কুয়েতের মার্কিন ঘাঁটিতে হামলার রোমাঞ্চকর বর্ণনা দিলেন ইরানি পাইলটরা

অনলাইন ডেস্ক

ইরানের বিমানবাহিনীর পাইলটরা এক রোমহর্ষক ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন, তারা জানিয়েছেন কি করে কুয়েতের মার্কিন ঘাঁটির বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে এফ-৫ যুদ্ধবিমান দিয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে হামলা চালানো হয়েছিল। চলতি বছরের মার্চের দিকে এই হামলা চালানো হয়।

প্রেস টিভির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ১ মার্চ সংঘটিত সেই রুদ্ধশ্বাস ও উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ অভিযানের বিস্তারিত বিবরণ এবার প্রকাশ করেছেন অভিযানে অংশ নেওয়া ইরানি বিমান বাহিনীর বীর সেনারা। বুধবার একটি টেলিভিশন চ্যানেলে দেওয়া বিশেষ সাক্ষাৎকারে অভিযানের কমান্ডার এবং দুই ক্রু সদস্য এই রোমাঞ্চকর অভিযানের আদ্যোপান্ত তুলে ধরেন। অত্যন্ত নিচু দিয়ে বিমান উড়িয়ে রাডার ফাঁকি দেওয়া এবং নিখুঁতভাবে বোমা বর্ষণ করে নিরাপদে ফিরে আসার এই মিশনটি সম্পন্ন হতে সময় লেগেছিল মাত্র ৫০ মিনিট।

টেলিভিশন সম্প্রচারে দেওয়া সাক্ষাৎকারে অপারেশনের কমান্ডার জানান, দেশের ওপর চাপিয়ে দেওয়া আগ্রাসনের তাৎক্ষণিক ও দাঁতভাঙা জবাব দিতেই এই প্রতিশোধমূলক হামলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কুয়েতের ক্যাম্প বুহরিং ঘাঁটিটিকে অন্যতম কৌশলগত লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বেছে নেওয়ার কারণ ছিল সেখানে বিপুল সংখ্যক মার্কিন সেনার উপস্থিতি ও বিশাল সামরিক সক্ষমতা। অভিযানটি সফল করতে দুটি এফ-ফাইভ যুদ্ধবিমানে চড়ে তিনজন পাইলট চরম প্রতিকূলতার মধ্যে যাত্রা শুরু করেন। মার্কিন ও শত্রুপক্ষের রাডার ফাঁকি দিতে তারা এতটাই নিচু দিয়ে বিমান উড়িয়েছিলেন যা সাধারণ যুদ্ধকালীন বিমান চালনার সব রেকর্ড ভেঙে দেয়। কমান্ডার উল্লেখ করেন, যেখানে সাধারণ প্রশিক্ষণে সর্বনিম্ন ৫০০ ফুট ওপর দিয়ে ওড়ার নিয়ম, সেখানে তারা মাটি থেকে মাত্র ৫০ ফুট বা তারও কম উচ্চতা দিয়ে বিমান চালিয়েছেন। এমনকি যাত্রাপথে তারা বিদ্যুতের তারের নিচ দিয়েও বিমান নিয়ে উড়ে যান।

শত্রুর আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, প্যাট্রিয়ট মিসাইল সিস্টেম, অ্যাওয়াক্স নজরদারি বিমান এবং প্রস্তুত থাকা যুদ্ধবিমানগুলোর চোখ এড়াতে পুরো মিশনটি পরিচালনা করা হয় সম্পূর্ণ রেডিও নীরবতা বজায় রেখে। সমুদ্রপৃষ্ঠের ওপর দিয়ে যাওয়ার সময়কার এক রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে কমান্ডার বলেন, তারা দুটি জাহাজের মাঝখান দিয়ে এতটাই নিচু দিয়ে উড়ে গিয়েছিলেন যে জাহাজের ডেকগুলো তাদের বিমানের চেয়ে উঁচুতে ছিল। বিমানের গর্জন শুনে জাহাজের নাবিকেরা নিচে ঝুঁকে রেলিংয়ের ওপর দিয়ে তাদের দিকে তাকিয়েছিলেন। কুয়েতের আকাশসীমায় প্রবেশের পর বিমানের গতি আরও বাড়িয়ে দেওয়া হয়। যেহেতু এই অভিযানে ফ্রি-ফল বোমা ব্যবহার করা হয়েছিল, তাই লক্ষ্যবস্তুর ঠিক ওপর দিয়ে উড়েই হামলা চালানো বাধ্যতামূলক ছিল। মার্কিন ঘাঁটির ওপর পৌঁছামাত্রই ইরানি যুদ্ধবিমানগুলো থেকে ভারী বোমা বর্ষণ শুরু হয়।

বোমার আঘাতে মুহূর্তের মধ্যেই পুরো ঘাঁটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয় এবং সেখানে থাকা সামরিক সরঞ্জাম ও হেলিকপ্টারগুলো বিস্ফোরণের তীব্রতায় আকাশে ছিটকে যায়। এই হামলার সময় শত্রুপক্ষের পাল্টা প্রতিরোধ ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়ে এবং এক চরম হাহাকার ও বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়। কমান্ডার জানান, পরিস্থিতি সামাল দিতে উড্ডয়ন করা শত্রুপক্ষের তিনটি এফ-ফিফটিন যুদ্ধবিমান নিজেদের বিভ্রান্তির কারণে ও ভুল বোঝাবুঝির শিকার হয়ে একসঙ্গে ধ্বংস হয়ে যায়। পরবর্তীকালে অন্যান্য সূত্র থেকেও নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, ১ মার্চ কুয়েতের নিজস্ব আকাশ প্রতিরক্ষা বাহিনী মার্কিন সরবরাহকৃত প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে ভুলবশত নিজেদেরই তিনটি যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করেছিল।

সাফল্যের সাথে বোমা হামলা শেষ করার পর ইরানি পাইলটরা শত্রুকে ধোঁকা দিতে একটি বিশেষ কৌশলগত চাল খাটান, যার ফলে শত্রুপক্ষ তাদের ট্র্যাক বা বাধা দিতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়। এরপর যুদ্ধবিমানগুলো নিরাপদে ইরানের আকাশসীমায় প্রবেশ করে এবং পূর্বনির্ধারিত একটি ঘাঁটিতে অবতরণ করে। কমান্ডারের পেছনের আসনে থাকা পাইলট জানান, ফিরে আসার সময়ও ঘাঁটিতে একের পর এক ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটছিল। অপর এক পাইলট বলেন, মিশনটি এতটাই গুরুত্বপূর্ণ ছিল যে যদি একটি বিমান ধ্বংসও হয়ে যেত, তবে অন্য বিমানটিকে যেকোনো মূল্যে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার নির্দেশনা দেওয়া ছিল। দেশের সম্মান রক্ষার্থে নিজেদের জীবনকে তুচ্ছ জ্ঞান করে এই মিশন সফল করা হয়েছে বলে কমান্ডার তার বক্তব্য শেষ করেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights