এবার নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করুন

‘গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদ’ নামে জুলাই বিপ্লবীদের নতুন সংগঠন আত্মপ্রকাশ করেছে। সংগঠনটির আহ্বায়ক হলেন আবু বাকের মজুমদার। গতকাল বিকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে নতুন এ রাজনৈতিক ছাত্র সংগঠনের নাম ঘোষণা করা হয়। বিশাল আয়োজনের মধ্য দিয়ে আগামীকাল শুক্রবার নতুন রাজনৈতিক দলের জন্ম হচ্ছে। দেশের গতানুগতিক রাজনৈতিক ধারা পরিবর্তনের জন্য এ দলটির প্রতি দেশবাসীর ছয় মাসের প্রতীক্ষার অবসান হচ্ছে। অনেক মত-পথের সমন্বয়ে হচ্ছে এ দল। শুধু ছাত্র নয়, জনতাও থাকছে এ দলে। এ দলের নেতাদের সঙ্গে সাবেক সেনা কর্মকর্তারা বৈঠক করে জানিয়েছেন, তাঁদের ১ কোটি ভোটব্যাংক আছে। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় দলটির জন্ম হচ্ছে বলে শুরু থেকেই বিএনপির আপত্তি ছিল, এখনো আছে। তবে আপত্তি-অনাপত্তি যা-ই থাকুক না কেন, শেষ পর্যন্ত আগামী নির্বাচনে ক্ষমতাসীন হওয়ার সব প্রস্তুতি নিয়েই দলটি পথচলা শুরু করছে। রাজনীতির মাঠে এমন বিশেষ অতিথির জন্যই এতদিন অপেক্ষা সবার। রাষ্ট্র পরিবর্তনের সব সংস্কার আয়োজনও এ নতুন অতিথির জন্য। সুতরাং এখন আর দেরি কেন, এবার নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণা করুন। নির্বাচন খেলার স্টেডিয়ামটা সুসজ্জিত করুন। নির্বাচনি মাঠ সবার জন্য সমান সমতল করুন। রেফারিকে নিরপেক্ষ রাখুন। সেই সঙ্গে নির্বাচনি ম্যাচ ফিক্সিংয়ের জন্য যারা কলকাঠি নাড়ছেন, তাদের ব্যাপারে সতর্ক থাকুন। রাষ্ট্রের মালিক জনগণ। মালিককে তার মালিকানা বুঝিয়ে দিন।

বাংলাদেশ নিয়ে খেলাধুলা, ষড়যন্ত্র জন্ম থেকেই। পাকিস্তানের কর্তৃত্ববাদ, শোষণ ও তদানীন্তন শাসকদের হিমালয়সমান দম্ভে বাংলাদেশ জন্মের খেলাটা চলে যায় ভারতের কোর্টে। মুক্তিযুদ্ধে সহযোগিতার বিনিময়ে ভারত সব সময় বাংলাদেশকে তাদের করদরাজ্য করার চেষ্টা করেছে। বিগত ৫৩ বছরে ভারত কখনোই বাংলাদেশের পক্ষে থাকেনি। থেকেছে একটি পরিবারের পক্ষে। ১৯৭৫ সালে শেখ মুজিব হত্যাকাণ্ডের পর ভারত ওই পরিবারের দুই সদস্য শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানাকে লালনপালন করেছে। সবকিছু শিখিয়ে-পড়িয়ে ১৯৮১ সালের ১৭ মে শেখ হাসিনাকে আওয়ামী লীগের সভাপতি বানিয়ে বাংলাদেশে পাঠায়। তিনি দেশে ফেরার মাত্র ১৩ দিনের মাথায় ৩০ মে ভারতের শত্রু প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান নিহত হন। তারপর বাংলাদেশ নিয়ে ভারত খুব শক্তভাবে খেলতে শুরু করে। গত ১৬ বছর পুরোটা সময় ভারতই ছিল আওয়ামী লীগের অভিভাবক। সে কারণে এ ভূখণ্ডের কর্তৃত্ব হাতে রাখতে জঙ্গি ইস্যু তৈরি করে বিশ্বের কাছে বাংলাদেশকে একটি জঙ্গিরাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার অপচেষ্টা চালিয়েছে। ভারত যেভাবে জঙ্গি প্লটের স্ক্রিপ্ট তৈরি করে দিয়েছে, বিগত আওয়ামী সরকার সেই স্ক্রিপ্ট অনুযায়ী শুধু শুটিং করে চিত্রনাট্যের পরিপূর্ণতা দিয়েছে। জুলাই বিপ্লবের পর আবার তাদের প্রিয় মানুষকে তারা নিজেদের নিরাপত্তায় নিয়ে গেছে। ড. মুহাম্মদ ইউনূস অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর বড় বেশি বেকায়দায় পড়েছে প্রতিবেশী দেশটি। এ সরকারকে নানাভাবে চাপে রাখার চেষ্টা করে নিজেরাই এখন বিপদে। তবে এখন আর এ দেশে কোনো জঙ্গি নেই। জঙ্গি নিয়ে রাজনীতিও নেই। কারণ, ভারত জানে ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে জঙ্গি ইস্যুতে জড়ানো যাবে না। সারা বিশ্ব তাঁকে চেনে এবং জানে। আমাদের ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ভারতের নতুন চক্রান্তে বিভেদের রাজনীতি শুরু হয়েছে। আমাদের ঐক্যবদ্ধ শক্তি টুকরো টুকরো করে জুলাই বিপ্লব ব্যর্থ করাই হলো প্রতিবেশীর মূল লক্ষ্য। সেইসঙ্গে আমাদের আইনশৃঙ্খলা নিয়েও খেলবে প্রতিবেশী। গত ১৫ বছরে আলেম সমাজ, ধর্মপ্রাণ মুসলমান, দাড়ি-টুপি, হিজাব নিয়ে তাদের যে জঙ্গি সিরিজ প্যাকেজ ছিল, তা এখন আর কাজে আসছে না। আমাদের স্বদেশি ধর্মনিরপেক্ষ সুশীলদের সমর্থনে অসংখ্য নিরীহ মানুষকে জঙ্গি সাজিয়ে খুন করা হয়েছে। কারাগার বা আয়নাঘরে সাজা দেওয়া হয়েছে আরও অসংখ্য মানুষকে। সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে নতুন এজেন্ডায় এবং নতুন পরিকল্পনায় যথারীতি তৎপর থাকবে আমাদের প্রতিবেশী। সুতরাং সব পক্ষই সাবধান!

