কুমেক হাসপাতালে ‘অ্যাম্বুলেন্স দালাল চক্রে’ জিম্মি রোগী-স্বজন
মহিউদ্দিন মোল্লা, কুমিল্লা
কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ (কুমেক) হাসপাতাল ঘিরে একটি শক্তিশালী ‘অ্যাম্বুলেন্স দালাল চক্র’ গড়ে উঠেছে। চক্রটি প্রতিনিয়ত চিকিৎসা নিতে আসা রোগী ও তাদের স্বজনদের ফাঁদে ফেলছেন।
অভিযোগ মিলেছে, দালালেরা বেশি ভয়ংকর হয়ে ওঠে রাত নামলে। তাদের খপ্পরে পড়ে চিকিৎসায় বাড়তি টাকা গুনতে হচ্ছে রোগী ও তাদের স্বজনদের। পছন্দের অ্যাম্বুলেন্সে রোগী নিতে বাধ্য করা হচ্ছে। অতিরিক্ত ভাড়া আদায় এবং আপত্তি জানালে মারধর ও হয়রানির ঘটনাও ঘটছে।
স্থানীয় ও রোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দিনে ও রাতে বাইরের কোনো অ্যাম্বুলেন্স রোগী নিয়ে এলে তাকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়। ওই রোগী মারা গেলেও সেই অ্যাম্বুলেন্স চালককে নিতে দেওয়া হয় না। তিন হাজার ভাড়ার পরিবর্তে ৮-১০ হাজার টাকা আদায় করা হয়। আপত্তি জানালে রোগী, স্বজন ও চালক সবাইকে মারধরেরও অভিযোগ রয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন নারী বলেন, ‘বাবা বয়স্ক মানুষ। হাসপাতালের গেটে আসতেই কয়েকজন কোলে তুলে সিঁড়ি বেয়ে মেডিসিন ওয়ার্ডে নিয়ে যান। বেড ঠিক করে দেন। ওষুধ লাগলে তা নিয়ে আসছেন। খাবার কিনে এনে দেন। প্রথমে ভেবেছি হাসপাতালের লোক। তাদের সহযোগিতা দেখে আমরা খুশি হই। পরে বুঝতে পারি তারা দালাল। এক হাজার টাকার ওষুধ এনে পাঁচ হাজার টাকার বিল ধরিয়ে দেন। তাদের পছন্দের অ্যাম্বুলেন্সে উঠতে হয়। তিন হাজার টাকার ভাড়া ১০ হাজার টাকায় ঠিক করেন। তাদের কথার বাইরে গেলে তেড়ে আসেন।’
শিশু রোগী পেলে বেশি খুশি
দালালেরা শিশু রোগী পেলে বেশি খুশি হয়। কারণ শিশুর স্বজন আবেগের কারণে ভাড়া নিয়ে তেমন দর কষাকষি করেন না। যেসব ওয়ার্ডে ভিড় কম সেখানে রোগীদের ঘুরিয়ে বলেন, ডাক্তার নেই। আপনার রোগী মরে যাবে, তাড়াতাড়ি বেসরকারি হাসপাতালে নিতে হবে। এমন ভয় দেখিয়ে শিশু রোগীদের নেওয়া হয় ইপিজেডের নিকট একটি হাসপাতালে, অন্যটি রামমালা রোডে।
নির্বিকার আনসার সদস্য
সরেজমিনে দেখা গেছে, হাসপাতাল প্রাঙ্গণ যেন কোনো গাড়ির স্ট্যান্ড। অ্যাম্বুলেন্স, সিএনজি অটোরিকশা ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার ‘মেলা’। রোগী দেখলে টানাটানি শুরু করেন দালালেরা। বাইরের গাড়ি এলে একজন বেত হাতে নিয়ে তাদের তাড়িয়ে দিচ্ছে। আনসার সদস্যদের সামনেই এই কর্মকাণ্ড চলছে। কিন্তু তাদের এই বিষয়ে নির্বিকার থাকতে দেখা গেছে।
স্থানীয় সূত্র অনুযায়ী, দালালদের অধিকাংশের বাড়ি নগরীর মুরাদপুরে। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য- চর্থার আল আমিন, মুরাদপুরের টুটুল, কাউসার, সোহেল, রাকিব, আকাশ, জহির, সুমন, জিতু ও লুলু, ঢুলীপাড়ার জাহাঙ্গীর আলম, নুরপুরের দুলাল। হাসপাতালের আনসার সদস্যদের বিশেষ সুবিধা দিয়ে তারা ক্যাম্পাসে প্রবেশ করে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
কয়েকজন চিকিৎসক ও কর্মকর্তা জানান, এখানের রোগী ও স্বজন সবাই অ্যাম্বুলেন্স, ওষুধ ও ক্লিনিকের দালালদের কাছে জিম্মি। স্থানীয় হওয়ায় কেউ তাদের বিরুদ্ধে মুখ খোলে না। রোগী ও স্বজনদের সঙ্গে তাদের ঝগড়া ও মারামারি প্রতিদিনের ঘটনা।
হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত উপপরিচালক ডা. মোহাম্মদ শাহজাহান বলেন, ‘আমরাও চাই রোগীরা যেন স্বাচ্ছন্দ্যে সেবা নিয়ে বাড়ি ফিরতে পারেন। এ বিষয়ে আমরা প্রশাসনের সহায়তায় বিভিন্ন সময়ে অভিযান চালিয়েছি।’
কুমিল্লা জেলা অ্যাম্বুলেন্স মালিক সমিতির নেতারা বিষয়টি নিয়ে সরাসরি কোনো কথা বলতে রাজি হননি। তবে কয়েকজন চালক বলেন, দালালেরা কুমেক হাসপাতাল ক্যাম্পাসকে তাদের বাড়ি-ঘর বানিয়ে রেখেছে। বাইরের কেউ সেখান থেকে ভাড়া নিতে পারে না। ভাড়া নিয়ে গেলেও হয়রানির শিকার হতে হয়।
যা বলছে এসআরবি ও আনসার
কুমিল্লা এসআরবি ১১, সিপিসি-২ এর কোম্পানি কমান্ডার মেজর সাদমান ইবনে আলম বলেন, এই মেডিকেল কলেজের ওয়ার্ডবয় থেকে অ্যাম্বুলেন্স চালক পর্যন্ত অনেকে দালালি কার্যক্রমে জড়িত। তাদের হাতে প্রতিদিন অসংখ্য রোগী ও তার স্বজন চিকিৎসা নিতে এসে প্রতারিত হচ্ছেন। মেডিকেল কলেজের দালাল শূন্যের কোটায় আনতে আবারও অভিযান পরিচালনা করা হবে।
অভিযাগের বিষয়ে হাসপাতালের আনসার কমান্ডার মোখলেছুর রহমান বলেন, ‘আমাদের সদস্য ২৭ জন। তার মধ্যে নিয়মিত ছুটি ও অসুস্থতা থাকে। কম জনবল দিয়ে এত বড় ক্যাম্পাস পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন।’ আনসার সদস্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়ে বলেন, ‘কেউ জড়িত থাকলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করব।’
আদর্শ সদর উপজেলার নির্বাহী অফিসার সজীব তালুকদার বলেন, ‘দালালের উৎপাত নিয়ে আমরা কাজ করব। হাসপাতালের পরিচালক মহোদয়ের সাথে সমন্বয় করে আমরা এ বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
উল্লেখ্য, হাসপাতালটির বর্হিবিভাগে প্রতিদিন প্রায় পাঁচ হাজার রোগী চিকিৎসা নেন। এছাড়া ভর্তি থাকেন প্রায় ১৫০০ জন রোগী। তাদের সঙ্গে আসেন আরও অন্তত পাঁচ হাজার স্বজন। তাদের অধিকাংশ আসেন বৃহত্তর কুমিল্লা ও নোয়াখালীর গ্রাম থেকে।
