কর্মশালার আমন্ত্রণ জানিয়ে মার্কিন গবেষককে আটক করল চীন, বেইজিং-ওয়াশিংটন উত্তেজনা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

একটি তিন দিনব্যাপী অ্যাকাডেমিক কর্মশালায় যোগ দিতে গিয়ে চীনে রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হওয়ার পর অবশেষে মিয়ানমার বংশোদ্ভূত এক মার্কিন গবেষকের বন্দি হওয়ার খবর নিশ্চিত করেছে ওয়াশিংটন। আটককৃত গবেষকের নাম মিন জিন।

গত ৩ জুন চীনের ইউনান প্রদেশে পৌঁছানোর পরপরই তাকে নিরাপত্তা বাহিনীর হেফাজতে নেওয়া হয়। পরবর্তীতে ৫ জুন গুয়াংজুস্থ মার্কিন কনস্যুলেট জেনারেল মিন জিনের পরিবারকে জানায় যে, চীনের জাতীয় নিরাপত্তা বিঘ্নিত করার অভিযোগে তাকে আটক করা হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সরকার ও জিনের পরিবার এই অভিযোগকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে দাবি করলেও বেইজিং তাকে ‘আইনি বিধিনিষেধের’ আওতায় রাখার কথা জানিয়েছে। ওয়াশিংটন অভিযোগ করেছে, সরকারি স্বীকৃত প্রতিষ্ঠানের আমন্ত্রণে চীনে যাওয়া এই মার্কিন নাগরিককে পরিকল্পিতভাবে ফাঁদে ফেলেছে চীনা গোয়েন্দা সংস্থা।

ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ থেকে জানা যায়, অর্থনৈতিক সহযোগিতা-সংক্রান্ত একটি কর্মশালায় যোগ দিতে গত ৩ জুন চায়না ইস্টার্ন এয়ারলাইন্সের ‘৯৬৪০’ নম্বর ফ্লাইটে থাইল্যান্ডের চিয়াং মাই থেকে চীনের কুমিং উদ্দেশে রওনা হন মিন জিন। কুমিং বিমানবন্দরে অবতরণ করার পর তিনি তার পরিবার এবং তাকে আমন্ত্রণ জানানো চীনা অধ্যাপককে ‌‘জাস্ট ল্যান্ডেড ইন কুমিং’ লিখে একটি বার্তা পাঠান। কিন্তু এর পরপরই তার ফোন ও যোগাযোগের সমস্ত মাধ্যম বন্ধ হয়ে যায়। তিনি নির্ধারিত হোটেলে চেক-ইনও করেননি। তার ফোনের লোকেশন ট্র্যাক করে দেখা যায়, সেটি কুমিং বিমানবন্দর থেকে প্রায় ৪০ মাইল দূরে আননিং-এর লিয়ানরান নামক একটি এলাকায় অবস্থান করছে। এর কিছুক্ষণ পরেই ডিভাইসটির লোকেশন পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

পরদিন মিন জিনের স্ত্রী সিলভিয়া জিন একটি চীনা নম্বর থেকে একটি অপ্রত্যাশিত ফোন কল পান। ফোনের অপর প্রান্তের ব্যক্তি তাকে একটি ‘বাধ্যতামূলক প্রাথমিক তদন্তের’ কথা বলেন, যা চীনের নিরাপত্তা মন্ত্রণালয়ের (মিনিস্ট্রি অব স্টেট সিকিউরিটি) সঙ্গে সম্পর্কিত বলে অনুমান করা হয়। সিলভিয়া জিন তার স্বামী আটক হয়েছেন কি না, তা জানতে চাইলে বার্তা প্রদানকারী ব্যক্তি তাৎক্ষণিকভাবে লাইনটি কেটে দেন। পরবর্তীতে মার্কিন কনস্যুলেটের হস্তক্ষেপে জানা যায়, চীনে তাকে একটি গোপন ও নজরদারিযুক্ত স্থানে আটক রাখা হয়েছে। দেশটির আইন অনুযায়ী কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ দায়ের বা গ্রেফতার দেখানোর আগে সর্বোচ্চ ছয় মাস এ ধরনের গোপন স্থানে রেখে জিজ্ঞাসাবাদের সুযোগ রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের কনস্যুলার মারফত পরিবারের প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, মিন জিনকে একটি ছোট এবং জানালাবিহীন অন্ধকার কক্ষে রাখা হয়েছে, যেখানে দিন-রাত সার্বক্ষণিকভাবে তীব্র আলো জ্বেলে রাখা হয় এবং তিনি প্রহরী দ্বারা ২৪ ঘণ্টা নজরদারিতে থাকেন। তাকে বাইরে যাওয়া বা সূর্যালোক দেখার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না। প্রতিদিন গড়ে চার থেকে ছয় ঘণ্টা, এমনকি কখনো তার চেয়েও বেশি সময় ধরে তাকে কঠোর জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। দিনের বাকি সময়টা তিনি ধ্যানে (মেডিটেশন) কাটান। এ পর্যন্ত তাকে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বা কোনো চিঠি আদান-প্রদান করতে দেওয়া হয়নি। আটক হওয়ার পর থেকে মার্কিন কনস্যুলার কর্মকর্তারা কড়া নিরাপত্তায় একটি হোটেলের কনফারেন্স রুমে তিনবার তার সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ পেয়েছেন। প্রতিটি সাক্ষাৎকার মাত্র ৩০ মিনিটের জন্য নির্ধারিত ছিল এবং চীনা কর্মকর্তাদের উপস্থিতির কারণে তার মামলার আইনগত বিষয় নিয়ে কোনো আলোচনার অনুমতি দেওয়া হয়নি। শারীরিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকলেও হাঁটুর তীব্র ব্যথায় ভুগছেন বলে মিন জিন কর্মকর্তাদের জানিয়েছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দফতর মিন জিনের এই আটকাদেশকে সম্পূর্ণ বেআইনি এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেছে। ওয়াশিংটনের দাবি, অতীতে মিয়ানমারে সামরিক শাসনবিরোধী ১৯৮৮ সালের ছাত্র আন্দোলনে মিন জিনের সক্রিয় ভূমিকা এবং পরবর্তীতে মার্কিন সরকারি অনুদানে তার পরিচালিত গবেষণাই মূলত চীনা গোয়েন্দাদের নজরদারির কারণ হতে পারে। বেইজিংয়ে জন্মগ্রহণকারী মার্কিন ভূকম্পনবিদ ইউলিন চেনের পর মিন জিন হলেন দ্বিতীয় কোনো আমেরিকান নাগরিক, যাকে চীনের মাটিতে ‘অন্যায়ভাবে আটক’ হিসেবে মার্কিন সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে তালিকাভুক্ত করল। ইউলিন চেনও ২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে একই ধরনের গোয়েন্দাগিরির অভিযোগে চীনে বন্দি রয়েছেন।

অন্যদিকে, চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও ওয়াশিংটনস্থ চীনা দূতাবাসের মুখপাত্র এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে জানিয়েছেন, মিন জিনের বিরুদ্ধে আইনানুগ ‘ফৌজদারি বাধ্যতামূলক ব্যবস্থা’ গ্রহণ করা হয়েছে এবং তার মৌলিক আইনি অধিকার নিশ্চিত করা হচ্ছে।

অথচ মিন জিনের পরিবারের দাবি, তিনি ইতিপূর্বেও আন্তর্জাতিক গবেষণা কাজে একাধিকবার চীনে সফর করেছেন এবং সবশেষ ২০২৫ সালের অক্টোবরেও চীনা সরকার-সমর্থিত একটি অ্যাকাডেমিক সম্মেলনে অংশ নিয়েছিলেন। ফলে এবারও আমন্ত্রণ গ্রহণ করার সময় তাদের মনে কোনো ধরনের আশঙ্কা বা সন্দেহের অবকাশ ছিল না। মিন জিনের অবিলম্বে ও নিঃশর্ত মুক্তির দাবিতে মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর এখন বেইজিংয়ের ওপর চাপ বৃদ্ধি করছে।

সূত্র: এনডিটিভি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights