ঐতিহ্যের চার স্বাদ, জিআই স্বীকৃতির প্রত্যাশা

নজরুল মৃধা, রংপুর

পেটেন্ট, শিল্প-নকশা ও ট্রেডমার্কস অধিদপ্তরে দেশের সম্ভাব্য জিআই পণ্যের তালিকায় রংপুরে তিস্তা নদীর সুস্বাদু বৈরালী মাছের নাম থাকলেও এখন পর্যন্ত কোনো দপ্তরই আবেদন করেনি। তেমনি ঠাকুরগাঁওয়ের সূর্যপুরী আম, গাইবান্ধার রসমঞ্জুরি ও কুড়িগ্রামের ক্ষীরমোহন মিষ্টি জিআই পণ্য সম্ভাব্য তালিকায় রয়েছে। এ চারটি পণ্যের সংশ্লিষ্ট বিভাগ থেকে আবেদন না করায় জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতির বিষয়টি ঝুলে রয়েছে।

বৈরালী মাছ রংপুরের মানুষের অহংকার। রুপালি এ মাছটি দেখতে যেমন সুন্দর তেমনি খেতেও সুস্বাদু। তিস্তা নদীতে এ মাছ সবচেয়ে বেশি পাওয়া যায়। দেশের অন্য অঞ্চলে এ মাছ খুব একটা পাওয়া যায় না। বৈরালী মাছ সর্বোচ্চ ৬-৭ ইঞ্চি বা ১০ সেন্টিমিটার লম্বা এবং প্রস্থে প্রায় এক ইঞ্চি হয়ে থাকে। রুপালি রঙের মাছটির গায়ে ছোট ছোট আঁশ, পিঠের রং হালকা মেটে। পেটের নিচে হলুদ দাগ থাকে। মাছটিতে পুঁটি মাছের মতো কাঁটা থাকলেও তা নরম। বৈরালী মাছ গ্রীষ্মে বংশ বিস্তার করে। মাছটি সুস্বাদু এবং অনুপুষ্টি উপাদানসমৃদ্ধ হওয়ায় রংপুর অঞ্চলে খুব জনপ্রিয়। চার প্রকারের বৈরালী মাছ পাওয়া যায়। তিস্তা নদী ও চিকলী, ঘাঘট, বুড়ি তিস্তা নদী এবং ব্রক্ষ্মপুত্র নদে তাদের বেশি দেখা যায়। বিশেষ করে তিস্তা নদীবেষ্টিত রংপুরে গঙ্গাচড়া, কাউনিয়া, পীরগাছা, লালমনিরহাট এবং নীলফামারীর তিস্তা ব্যারাজ এলাকায় এ মাছ নিয়মিত পাওয়া যায়। আকার ভেদে এ মাছ ৫০০ থেকে ৮০০ টাকা পর্যন্ত প্রতি কেজি বিক্রি হয়। বৈরালী মাছ আঞ্চলিক অর্থনীতিতে অবদান রাখছে। কিন্তু মৎস্য বিভাগ এ মাছটির জিআই পণ্যের স্বীকৃতির জন্য এখনো আবেদন করেনি।

ঠাকুরগাঁও জেলার অতি সুস্বাদু ও ঐতিহ্যবাহী আম সূর্যপুরী। মিষ্টি স্বাদ, চমৎকার ঘ্রাণ ও রসালো বৈশিষ্ট্যের জন্য এটি বেশ জনপ্রিয়। এ আম সাধারণত মাঝারি আকারের হয় এবং প্রতিটি আমের ওজন প্রায় ২০০ থেকে ২৫০ গ্রামের মতো হয়ে থাকে। এতে আঁশের পরিমাণ খুব কম থাকে এবং এটি বেশ রসালো। ঠাকুরগাঁও জেলার বালিয়াডাঙ্গী উপজেলায় সূর্যপুরী আমের সবচেয়ে বেশি ফলন দেখা যায়। ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার মণ্ডুমালা গ্রামের শতাব্দী প্রাচীন সূর্যপুরী আম গাছ রয়েছে। প্রায় ২০০ থেকে ২২০ বছরের পুরোনো এ গাছটি প্রায় দুই বিঘা জায়গাজুড়ে বিস্তৃত। এ গাছটিকে এশিয়া মহাদেশের সবচেয়ে বড় আম গাছ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ এ গাছটি দেখতে আসেন। সম্প্রতি সূর্যপুরী আমের জিআই পণ্যের দাবিতে স্থানীয়রা স্থানীয় প্রশাসনের কাছে স্মারকলিপি দিয়েছেন। তবে আনুষ্ঠানিকভাবে এ আমের জন্য এখনো আবেদন করা হয়নি।

গাইবান্ধার রসমঞ্জুরি শুধু একটি মিষ্টি নয়, এটি শহরের ঐতিহ্যের অংশ। এর স্বাদ এতটাই অনন্য যে, না খেলে তা বোঝা যায় না। স্থানীয়দের মতে, ১৯৪৮ সালের জুন মাসে গাইবান্ধার সার্কুলার রোডে ‘রমেশ সুইটস’-এর কর্ণধার রমেশ চন্দ্র ঘোষ প্রথম রসমঞ্জুরি তৈরি করেন। ভারতের ওড়িশা থেকে আনা কারিগরদের সহায়তায় তিনি এ মিষ্টি তৈরির কাজ শুরু করেন। ধীরে ধীরে এর অতুলনীয় স্বাদে মুগ্ধ হতে শুরু করে সবাই। রসমঞ্জুরি জনপ্রিয় হতে থাকে। দেশের বিভিন্ন এলাকা ও বিদেশেও এর ব্যাপক সুনাম ছড়িয়ে পড়ে। এ পণ্যটির জিআই পণ্যের জন্য এখনো আবেদন করা হয়নি।

কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার ঐতিহ্যবাহী সুস্বাদু মিষ্টি হলো ক্ষীরমোহন। এটি খাঁটি গাভির দুধের ছানা, চিনি এবং পরিমিত মসলা দিয়ে বিশেষভাবে তৈরি করা হয়। স্বাদে অনন্য। এর সুখ্যাতি শুধু দেশে নয়, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশেও ছড়িয়ে পড়েছে। কোনো প্রকার রাসায়নিক ছাড়াই সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক ও খাঁটি উপাদানে এটি তৈরি করা হয়। এটি সাধারণ রসমালাইয়ের চেয়ে কিছুটা শুকনো হলেও এর ভিতরের অংশে ক্ষীর ও চিনির সিরার নিখুঁত মিশ্রণ থাকে। ক্ষীরমোহনের জন্য কুড়িগ্রামের খ্যাতি দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশেও রয়েছে। পেটেন্ট, শিল্প-নকশা ও ট্রেডমার্কস অধিদপ্তরে সহকারী পরিচালক নিহার রঞ্জন বর্মণ বলেন, ‘জিআই পণ্যের সম্ভাব্য তালিকায় বৈরালী মাছ, সূর্যপুরী আম, রসমঞ্জুরি ও ক্ষীরমোহনের নাম রয়েছে। নাম থাকলেও জিআই পণ্যের স্বীকৃতির জন্য সংশ্লিষ্ট জেলাগুলো থেকে আবেদন আসেনি। আবেদন এলে এসব পণ্য জিআই পণ্যের স্বীকৃতি পেতে পারে।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights