কোটা আন্দোলনকে ঘিরে উত্তপ্ত জাবি

রুবেল হোসাইন, জাবি

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাবি) ক্যাম্পাসে চলমান কোটা সংস্কার আন্দোলনকে ঘিরে উত্তপ্ত পরিস্থিতি বিরাজ করছে। ইতোমধ্যে গত ১৪ ও ১৫ জুলাই রাতভর শাখা ছাত্রলীগের নেতাকর্মী ও কোটা আন্দোলনকারীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে।

এদিকে মঙ্গলবার সারাদিন জাবি শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি ক্যাম্পাসে গণবিশ্ববিদ্যালয়, ড্যাফোডিল ইউনিভার্সিটি, বিপিএটিসি স্কুল অ্যান্ড কলেজসহ সাভারের বিভিন্ন স্কুল ও কলেজের শিক্ষার্থীদের লাঠিসোঁটা হাতে অবস্থান করতে দেখা গেছে। অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের ধাওয়া খেয়ে শাখা ছাত্রলীগের নেতারা গতকাল রাত থেকে ক্যাম্পাসে বাইরে অবস্থান করছেন।

মঙ্গলবার সরেজমিনে সাভার এলাকা, পল্লী বিদ্যুৎ, আমবাগান এলাকা, জামসিং প্রভৃতি জায়গায় স্থানীয় ছাত্রলীগ ও যুবলীগের সাথে শাখা ছাত্রলীগকে দেশীয় অস্ত্র নিয়ে অবস্থান করতে দেখা গেছে। এ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারী সবাই আতঙ্কে রয়েছেন।
ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধ

প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য প্রত্যাহার, কোটা সংস্কারের দাবি এবং ছাত্রলীগের হামলার প্রতিবাদে ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধ করেছে কোটা আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা।

মঙ্গলবার বিকাল সাড়ে ৩টার দিকে শুরু হয়ে সোয়া ৫টা পর্যন্ত চলে এ অবরোধ। এর আগে, বেলা ১১টা থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন আবাসিক হল থেকে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে প্রধান ফটকে (ডেইরি গেইট) অবস্থান নেয় তারা। পরে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে এ অবরোধে অংশ নিয়েছেন গণবিশ্ববিদ্যালয়, বিপিএটিসি স্কুল অ্যান্ড কলেজসহ সাভারের বিভিন্ন স্কুল, কলেজের শিক্ষার্থীরা। এতে প্রায় ৮ হাজার শিক্ষার্থী অংশ নেয়।

সিন্ডিকেটকে ঘিরে শিক্ষকদের অবস্থান

বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান উত্তেজনাকর পরিস্থিতির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য জরুরি সিন্ডিকেট সভা করেছে জাবি কর্তৃপক্ষ।

এদিকে মঙ্গলবার দুপুর ১টা থেকে শুরু হওয়া এ সিন্ডিকেট সভাকে কেন্দ্র করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা নতুন প্রশাসনিক ভবনের সামনে অবস্থান নেয়। এসময়, শিক্ষক বক্তারা ১৫ জুলাই রাতের ছাত্রলীগের হামলাকে জাবির ইতিহাসে ‘কালোরাত’ আখ্যায়িত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে শাস্তির দাবি জানান।

ক্যাম্পাস ছাড়ার পর জাবি ছাত্রলীগে পদত্যাগের হিড়িক

কোটা আন্দোলনকারীদের পাল্টা হামলার শিকার হয়ে মঙ্গলবার রাতে আবাসিক হল ও ক্যাম্পাস ছেড়েছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাবি) শাখা ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। এমনকি শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি আক্তারুজ্জামান সোহেল ও হাবিবুর রহমান লিটনও ক্যাম্পাস ছেড়েছেন।

এদিকে সিনিয়র নেতাকর্মীরা ক্যাম্পাস ছাড়ার পর থেকে শাখা ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের মধ্যে সাংগঠনিক পদ থেকে পদত্যাগের হিড়িক শুরু হয়েছে। এখন পর্যন্ত পদধারী নেতাসহ অর্ধ-শতাধিক কর্মী তাদের ফেসবুক স্ট্যাটাসের মাধ্যমে পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন। স্ট্যাটাসে নেতাকর্মীরা কোটা আন্দোলনকারীদের ওপর হওয়া হামলার প্রতিবাদও জানিয়েছেন।

জাবিতে রাতভর সংঘটিত হামলার ঘটনায় ৬ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবি) গত ১৪ ও ১৫ জুলাই রাতে কোটা আন্দোলনকারীদের উপর হওয়া হামলার ঘটনা তদন্তে ৬ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।

মঙ্গলবার দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. নূরুল আলমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক জরুরি সিন্ডিকেট সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. সুফি মোস্তাফিজুর রহমানকে সভাপতি করে গঠিত এ কমিটিতে সদস্য হিসেবে রয়েছেন ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের অধ্যাপক মো. শাহেদুর রশিদ ও একই বিভাগের উম্মে সায়কা, পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক শফি মুহাম্মদ তারেক, মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের অধ্যাপক মো. আনোয়ার খসরু পারভেজ। কমিটিতে সদস্য সচিব হিসেবে রয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেপুটি রেজিস্ট্রার (সাধারণ প্রশাসন) মাহতাব-উজ-জাহিদ।

আগামী ১০ কর্ম দিবসের মধ্যে এ কমিটিকে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। এ কমিটি গত ১৪ জুলাই রাতে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হল সংলগ্ন এলাকায় আন্দোলনকারী ও হল ছাত্রলীগের মধ্যকার সংঘর্ষ, এবং ১৫ জুলাই রাতে উপাচার্যের বাসভবন ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ওপর হামলা, উপাচার্যের বাসভবন ও গাড়ি ভাঙচুরে জড়িতদের চিহ্নিত এবং শাস্তির সুপারিশ করবে।

এদিকে, ওই সিন্ডিকেট সভায় বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বহিরাগতদের প্রবেশ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। পাশাপাশি আবাসিক হলে বহিরাগত ও অছাত্ররা অবস্থান করলে তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট হল প্রভোস্টকে নির্দেশ দেওয়া হয়।

এছাড়া, ১৫ জুলাই রাতে সংঘটিত হামলায় আহতের ব্যয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বহন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের উত্তপ্ত এ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের জন্য জাবির নিরাপত্তা শাখার পাশাপাশি পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রক্টর মোহাম্মদ আলমগীর কবির।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights