কেমন চলেছে ক্রীড়াঙ্গন

মনোয়ার হক

রাত পোহালেই জাতীয় সংসদ নির্বাচন। যে দল জিতবে তারাই সরকার গঠন করবে। এখন শুধু অপেক্ষা কারা জিতবে বা হারবে। আর নির্বাচনের মাধ্যমে বিদায় নিতে চলেছে অন্তর্বর্তী সরকার। ২০২৪ সালে ৫ আগস্ট আওয়ামী সরকারের পতন হয়। ৮ আগস্ট শপথের মাধ্যমে গঠিত হয় অন্তর্বর্তী সরকার। প্রায় ১৮ মাস সরকার পরিচালনা করে এ অন্তর্বর্তীর উপদেষ্টা পরিষদ। বহুল আলোচিত ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে এ সরকার কেমন দেশ চালাল তা নিয়েও চলছে হিসাবনিকাশ। ক্রীড়াঙ্গনও এর বাইরে নয়।

অন্তর্বর্তী সরকারের প্রথম ক্রীড়া উপদেষ্টা ছিলেন আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। তিনি স্বেচ্ছায় সরে যাওয়ায় ক্রীড়াঙ্গনের দায়িত্ব নেন আসিফ নজরুল। তবে ১৮ মাসে ক্রীড়াঙ্গনের মূল কাজগুলো করে গেছেন আসিফ মাহমুদ। বয়সে তরুণ হলেও ক্রীড়াঙ্গনের দায়িত্ব পেয়েই আলোড়ন তুলেছিলেন তিনি। ১৬ বছর ধরে ফ্যাস্টিট কায়দায় ক্ষমতায় থাকায় ক্রীড়াঙ্গনকে অনিয়মের স্বর্গ বানিয়ে ছেড়েছিল আওয়ামী লীগ সরকার।

দলীয়করণ ও অযোগ্যদের ফেডারেশনের বড় বড় চেয়ারে বসিয়ে গুরুত্বপূর্ণ এ অঙ্গনকে দূষিত করে তুলেছিল। এটা ঠিক নির্বাচনের মাধ্যমেই কমিটি গঠন হয়েছিল। তাও পুরোটা ছিল প্রহসনমূলক বা লোক দেখানো।

আসিফ মাহমুদ দায়িত্ব নিয়েই প্রথম কাজটি করেন ফেডারেশনগুলোর নির্বাচিত কমিটি বিলুপ্তি করে। নতুন ভাবে গঠন করেন অ্যাডহক বা অস্থায়ী কমিটি। এতে ব্যাপক প্রশংসিত হন তিনি। ক্রীড়া অভিভাবক হলেও আসিফ মাহমুদের কাছে ক্রীড়াঙ্গন ছিল একেবারে অচেনা। কে যোগ্য বা বির্তক তা তিনি জানতেন না। এজন্যই ক্রীড়া উপদেষ্টা সার্চ কমিটি গঠন করেন। যা বাংলাদেশের খেলাধুলায় ইতিহাসে কখনো ঘটেনি। সার্চ কমিটির দায়িত্ব ছিল যোগ্য ও মেধাবী সংগঠকদের বের করে ফেডারেশনে বসানো। ক্রীড়া পরিষদ যা শুধু অনুমোদন করেছে।

আসিফ মাহমুদের আরেক পদক্ষেপ ক্রীড়ামোদীদের নজর কেড়েছিল। আর তা হলো জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের অনিয়ম খতিয়ে দেখা। স্বাধীনতার পর থেকে ক্রীড়া পরিষদের কর্মকর্তাদের দুর্নীতি ঘিরে আলোচনার শেষ ছিল না। লুটপাট করে অনেকে লাল টক টকে হয়ে যান এমন কথাও ছিল। তাই ক্রীড়া পরিষদ ভবনে রং বদলে লালের বদলে সাদা করা হয়। এতেও বিতর্ক কমেনি বরং বেড়েই চলেছিল। ক্রীড়া পরিষদের দুর্নীতির প্রধান পথটিই ছিল স্টেডিয়ামগুলোর দোকান বরাদ্দ দেওয়া। অভিযোগ রয়েছে, ভুয়া চুক্তি করে অনেকে টাকার পাহাড় গড়েছেন। আগের সরকারগুলোর ক্রীড়ামন্ত্রীরা দুর্নীতির খবর জানার পরও কেন জানি এড়িয়ে গেছেন। এখানে আবার বিশাল কমিশনেরও গুঞ্জন রয়েছে।

যাক আসিফ মাহমুদ তা এড়িয়ে যাননি। ঠিকই নেমে পড়েন। অন্যদের দিয়ে নয়, নিজেই স্টেডিয়ামের দোকানগুলো পরিদর্শন করে আসল চিত্র বের করেন। দেখেন এ তো পুকুর নয় সমুদ্র চুরিকেও যেন হার মানিয়েছে। অনেক ভেবেছিলেন, এবার দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের মুখোশ উন্মোচন হবে। কিন্তু কয়েকজনকে বরখাস্ত ছাড়া কিছুই হলো না। শুধু ক্রীড়া পরিষদ কেন, অভিযোগ ছিল ১৬ বছর ধরে দুর্নীতি করে আওয়ামী লীগ সরকার ক্রীড়াঙ্গনে অনিয়মের হিমালয় তৈরি করেছিল। কোনো সন্দেহ নেই ফেডারেশনগুলোয় ছিল লোপাটের ছড়াছড়ি। এজন্য তো নির্বাচিত কমিটি বিলুপ্ত করাটা খুবই জরুরি ছিল।

ফুটবল ও ক্রিকেট ছাড়া সব কমিটিই তো ভেঙে দেওয়া হয় সার্চ কমিটির ছকে। ক্রিকেটের কমিটিও তো রদবদল হয়েছে। দুই সভাপতির দেখা মিলেছে, এমনকি নির্বাচনের মাধ্যমে কমিটিও গঠন হয়েছে। এরপরও কি ক্রীড়াঙ্গনে আওয়ামী সরকার আমলের দুর্নীতির খতিয়ান বের করা গেছে? এটাই বড় প্রশ্ন। বাফুফে নয়, নাম ধরে বলা হতো এমনকি কোনো কোনো পত্রিকায় লেখাও হয়েছে বাফুফের তৎকালীন সভাপতি ফিফার হাজার হাজার ডলার আত্মসাৎ করেছেন। কিছু যে ঘটেছিল তা তো মিথ্যা নয়। তা না হলে এক সাধারণ সম্পাদকের চাকরি গেল কেন?

বিসিবির সভাপতি নাজমুল হাসান পাপনের বিপক্ষেও ঢালাওভাবে অভিযোগ আছে। হকি, শুটিং, সাঁতার, অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশন এমন কোনো ফেডারেশন নেই যে, দুর্নীতির অভিযোগ নেই। এত অভিযোগের পরও আসামিদের চিহ্নিত করা তো দূরের কথা তদন্ত হয়েছে কি না এমন তথ্যও জানা নেই। তাহলে কি সবাই ফেরেশতা ছিলেন? তাই যদি হয় তাসের ঘরের মতো ক্রীড়া ফেডারেশনগুলো ভাঙা হলো না কেন, এসব প্রশ্ন এখন উঠছে। সত্যি বলতে কি ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকার আমলে ক্রীড়াঙ্গনে দুর্নীতি হয়নি তা কোনোভাবেই বিশ্বাস যোগ্য নয়। এরপরও কাউকে চিহ্নিত করা হলো না, এটাই তো রহস্য। তাহলে এর ভিতর কি অতীতের মতো কোনো কিন্তু লুকিয়ে আছে?

আর আলোচিত সার্চ কমিটি নিয়েও কম বেশি বিতর্ক রয়েছে। দুর্নীতির ব্যাপারে আসিফ মাহমুদ ছিলেন জিরো টলারেন্স। এরপরও এমন অবস্থা হবে কেউ ভাবেননি। আর জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেবেন বলেই আসিফ মাহমুদ ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব ছাড়েন। যদিও তিনি নির্বাচন করছেন না। কিন্তু ক্রীড়ামোদীদের একটা আফসোস থেকেই গেল আসিফও পারলেন না দুর্নীতিবাজদের শায়েস্তা করতে। আর খেলাধুলার সাফল্য এ তো কম বেশি সব সরকারের আমলে হয়ে আসছে। আর আসিফ নজরুল ক্রীড়া উপদেষ্টার বাড়তি দায়িত্ব নেওয়ার পর যে কাজটি করেছেন তা ক্রীড়ামোদীদের ভোলবার নয়। এতে তিনি প্রশংসিত না সমালোচিত হবেন তা দেখতে আরও কিছু দিন অপেক্ষা করতে হবে। কারণ টি-২০ বিশ্বকাপে বাংলাদেশ খেলবে না এ চূড়ান্ত ঘোষণা তাঁর মুখ থেকে এসেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights