ঐতিহ্যের মহাস্থানগড়, পর্যটনে অপার সম্ভাবনা
আবদুর রহমান টুলু, বগুড়া
বগুড়ায় রয়েছে ইতিহাস-ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ মহাস্থানগড়। দেশের প্রাচীনতম প্রত্ননগরী এটি। প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে এখানে গড়ে উঠেছিল পুন্ড্রনগর বা পুন্ড্রবর্ধন নগর। কালের আবর্তে এর বর্তমান নাম মহাস্থানগড়। অসংখ্য প্রাচীন রাজা ও ধর্ম প্রচারকদের বসবাসের কারণে মহাস্থানগড় গুরুত্বপূর্ণ স্থান হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। যিশুখ্রিস্টের জন্মেরও আগে এখানে সভ্য জনপদ গড়ে উঠেছিল, প্রত্নতাত্ত্বিকভাবেই তার প্রমাণ মিলেছে। খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতাব্দী থেকে খ্রিস্টীয় ১৫ শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময়ে এই নগর এক সমৃদ্ধ জনপদ হিসেবে বিস্তার লাভ করে। বেশ কয়েক শতাব্দী পর্যন্ত এখানে মৌর্য, গুপ্ত, পাল ও সামন্ত রাজবংশের রাজারা এখানে রাজত্ব করেন। পরে এখানে ধর্মীয় সংস্কার করতে আসেন ইসলাম ধর্ম প্রচারকরা। বিখ্যাত চীনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাঙ ৬৩৯ থেকে ৬৪৫ খ্রিস্টাব্দের মধ্যবর্তী সময়ে পুন্ড্রনগরে এসেছিলেন। দশম শতকের মধ্যবর্তী সময়ে এখানে রাজত্ব করেন রাজা নরসিংহ বা পরশুরাম। কিংবদন্তি অনুযায়ী রাজা পরশুরাম ছিলেন অত্যাচারী। তাকে উচ্ছেদ করে ইসলাম ধর্মের শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে আসেন হজরত শাহ সুলতান বলখি (রহ.) মাহি সওয়ার। ধর্ম প্রচারক শাহ সুলতান বলখি (রহ.) সম্পর্কে রয়েছে আশ্চর্য কিংবদন্তি। শোনা যায়, তিনি মহাস্থানগড় অর্থাৎ প্রাচীন পুন্ড্রনগরে প্রবেশ করার সময় করতোয়া নদী পার হয়েছিলেন বিশাল আকৃতির মাছের পিঠে চড়ে। এ জন্য তার নামের শেষে উল্লেখ করা হয় মাহি সওয়ার বা ‘মাছের পিঠে আরোহণকারী’। এখনো মহাস্থানগড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে প্রাচীন আমলের অসংখ্য ভবনের ভগ্নাংশ। এখানে প্রায়ই খনন কাজের সময় মাটির নিচ থেকে উঠে আসে ইটের টুকরা বা পোড়ামাটির আসবাবের ভগ্নাংশ। কখনো কখনো পাওয়া যায় ছোটখাটো মূর্তি বা মুদ্রা। দেয়ালের মতো যে বিশাল কাঠামো মহাস্থানগড়কে ঘিরে রেখেছে তার দৈর্ঘ্য ৫০০০ ফুট আর প্রস্থ ৪৫০০ ফুট। সমতল ভূমি থেকে এ দেয়ালের উচ্চতা ১৫ থেকে ৪৫ ফুট। প্রাচীরটি যথেষ্ট চওড়া। ৫ থেকে ১০ ফুট প্রশস্ত এই প্রাচীরের উপরিভাগ দেখলে চীনের গ্রেটওয়ালের কথা মনে পড়বে। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে এখানে কয়েকদফা খনন ও সংস্কার কাজ করা হয়েছে। বর্তমান মহাস্থানগড়ের অন্যতম আকর্ষণ হলো হজরত শাহ সুলতান বলখি (রহ.) মাহি সওয়ারের মাজারটি।
বেহুলা-লখিন্দরের বাসর ঘর : বেহুলা-লখিন্দরের বাসর ঘর বা গোকুল মেধ বগুড়া সদরের গোকুল গ্রামে অবস্থিত একটি প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন। এটি মূলত ৮০৯ থেকে ৮৪৭ খ্রিস্টাব্দে দেবপাল কর্তৃক নির্মিত একটি বৌদ্ধমঠ। এর অবস্থান মহাস্থানগড় থেকে দেড় কিলোমিটার দূরে।
মহাস্থানগড় জাদুঘর : মহাস্থানগড়ের জাদুঘরে আছে পুরোনো মাটির মূর্তি, বাসনপত্র, স্বর্ণবস্তু, ব্রোঞ্জের সামগ্রী, কালো পাথরের মূর্তি, বেলে পাথরের মূর্তি, বিভিন্ন শিলালিপি, মাটি, মূল্যবান পাথর, মার্বেল, পোড়া মাটির পুতুল, নানা ধরনের প্রাচীন অলংকারসহ প্রাচীন ও মূল্যবান নিদর্শন। মহাস্থান প্রত্নতাত্ত্বিক জাদুঘরটি প্রায় আড়াই হাজার বছরের ইতিহাসের এক অনন্য নিদর্শন।
মানকালীর কুণ্ড : বগুড়া জেলার শিবগঞ্জ উপজেলায় রয়েছে প্রাচীন সভ্যতার এক অন্যতম নিদর্শন মানকালীর কুণ্ড। ষাটের দশকের শুরুর দিকে তৎকালীন পাকিস্তান প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর মহাস্থানগড়ের উঁচু টিলার ওপর বিদ্যমান এই নিদর্শনকে প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান হিসেবে নথিভুক্ত করে। ধারণা করা হয়, এই স্থানে সর্বপ্রথম রাজা মানসিংহ ও তাঁর ভাই তানসিংহ একটি মন্দির নির্মাণ করেন, পরবর্তীকালে ঘোড়াঘাটের জমিদাররা এখানে মসজিদ নির্মাণ করেন।
জিয়ৎ কুণ্ড : এটি মহাস্থানগড়ে অবস্থিত একটি কূপ ও অন্যতম প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন। কথিত আছে, রাজা পরশুরাম যখন শাহ সুলতান বলখি মাহি সওয়ারের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছিল, তখন রাজা পরশুরাম তাঁর সৈন্যদের এই কূপের পানির মাধ্যমে আবার জীবিত করতেন। শাহ সুলতান বলখি এ বিষয়টি জানার পর আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেন। পরবর্তীকালে একটি কাক এক টুকরা মাংস মুখে নিয়ে যাওয়ার পথে সেটি কূপে পড়ে যায়। তারপর থেকে কূপটির পানির অলৌকিক ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায়।
পরশুরাম প্যালেস : এটি পরশুরাম প্যালেস নামে পরিচিত। ধারণা করা হয়, এখানে অষ্টক শতক বা পাল আমলের নির্মিত ইমারতের ধ্বংসাবশেষ রয়েছে।
শিলাদেবীর ঘাট : এটি মহাস্থানগড় থেকে প্রায় ২০০ মিটার পূর্বে করতোয়া নদীর তীরে অবস্থিত। লোককাহিনি অনুযায়ী, শীলাদেবী ছিলেন রাজা পরশুরামের বোন। শাহ সুলতান বলখি মাহি সওয়ার, রাজা পরশুরামকে পরাজিত করার পর শীলাদেবী এই স্থানে জলে ডুবে আত্মাহুতি দেন।
ভাসু বিহার : মহাস্থানগড় থেকে প্রায় ছয় কিলোমিটার দূরে এটি অবস্থিত। এটি ‘নরপতির ধাপ’ হিসেবেও বেশ পরিচিত ও অন্যতম প্রাচীন প্রত্ননিদর্শন। ধারণা করা হয়, এটি একটি বৌদ্ধ সংঘারামের ধ্বংসাবশেষ এবং বৌদ্ধ ধর্মীয় বিদ্যাপীঠ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
মহাস্থান জাদুঘরের সহকারী কাস্টোডিয়ান শাহরিয়ার সাফি হাসান বলেন, ‘মহাস্থানগড় জাদুঘরে ৪৪টি শোকেসে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন রাখা হয়েছে। মহাস্থানগড়ের ইতিহাস-ঐতিহ্য দেখতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে পর্যটকরা এখানে আসেন।’ এদিকে প্রতি বছর দেশ-বিদেশ থেকে হাজার হাজার পর্যটক, গবেষক ও দর্শনার্থী এখানে এলেও প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর অভাবে তারা নানা ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, আইনি জটিলতায় দীর্ঘদিন ধরে মহাস্থানগড়ে প্রয়োজনীয় সংস্কার ও দর্শনার্থীবান্ধব উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। পর্যাপ্ত শৌচাগার, বিশ্রামাগার, উন্নতমানের খাবার ব্যবস্থা না থাকা, পার্কিং ও অন্যান্য মৌলিক সুযোগ-সুবিধার অভাব রয়ে গেছে এই নগরীতে। এ ছাড়া নগরীর ভিতরে অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ ও চারদিকে প্রাচীর নির্মাণ জরুরি।