পবিত্র কোরআনের সুরা আশ-শুরার ৩০ নম্বর আয়াতে আল্লাহতায়ালা বলেছেন, ‘তোমাদের যে বিপদাপদ ঘটে, তা তোমাদের কৃতকর্মেরই ফল এবং তোমাদের অনেক প্রতীক্ষার অবসানঅপরাধ তিনি ক্ষমা করে দেন।’ গীতায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন, ‘কর্মন্যে বাধিকারস্তে মা ফলেষু কদাচন’। অর্থাৎ কর্মে তোমার অধিকার আছে, কিন্তু কর্মফল তোমার হাতে নেই। তুমি যেমন ইচ্ছা কর্ম করতে পারো কিন্তু তার ফল প্রকৃতির হাতে। প্রকৃতির নিয়ম অনুসারে কর্মের প্রতিফল তোমাকে ভোগ করতেই হবে।’ শুধু পবিত্র কোরআন আর গীতা নয়, সব ধর্মগ্রন্থেই কৃতকর্মের ফলের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু আমরা বান্দারা সে কথা মনে রাখি না। বিগত সরকার ক্ষমতা চিরস্থায়ী করার জন্য দিনের ভোট রাতে, আমি ভোট, ডামি ভোট করেছিল। আর সেসব ভোটে অতি উৎসাহী ডিসি, এসপি দলীয় কর্মী বা বলা চলে দলীয় পান্ডার ভূমিকা পালন করেছেন। বিশেষ করে ২০১৮ সালের ভোটে যে কেলেঙ্কারি হয়েছে, তা নজিরবিহীন। সে ভোটে প্রত্যেক ডিসি-এসপি হাইকমান্ডের তুষ্টি অর্জনের জন্য রীতিমতো প্রতিযোগিতায় নেমেছিলেন। পরে তাদের পদোন্নতি, ভালো পোস্টিং দিয়ে পুরস্কৃত করা হয়। ওই ভোটের পর সরকার যেমন ভেবেছিল তাদের চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত হয়ে গেছে, তেমন ডিসি-এসপিরা প্রশাসনে অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠেন। তাদের দাপটে অনেক সিনিয়র কর্মকর্তা ছিলেন কোণঠাসা। এখন সেই কৃতকর্মের ফল হিসেবে সরকার তাদের চাকরিচ্যুত করেছে। প্রশাসনে এমন শাস্তির দৃষ্টান্ত খুবই জরুরি ছিল। এজন্য অন্তর্বর্তী সরকার ধন্যবাদ পাওয়ার দাবিদার। আইনের শাসন, ন্যায়নীতি, প্রশাসন, গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংস করার পেছনে যারা কাজ করেছেন, তাদেরও চিহ্নিত করতে হবে। তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। এগুলো সংস্কার কার্যক্রমের অন্যতম অংশ। আগামী নির্বাচনের প্রস্তুতি চলছে। সংস্কার আগে, নাকি নির্বাচন আগে। স্থানীয় সরকার নির্বাচন আগে, নাকি জাতীয় সংসদ নির্বাচন আগে-সে বিতর্ক এখন চলছে। তবে যে সিদ্ধান্তই হোক না কেন, আশা করা যায়, তা দ্রুততম সময়ের মধ্যে পরিষ্কার হয়ে যাবে। আগামী সব নির্বাচন প্রক্রিয়ায় সরকারের যেসব কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করবেন, তাদের প্রত্যেকেরই পূর্বসূরিদের কৃতকর্মের ফললাভ থেকে শিক্ষা নেওয়া উচিত। কোনো বিশেষ মহল চাপ দিলেও কারও পক্ষ না নেওয়া এবং ন্যায়নীতি ও আইনের শাসনের পক্ষে থাকা উচিত। এর ব্যত্যয় ঘটলে ২০১৮ সালের ভোটের ডিসি-এসপিদের মতোই ভাগ্য বরণ করতে হবে-এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। ক্ষমতা, সম্মান আল্লাহর নিয়ামত। কোনো বান্দা যদি তা ধরে রাখতে না পারে, অথবা নিজের মর্যাদা নিজে রক্ষা করতে না পারে, তাহলে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বা কপালের ওপর দোষ চাপিয়ে লাভ নেই। বেলা শেষে কৃতকর্মের ফল ভোগ করতেই হবে।

দেশের অর্থনীতি এখন খাদের কিনারে। যদিও অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, বর্তমান সরকার দেশের অর্থনীতি খাদের কিনারা থেকে টেনে তুলেছে। সরকারের এ টেনে তোলার প্রচেষ্টাকে ধন্যবাদ। কিন্তু অর্থনীতিতে ইতিবাচক কোনো প্রভাব এখনো দেখা যাচ্ছে না। ব্যবসায়ীদের ইতোমধ্যে বারোটা বেজে গেছে। এখন শুধু হাতে হারিকেন নেওয়া বাকি। সবকিছু দেখে মনে হচ্ছে, যেন আওয়ামী লীগ নয়, দেশের একমাত্র শত্রু এখন ব্যবসায়ী শ্রেণি। তাদের পাশে কেউ নেই। সরকারের সঙ্গে ব্যবসায়ীদের সম্পর্ক এখন ফ্ল্যাটবাড়িতে দুই প্রতিবেশীর মতো। কেউ কারও খবর রাখে না। দেখা হলে সৌজন্য রক্ষায় শুধু সালাম বিনিময়। ব্যাংকগুলো ব্যবসায়ীদের সহায়তার বদলে বন্ড ব্যবসা করে মুনাফা করছে। বেসরকারি খাতে নতুন কোনো বিনিয়োগ নেই। নতুন কোনো কর্মসংস্থান নেই। বরং অনেক কলকারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। বেড়েছে বেকারত্ব। এভাবে যদি চলতে থাকে, তাহলে গণতন্ত্রের পথচলা কষ্টসাধ্য হবে। সামাজিক স্থিতিশীলতা, গতিশীল অর্থনীতি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার পূর্বশর্ত। অন্তর্বর্তী সরকারের কাজ শুধু একটি নির্বাচন দিয়ে দায়িত্ব শেষ করা নয়। ক্ষমতার রিলে রেসের কাঠিটি যাদের হাতে তুলে দেওয়া হবে, তারা যেন নির্বিঘ্নে দৌড়াতে পারে; সে ব্যবস্থাও করা। গোটা পৃথিবীতে অর্থনীতির চালিকাশক্তি হলো ব্যবসায়ী সমাজ। তারা যদি হতাশ থাকে, অসহায় বোধ করে তাহলে তা দেশের জন্য শুভসংবাদ নয়। সে কারণে ব্যবসায়ীদের আস্থায় নিয়ে দেশের অর্থনীতি দৃঢ় করতে হবে।

বাকস্বাধীনতা ও পরমতসহিষ্ণুতার দাবিও ছিল জুলাই বিপ্লবে। আমরা সংস্কার নিয়ে আছি অথচ পরমতসহিষ্ণু হতে পারলাম না। গত সপ্তাহে ‘ড. ইউনূসের নতুন স্বপ্ন, নতুন দল, জামায়াতের রাজনীতি’ শীর্ষক আমার লেখা নিয়ে কারও ভিন্নমত থাকতেই পারে। সেই মতপ্রকাশের স্বাধীনতাও আছে। অথচ প্রকাশ ঘটেছে অসহিষ্ণুভাবে। একটি রাজনৈতিক দলের এক নেতা ফোন করে শাসিয়েছেন। দেখে নেওয়ার হুমকি দিয়েছেন। যে ভাষায় এবং যে মেজাজে তিনি শাসালেন, তা ভয়ংকর কোনো সন্ত্রাসীকেও হার মানায়। তথ্যটি প্রিয় পাঠকদের জানিয়ে রাখলাম। জুলাই বিপ্লবের প্রত্যাশা ছিল মুক্ত মতপ্রকাশের স্বাধীনতা পাওয়া যাবে। কিন্তু তা হলো না। গণমাধ্যম অতীতেও চাপমুক্ত ছিল না। এখনো নেই। একেক সময় চাপের মাত্রা ও ধরন ভিন্ন। তবে গণমাধ্যমের ওপর প্রিয় পাঠকের চাপ হলো সত্য প্রকাশের। এটাই শিরোধার্য করে আমরা সব সময় পাঠকের সঙ্গেই থাকব।

লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন

manju209@yahoo.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights