কয়েকটি মৃত্যু ও রবীন্দ্রনাথ

মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্

স্বজন হারানোর বেদনা রবীন্দ্রনাথের হৃদয়ে কঠিনভাবে আঘাত হেনেছে, কখনো কখনো তিনি ভেঙে পড়েছেন কিন্তু পরক্ষণেই সমস্ত কিছু এক বিরাট শক্তিবলে আত্মস্থ করেছেন, মনকে শান্ত করেছেন ধীরে ধীরে

রবীন্দ্রনাথের জীবন এবং সাহিত্য ভুবন- দুটোই বিশাল এবং ব্যাপক। আশি বছরের ঈর্ষণীয় জীবনে ষাট বছরের অধিককাল সাহিত্যচর্চার মধ্য দিয়ে বাংলা সাহিত্যকে তিনি যে সমৃদ্ধতর করে গেছেন, সেই সমৃদ্ধির ইতিহাস ছোট নয়। বক্ষ্যমাণ লেখাটির বিষয় রবীন্দ্রনাথের কোনো সাহিত্যকর্ম নয়। একসময় রবীন্দ্রনাথের জীবনে কয়েকটি মৃত্যু ভিন্ন ইঙ্গিত বয়ে এনেছিল, সেই বিষয়ে আলোকপাতের চেষ্টা মাত্র। মৃত্যুর করাল ছায়া যাঁদের গ্রাস করেছিল তাঁরা ছিলেন রবীন্দ্রনাথের একেবারে কাছের মানুষ, প্রিয়জন। এত মৃত্যুশোক কি রবীন্দ্রনাথকে বিচলিত করতে পেরেছিল? ভিতরে ভিতরে তাঁর চিত্ত তোলপাড় করলেও বাইরে তিনি ছিলেন স্থির, অটল, হিমালয়ের মতোই।

প্রথম আঘাত আসে ১৮৭৫-এ, মা সারদা দেবীর মৃত্যুতে। রবীন্দ্রনাথের বয়স তখন মাত্র ১৪ বছর। ১১ মার্চ রাতে মায়ের যখন মৃত্যু হয়, তখন বালক রবীন্দ্রনাথ নিদ্রায় আচ্ছন্ন। পরদিন ভোরে তিনি পেলেন মায়ের মৃত্যু সংবাদ। প্রথম মৃত্যুশোক তাঁকে কতটুকু ব্যথাতুর করে তুলেছিল? দ্বিতীয় মৃত্যুশোক রবীন্দ্রনাথের হৃদয়ে কঠিনভাবে বেজেছিল। সে মৃত্যু বৌঠান কাদম্বরী দেবীর। কবির তখন তরুণ বয়স। মায়ের মৃত্যুশোককে আড়াল করে রেখেছিলেন দাদা জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ও বৌঠান কাদম্বরী দেবী। রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য চিন্তার উন্মেষলগ্নে তাঁর বড় উৎস ছিলেন নতুন বৌঠান। কম বয়সে কাদম্বরী দেবী ঠাকুর পরিবারে বধূ হয়ে আসেন। বালক রবি যেন ছিল তাঁর পরম সখা। এক বিপুল স্নেহে তিনি রবীন্দ্রনাথকে ঢেকে রেখেছিলেন সব হতাশা ও বেদনার বাইরে। রবীন্দ্রনাথের সব রচনাকর্মের তিনি ছিলেন একজন গুণমুগ্ধ শ্রোতা। মাত্র ২৩ বছর বয়সে রবীন্দ্রনাথ যে তেরখানি গ্রন্থ প্রকাশ করেন, তার মধ্যে চারটি তিনি উৎসর্গ করেন কাদম্বরী দেবীকে, তিনটি জ্যোতিরিন্দ্রনাথকে। আবাল্যের সঙ্গী কাদম্বরী দেবীর মৃত্যুশোক কিছুদিনের জন্য হলেও রবীন্দ্রনাথকে উ™£ান্ত করে তুলেছিল। কাদম্বরী দেবী যখন আত্মহত্যা করেন, (সে আত্মহত্যার কারণ আজও রহস্যাবৃত) তখন তাঁর বয়স ২৫ বছর। এর মাত্র কয়েক মাস আগে রবীন্দ্রনাথ বিয়ে করেন মৃণালিনী দেবীকে। কাদম্বরী দেবীর মৃত্যুর তারিখ ছিল ১৯ এপ্রিল ১৮৮৪ সাল। এই করুণ মৃত্যু রবীন্দ্রনাথের হৃদয়কে কতটা ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছিল, সে সম্পর্কে তিনি বলেছেন-

‘আমার ২৪ বছর বয়সের সময় মৃত্যুর সঙ্গে যে পরিচয় হইল তাহা স্থায়ী পরিচয়। পরবর্তী প্রত্যেক বিচ্ছেদ শোকের সঙ্গে মিলিয়া অশ্রুর মালা দীর্ঘ করিয়া গাঁথিয়া চলিয়াছে। শিশু বয়সের লঘু জীবন বড়ো বড়ো মৃত্যুকেও অনায়াসে পাশ কাটাইয়া ছুটিয়া যায়, কিন্তু অধিক বয়সে মৃত্যুকে অত সহজে ফাঁকি দিয়া এড়াইয়া চলিবার পথ নাই। তাই সেদিনকার সব দুঃসহ আঘাত বুক পাতিয়া লইতে হইয়াছিল।’

কাদম্বরী দেবীর অস্বাভাবিক মৃত্যুর দুঃসহ যন্ত্রণা রবীন্দ্রনাথকে যে কী পরিমাণ ক্ষতবিক্ষত করেছিল, একটি উদ্ধৃতিতে তার প্রমাণ মিলবে-

‘বেশ কিছুদিন স্বাভাবিক জীবনযাত্রার পথ থেকে অনেকটাই দূরে সরে গেলেন তরুণ রবি। রাত্তিরে ঘুমোন না; অন্ধকার ছাদে ঘুরে বেড়ান একা একা, কখনো বা স্তব্ধ হয়ে বসে থাকেন রাতের অন্ধকারে। ভোরের দিকে ঘুম এলে যেখানে সেখানে শুয়ে থাকেন। এমনকি প্রবল বর্ষা এবং দারুণ শীতেও তিনতলার খোলা বারান্দায় রাতের পর রাত কাটাতে কিছুমাত্র অসুবিধা অনুভব করেননি।’ শুধু তাই নয়, ১৯৪১ সালে, মৃত্যুর কয়েকদিন আগে রোগশয্যায় রবীন্দ্রনাথ বৌঠান কাদম্বরী দেবীর ছবি দেখার ইচ্ছে প্রকাশ করেছিলেন। সে ছবি তখন খুঁজে পাওয়া যায়নি। কিছুদিন পর পাওয়া যখন গেল, তখন রবীন্দ্রনাথ আর এ জগতে নেই। ১৮৯৯ সালের দিকে যখন রবীন্দ্রনাথের বিরুদ্ধে সুরেশচন্দ্র সমাজপতি, ডি, এল রায় প্রমুখ বিষোদগারে রত, সেই সময় মাত্র ২৯ বছর বয়সে ভাইপো বলেন্দ্রনাথ ঠাকুরের মৃত্যু হয়। বলেন্দ্রনাথকে রবীন্দ্রনাথ ভীষণ ভালোবাসতেন, তার কারণ, ওই বয়সে বলেন্দ্রনাথের বাংলা সাহিত্যের ওপর দক্ষতা, তাঁর ভাষাজ্ঞান কবিকে চমৎকৃত করেছিল। রবীন্দ্রনাথ আশা করেছিলেন ভবিষ্যতে বলেন্দ্রনাথ বাংলা সাহিত্যে এক বিশেষ আসন লাভ করবে। কিন্তু তাঁর অকালমৃত্যু সে সম্ভাবনাকে মেলে ধরতে পারল না। এরপর ১৯০২ সালে ওই ২৯ বছর বয়সেই রবীন্দ্রনাথের স্ত্রী মৃণালিনী দেবী মারা যান। স্ত্রীর রোগশয্যায় রবীন্দ্রনাথ দিনরাত বসে থাকতেন। স্ত্রীর প্রতি এক গোপন ভালোবাসা (যে ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ ছিল কম) যে তিনি লালন করতেন এই সময়ে যেন তা প্রকাশ হয়ে পড়ে। অনেক রবীন্দ্র-আলোচক বলে থাকেন তাঁর বিখ্যাত ‘ছবি’ কবিতাটি নাকি মৃণালিনী দেবীর উদ্দেশেই লেখা। স্ত্রীর মৃত্যুতেও রবীন্দ্রনাথ থেকেছেন স্থির, অচঞ্চল। কথিত আছে, মৃণালিনী দেবীর মৃত্যুর পর তাঁর চটিজোড়া সংগ্রহ করে রবীন্দ্রনাথ তাঁর ছেলে রথীন্দ্রনাথের হাতে তুলে দিয়ে ঈষৎ কম্পিত কণ্ঠে বলেছিলেন- ‘ঐটা তোর মায়ের খুব প্রিয় চটি, তোর কাছে যত্ন করে রেখে দিস; হারাস না। তোকেই দিলুম।’ রথীন্দ্রনাথ সেই চটিজোড়া আজীবন সংরক্ষণ করেছিলেন সযত্নে। এক তথ্য থেকে জানা যায়, সেটি এখনো শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রসদনে রক্ষিত আছে।

এরপরের মৃত্যুগুলো রবীন্দ্রনাথের ছেলেমেয়ের এবং পিতা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের। রবীন্দ্রনাথের দুই ছেলে থাকতেই রবীন্দ্রনাথ বড় মেয়ে বেলা ও মেজ মেয়ে রেণুকার বিয়ে দিয়েছিলেন, যখন তাঁদের বয়স যথাক্রমে ১৪ ও সাড়ে ১১। এদের বিয়ে হয় মাত্র দেড় মাসের ব্যবধানে। বেলার বিয়ে হয় বিখ্যাত কবি বিহারীলাল চক্রবর্তীর চতুর্থ ছেলে শরৎচন্দ্র চক্রবর্তীর সঙ্গে। শরৎচন্দ্র ছিলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শনশাস্ত্রে প্রথম শ্রেণির এম, এ। ল-ও পাস করেছিলেন, তাই ওকালতিকে পেশা হিসেবে নিয়েছিলেন। রেণুকার স্বামী সত্যেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য, পেশায় ডাক্তার। ১৯০৩ সালে মাত্র ১৩ বছর বয়সে মেজ মেয়ে রেণুকা যক্ষ্মায় মারা যান। অর্থাৎ বিয়ের দেড় বছর পরে ও মায়ের মৃত্যুর দশ মাসের মধ্যেই রেণুকার মৃত্যু হয়। এই মেয়েকে রবীন্দ্রনাথ সবচেয়ে বেশি ভালোবাসতেন, কারণ তাঁর অন্য ছেলেমেয়ের মধ্যে রেণুকা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের। এহেন রেণুকাকে রবীন্দ্রনাথই আগলাতেন। মেয়েকে স্নেহে কাছে টেনে নিয়ে বলতেন- ‘ও হলোই বা একটু আলাদা রকমের, তাতে ক্ষতি কী?’ ১৯০৫ সালে পরিণত বয়সে মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮১৭-১৯০৫) মারা যান। এর পরের মৃত্যু ছোটছেলে শমীন্দ্রনাথের। ১৯০৭ সালের ২৩ নভেম্বর শমীন্দ্রনাথের কলেরায় মৃত্যু হয়। মুঙ্গেরে বেড়াতে গিয়ে আর ফেরা হলো না। খবর পেয়ে রবীন্দ্রনাথ সেখানে পৌঁছে দেখেন ছেলের শেষ অবস্থা। ভোরের দিকে শমীন্দ্রনাথ মারা যায়, তখন তার বয়স মাত্র ১৩। ছেলের মৃত্যুতে রবীন্দ্রনাথ প্রথমে স্তব্ধ হয়ে যান। কিন্তু পরেই তাঁর ভিতরের ব্যাকুল কান্না অশ্রু হয়ে ঝরে পড়ে। রবীন্দ্রজীবনীতে জানা যায়, রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে শমীন্দ্রনাথের আকৃতিগত ও প্রকৃতিগত একটা মিল ছিল। এমনকি সেই বয়সে শমীন্দ্রনাথের ভিতরে সাহিত্য প্রতিভার অনেক লক্ষণ দেখা গিয়েছিল।

১৯১৮ সালের ১৬ মে বড় মেয়ে মাধুরীলতার (বেলা) যখন যক্ষ্মায় মৃত্যু হয়, তখন তাঁর বয়স ৩২ বছর। বাড়ির বড় মেয়ে হিসেবে সবার আদর বেলা নিয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথ মেয়ের বিয়ে দেওয়ার পর মেয়েজামাইকে ঠাকুর বাড়িতেই রেখেছিলেন। কিন্তু কী এক তিক্ততার কারণে জামাই মেয়েকে নিয়ে অন্যত্র চলে যান। তবু রবীন্দ্রনাথ মেয়েকে প্রতিদিন দেখতে যেতেন। বেলা বাঁচবে না এটা রবীন্দ্রনাথ বুঝতে পেরেই শান্তি নিকেতন থেকে রথীন্দ্রনাথকে লেখা এক চিঠিতে এ সম্পর্কে বলেছেন-

‘কাল থেকে কলকাতা যাবার জন্য মনটা দ্বিধা করছে। জানি বেলার যাবার সময় হয়েছে। আমি গিয়ে তার মুখের দিকে তাকাতে পারি, এ শক্তি আমার নেই। আমি এখানে থেকে বেলার জন্য যাত্রাকালের কল্যাণ কামনা করছি। জানি আমার আর কিছুই করবার নেই।’ এখানে একটা ব্যাপার লক্ষণীয়, তা হলো- উপরের কয়েকটি মৃত্যু অত্যন্ত কাছাকাছি সময়ের। আর অদ্ভুত সাদৃশ্য এই যে, মায়ের মৃত্যুর সময় রবীন্দ্রনাথের বয়স ছিল ১৪ বছর। মৃণালিনী দেবীর মৃত্যুর সময় রথীন্দ্রনাথের বয়সও ছিল ১৪ বছর। আবার মেজ মেয়ে রেণুকার মৃত্যুর সময় তার বয়স ছিল ১৩ বছর, ছোট ছেলে শমীন্দ্রনাথের মৃত্যুর সময় তার বয়সও ছিল ১৩ বছর। এই অদ্ভুত সাদৃশ্যগুলোকে কাকতালীয় ব্যাপার ছাড়া কী বলা যেতে পারে? উল্লেখ্য, ঠাকুর পরিবারে যাঁরা মারা গেছেন তাঁরা কম বয়সেই মারা গেছেন, আর যারা বেঁচে ছিলেন তাঁরা ঈর্ষণীয় দীর্ঘজীবন লাভ করেছিলেন।

আরও কয়েকটি মৃত্যু রবীন্দ্রনাথের জীবদ্দশাতেই ঘটে। এ মৃত্যুগুলোও খুব কাছাকাছি সময়ের। যেমন ১৯২৩ সালে সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর, ১৯২৫ সালে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর, ১৯২৬ সালে দ্বিজেন্দ্রনাথ, ১৯৩২ সালে ভগ্নি স্বর্ণকুমারী দেবী এবং ওই বছরই রবীন্দ্রনাথের ছোট মেয়ে মীরা দেবীর একমাত্র পুত্র নীতিন্দ্রনাথ জার্মানিতে মারা যান, তখন তার বয়স মাত্র ২০ বছর।

এখানে স্মরণ করা যেতে পারে মীরা দেবীকে লেখা একটি চিঠি, যে চিঠিতে রবীন্দ্রনাথ ২৫ বছর আগে মৃত শমীন্দ্রনাথকেও স্মরণ করেছেন-

‘যে রাত্রে শমী গিয়েছিল, সে রাতে সমস্ত মন দিয়ে বলেছিলেম- বিরাট বিশ্বসত্তার মধ্যে তার অবাধ গতি হোক। আমার শোক তাকে যেন একটুও পেছনে না টানে। তেমনি নীতুর চলে যাওয়ার কথা যখন শুনলুম, তখন বারবার করে বলেছি এরপর যে বিরাটের মধ্যে তার গতি, সেখানে তার কল্যাণ হোক।’

উপরের চিঠির সূত্রের রেশ ধরে বলা যেতে পারে, স্বজন হারানোর বেদনা রবীন্দ্রনাথের হৃদয়ে কঠিনভাবে আঘাত হেনেছে, কখনো কখনো তিনি ভেঙে পড়েছেন কিন্তু পরক্ষণেই সমস্ত কিছু এক বিরাট শক্তিবলে আত্মস্থ করেছেন, মনকে শান্ত করেছেন ধীরে ধীরে। যা ঘটে যাচ্ছে তাকে স্বীকার করে নিয়ে আরও বৃহৎ কর্মক্ষেত্রে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন। সাহিত্য-শিল্প-সংস্কৃতির ভুবনে মহৎ সৃষ্টির অভিপ্রায়ে ধ্যানস্থ ঋষির মতো মগ্ন হয়ে থেকেছেন। সম্ভবত এ কারণেই বলা হয়ে থাকে, রবীন্দ্রনাথের তুলনা রবীন্দ্রনাথ নিজেই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights