য দেশটি চরম ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে, তাপ্রমাণ করে বর্তমান সৌদি শাসনব্যবস্থা কতটা নিরাপত্তাহীন ও ভঙ্গুর।
এর আগে ২০১৫ সালে, যখন প্রিন্স সালমান প্রতিরক্ষা মন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন, তখন প্রতিরক্ষা ব্যয় জিডিপির ১৩ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছেছিল। সেই বছর সংযুক্ত আরব আমিরাতের সাথে জোট বেঁধে তিনি ইয়ামেনে যে সামরিক অভিযান শুরু করেছিলেন, তা দীর্ঘ আট বছর ধরে গড়ায়। ভয়াবহ বোমা বর্ষণ এবং খাদ্য ও ওষুধের সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়ার মতো কঠোর অবরোধের ফলে প্রায় ৭ লাখ ইয়েমেনি নাগরিক মৃত্যুবরণ করেন। প্রায় ২০০ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেও সৌদি আরব মাত্র ৬ থেকে ৭ বিলিয়ন ডলারের সামরিক বাজেট থাকা একটি অসংগঠিত বিদ্রোহী বাহিনীর বিরুদ্ধে জয়লাভ করতে পারেনি। সমালোচকদের মতে, সামরিক ব্যয়ের একটি বড় অংশ বহিরাগত শত্রুর হাত থেকে দেশকে রক্ষা করার বদলে মূলত ক্রাউন প্রিন্সের নিজস্ব শাসন ও গদি টিকিয়ে রাখার কাজে অপচয় করা হয়েছে।
প্রতিরক্ষার পাশাপাশি অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও তিনি কাল্পনিক ও অবাস্তব মেগাপ্রকল্পে রাষ্ট্রের অগাধ অর্থ অপচয় করেছেন। পেট্রোডলারের ওপর নির্ভরতা কমানোর উদ্দেশ্যে নেওয়া তাঁর ঝাপসা ‘ভিশন ২০৩০’ প্রচারের পেছনে এবং পরামর্শক ফি হিসেবেই কোটি কোটি ডলার ঢালা হয়েছে। যুবরাজের চরম সমালোচক ও সাংবাদিক জামাল খাশোগি, যাকে পরবর্তীতে ইস্তাম্বুলে নির্মমভাবে হত্যা ও অঙ্গচ্ছেদ করা হয়েছিল, তিনি তার লেখায় সতর্ক করে বলেছিলেন যে এই বিশাল ও ব্যয়বহুল প্রকল্পগুলো ব্যর্থ হলে সৌদি আরব এই অঞ্চলের অন্যতম দরিদ্র দেশে পরিণত হতে পারে। সম্প্রতি দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক রিপোর্টে ফাঁস হওয়া অডিট তথ্যে দেখা গেছে, ২০১৭ সালে তাবুক প্রদেশে শুরু হওয়া স্মার্ট সিটি প্রকল্প ‘নেওম’ এখন কার্যত দেউলিয়া হওয়ার মুখে। তেলের রাজস্ব কমে যাওয়া এবং ২০৩০ ওয়ার্ল্ড এক্সপো ও ২০৩৪ বিশ্বকাপের অবকাঠামো তৈরিতে অর্থ সরিয়ে নেওয়ার কারণে ১৭০ কিলোমিটার দীর্ঘ রৈখিক শহর ‘দ্য লাইন’-এর কাজ গুটিয়ে নিতে হচ্ছে, যা বন্ধ করতেই সৌদির প্রায় ১৬ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত লোকসান হতে পারে।
অন্যদিকে, ইরান ও মার্কিন-ইসরায়েল দ্বন্দ্ব এবং এর ফলে হরমুজ প্রণালি ও বাব আল-মানদেবে সৃষ্ট অবরোধ এবং সৌদি আরবের পূর্ব-পশ্চিম তেল পাইপলাইনে হুতি ও ইরাকি মিলিশিয়াদের ধারাবাহিক আক্রমণ পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে। এই হামলার ফলে সৌদি আরব তেল রপ্তানি করতে পারছে না, যা তাদের আয়ের মূল উৎসকে সম্পূর্ণ নিঃশেষ করে দিচ্ছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) আগে ২০২৬ সালে সৌদির অর্থনীতি ৪ শতাংশ বৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছিল, তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে সেখানে ৩.৩ শতাংশের চরম সংকোচনের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
নিরাপত্তা সংকটের ভয়াবহতা এতটাই চরম রূপ নিয়েছে যে, দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদন অনুযায়ী যুবরাজ সালমান ড্রোন হামলার মাধ্যমে সম্ভাব্য গুপ্তহত্যা এড়াতে প্রতিনিয়ত বিভিন্ন প্রাসাদ ও আন্ডারগ্রাউন্ড বাংকারের মধ্যে স্থান পরিবর্তন করছেন। হুতিরা এখনও তার সুনির্দিষ্ট অবস্থান চিহ্নিত করতে না পারলেও রাজপরিবারের অভ্যন্তরীণ শত্রু ও প্রতিদ্বন্দ্বী রাজপুত্ররা যেকোনো সময় তাঁর জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারেন। সৌদ রাজপরিবারে রাজহত্যার ইতিহাস নতুন নয়; সৌদি আরবের অন্যতম সফল শাসক রাজা ফয়সালকে তারই পরিবারের এক সদস্য হত্যা করেছিল, যার পেছনে বিদেশি শক্তির উসকানি ছিল বলে মনে করা হয়।
ঐতিহ্যগতভাবে সৌদি রাজপরিবারে ক্ষমতা হস্তান্তরিত হতো প্রতিষ্ঠাতার ভাইদের মধ্যে আনুভূমিকভাবে। কিন্তু ২০১৭ সালে নিজের বাবার সমর্থনে যুবরাজ সালমান সেই ঐতিহ্য ভেঙে তৎকালীন মনোনীত উত্তরসূরি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন নায়েফকে সরিয়ে একপ্রকার প্রাসাদ বিপ্লবের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করেন। বিন নায়েফ আজও গৃহবন্দী অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন। সমালোচকেরা একে চরম ক্ষমতাগ্রাস হিসেবে দেখেছিলেন এবং অনেকেরই ধারণা, যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ সমর্থন ও সহযোগিতা ছাড়া এটি সম্ভব ছিল না। ক্ষমতা দখলের বিনিময়ে যুবরাজ ওয়াশিংটনকে কী প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তা এখনো স্পষ্ট নয়, তবে যুক্তরাষ্ট্র কখনোই বিনামূল্যে এমন বড় অনুগ্রহ করে না।
অবশ্য নিজেকে টিকিয়ে রাখতে যুবরাজ সালমান ২০২১ সালের দিকে কিছু নমনীয় নীতি গ্রহণ করেছিলেন, যেমন কাতারের ওপর থেকে অবরোধ তুলে নেওয়া এবং হুথিদের সাথে চুক্তি করার চেষ্টা করা। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর গাজা যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়ে মার্কিন মধ্যস্থতায় একটি সমঝোতার গুঞ্জনও শোনা গিয়েছিল। তবে মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়া যুদ্ধের আগুনে সেই আলোচনা এখন সম্পূর্ণ স্তব্ধ। ‘ভিশন ২০৩০’ এর মাধ্যমে তেলমুক্ত সমৃদ্ধ সৌদির যে স্বপ্ন দেখানো হয়েছিল, প্রিন্স সালমানের বাস্তব পদক্ষেপগুলো উল্টো দেশের অর্থনৈতিক বোঝা ও উদ্বেগ বাড়িয়েছে, তেলের ওপর নির্ভরতা তীব্র করেছে এবং জাতীয় নিরাপত্তাকে চরম হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। বিশ্বের অন্যতম ধনী এই রাষ্ট্রটি এখন দ্রুত পতনের দিকে ধাবিত হচ্ছে এবং যুবরাজ দেশকে দিন দিন ঋণের অতলে তলিয়ে দিচ্ছেন।
আজকে যখন হুতি হামলার মুখে সৌদি আরব অভূতপূর্ব সংকটে পড়েছে, তখন কোনো ইউরোপীয় বা মার্কিন মিত্র দেশ তাদের সাহায্যে এগিয়ে আসছে না। কেবল কয়েকটি মুসলিম দেশ সহায়তার হাত বাড়িয়েছে, তবে তাদের নিজস্ব ভিন্ন ভিন্ন স্বার্থ ও উদ্দেশ্য থাকায় নিজেদের মধ্যেই সংঘাত তৈরির ঝুঁকি রয়েছে, যা এই অঞ্চলে ‘গ্রেটার ইসরায়েল’ গঠনের পথকে আরও প্রশস্ত করতে পারে। সৌদি আরবের প্রায় ৬৫ শতাংশ নাগরিকের বয়সই ২৭ বছরের নিচে। যুবরাজ সালমানের ‘স্বাধীনতা’ ও ‘আধুনিকীকরণ’-এর মুখরোচক কথার বাইরে গিয়ে এখন এই তরুণ প্রজন্মের ভেবে দেখার সময় এসেছে, তার নীতিগুলো আসলে কার স্বার্থ রক্ষা করছে, যুবরাজের নাকি সাধারণ জনগণের? ইতিহাসের আর কোনো সময়ে সৌদি আরব ভেতর থেকে ভেঙে পড়া এবং বাইরে থেকে চূর্ণ হয়ে যাওয়ার এত বড় ঝুঁকিতে পড়েনি।
সূত্র: এশিয়া টাইমস
