কারাগারের অভিজ্ঞতায় বদলে গেল ইতালির কট্টর ডানপন্থী নেতার দৃষ্টিভঙ্গি
অনলাইন ডেস্ক
দীর্ঘদিন কঠোর আইন-শৃঙ্খলা নীতির প্রবল সমর্থক হিসেবে পরিচিত ইতালির কট্টর ডানপন্থী নেতা ও রোমের সাবেক মেয়র জিয়ান্নি আলেমান্নো এবার কারাগারের মানবিক পরিবেশ ও বন্দিদের অধিকার নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলছেন। ১৮ মাস কারাভোগের অভিজ্ঞতা তাকে কারা ব্যবস্থার নানা সীমাবদ্ধতা নতুনভাবে উপলব্ধি করতে সাহায্য করেছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
৬৮ বছর বয়সী জিয়ান্নি আলেমান্নো গত ২৪ জুন ইতালির অন্যতম বৃহৎ কারাগার রোমের রেবিব্বিয়া কারাগার থেকে মুক্তি পান। অতিরিক্ত বন্দি ও জরাজীর্ণ অবকাঠামোর কারণে দীর্ঘদিন ধরেই কারাগারটি সমালোচনার মুখে রয়েছে। প্রভাব খাটানো ও দায়িত্বের অপব্যবহারের মামলায় দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর তিনি ১৮ মাস সেখানে কারাভোগ করেন, যদিও শুরু থেকেই তিনি অভিযোগগুলো অস্বীকার করে আসছেন।
কারাবন্দি অবস্থায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিয়মিত নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন আলেমান্নো। তার লেখাগুলো ইতালির কারাগার ব্যবস্থার নানা সমস্যা নিয়ে নতুন করে জনমত তৈরিতে ভূমিকা রাখে। রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “যারা কারাগারে থেকেছেন বা যাদের পরিবারের কেউ কারাগারে আছেন, শুধু তারাই এই সমস্যাগুলো বুঝতে পারেন। অন্যরা বিষয়টি বুঝতেই পারেন না।”
রেবিব্বিয়া কারাগারে এটি তার প্রথম অভিজ্ঞতা নয়। ১৯৮২ সালে কট্টর ডানপন্থীদের এক বিক্ষোভে সোভিয়েত দূতাবাসে মলোটভ ককটেল নিক্ষেপের ঘটনায় তিনি ১০ মাস কারাভোগ করেছিলেন। গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর আবার একই কারাগারে গিয়ে কাকতালীয়ভাবে সেই পুরোনো সেলেই থাকার সুযোগ পান। স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, “এই সেল থেকেই আমি ১৯৮২ সালে ইতালির ফুটবল বিশ্বকাপ জয় দেখেছিলাম।”
ডানপন্থী রাজনীতির পরিচিত মুখ আলেমান্নো রাজনৈতিক জীবন শুরু করেন ফ্যাসিবাদ-পরবর্তী এমএসআই দলের যুব শাখায়। পরে সাবেক প্রধানমন্ত্রী সিলভিও বেরলুসকোনির সরকারে কৃষিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৮ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত তিনি রোমের মেয়র ছিলেন।
কারামুক্তির পর তিনি দাবি করছেন, ইতালির কারাগার ব্যবস্থায় অতিরিক্ত বন্দি, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, বিচার বিভাগে জনবল সংকট, জটিল প্রশাসনিক কাঠামো এবং শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের সুযোগের অভাব পুরো ব্যবস্থাকে অকার্যকর করে তুলেছে। তার মতে, বর্তমান কারা ব্যবস্থা অপরাধীদের সংশোধনের পরিবর্তে অনেক ক্ষেত্রে পুনরায় অপরাধের দিকে ঠেলে দেয়। আলেমান্নো বলেন, “যারা খারাপ কাজ করতে চান, তাদের জন্য সব পথ খোলা। কিন্তু যারা নতুনভাবে জীবন শুরু করতে চান, তাদের সামনে অসংখ্য বাধা তৈরি করা হয়।”
কারাগারে থাকার সময় হত্যাকাণ্ডে সহযোগিতার দায়ে দণ্ডপ্রাপ্ত এক সহবন্দীর সঙ্গে যৌথভাবে ফেসবুকে একটি ডায়েরি লিখেছিলেন তিনি। সেই লেখাগুলো শিগগিরই বই আকারে প্রকাশের পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানিয়েছেন। কারামুক্তির পর সাবেক সেনা জেনারেল রোবের্তো ভান্নাচ্চির সঙ্গে রাজনৈতিকভাবে কাজ শুরু করেছেন আলেমান্নো। কট্টর ডানপন্থী অবস্থান ও বিতর্কিত বক্তব্যের জন্য পরিচিত ভান্নাচ্চির নতুন রাজনৈতিক দল ধীরে ধীরে জনপ্রিয়তা পাচ্ছে।
তবে কারাগার নিয়ে দুই নেতার অবস্থানে স্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে। আলেমান্নো মুক্তি পাওয়ার দিন ভান্নাচ্চি সাংবাদিকদের বলেন, “আবেল আর কাইনের মধ্যে আমি আবেলের পক্ষেই আছি। কাইনের কারাগারেই পচে থাকা উচিত।” তিনি গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে আরও কঠোর ও দীর্ঘমেয়াদি শাস্তির পক্ষে মত দেন।
এদিকে প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির নেতৃত্বাধীন ডানপন্থী সরকার গত জুলাইয়ে কারাগারের ধারণক্ষমতা ১৫ হাজার বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দেয়। পাশাপাশি মাদকাসক্ত বন্দিদের চিকিৎসাকেন্দ্রে পাঠানোর প্রক্রিয়া সহজ করার পরিকল্পনার কথাও জানানো হয়, যাতে কারাগারের অতিরিক্ত ভিড় কমানো যায়।
তবে ঘোষণার পরও এখন পর্যন্ত নতুন কোনো কারাগার নির্মাণ শুরু হয়নি। বন্দিদের স্থানান্তরসংক্রান্ত প্রস্তাবিত আইনও এখনো আলোচনার পর্যায়ে রয়েছে। ২০২৭ সালে বর্তমান সংসদের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে আইনটি পাস না হলে তা বাতিল হয়ে যেতে পারে।
বর্তমানে ইতালির কারাগারগুলো ইউরোপের সবচেয়ে বেশি ভিড়পূর্ণ কারাগারগুলোর মধ্যে অন্যতম। ধারণক্ষমতার তুলনায় সেখানে প্রায় ১৪০ শতাংশ বন্দি অবস্থান করছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ক্ষমতাসীন জোট ও মধ্য-বাম বিরোধী জোটের জনসমর্থন বর্তমানে প্রায় সমান। ফলে আইন-শৃঙ্খলা ইস্যুতে কঠোর অবস্থান ধরে রেখে সরকার বড় ধরনের কারাগার সংস্কারে এগোবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
তবে আলেমান্নো মনে করেন, কারাগার সংস্কার এমন একটি বিষয়, যেখানে রাজনৈতিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে সব দলের ঐক্যবদ্ধ হওয়া প্রয়োজন। তার ভাষায়, “এটি এমন একটি লড়াই, যেখানে বাম ও ডান- উভয় পক্ষকেই একসঙ্গে আসতে হবে।”
তথ্য সূত্র : রয়টার্স
