ক্যান্সারের সাথে সাথে আকাশ জয়ী এক নারীর গল্প

অনলাইন ডেস্ক

কানিকা টেকরিওয়ালের জীবন ২১ বছর বয়সেই থমকে যেতে পারতো। ২১ বছর বয়সে তার জীবনে দুটি ঘটনা ঘটে- তিনি এভিয়েশন সংক্রান্ত একটি স্টার্টআপ ব্যবসা শুরু করেন এবং তার স্টেজ-২ ক্যান্সার ধরা পড়ে। এরপরের গল্পটা একটু ভাবুন। আর দশটা সাধারণ মানুষ হলে কী হতো? ব্যবসা তো লাটে উঠতোই, ডাক্তারদের আশঙ্কা সত্যি হলে অনেক আগেই চিতায় ছাই হয়ে যেতো তার শরীর। কিন্তু কানিকা অন্য ধাতুতে গড়া। ক্যান্সার তো জয় করেছেনই, সাথে জয় করেছেন ভারতের আকাশ। একজন ক্যান্সার রোগীর প্রতিষ্ঠা করা ‘জেটসেটগো‘ এখন ভারতের সবচেয়ে বড় প্রাইভেট এভিয়েশন সংস্থা। শূন্য হাতে শুরু করা স্টার্টআপ এখন ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখায়। একেবারে শূন্য হাতে শুরু বলা ঠিক হবে না, কানিকা টেকরিয়ালের ব্যবসার পুঁজি ছিল ৫ হাজার ৬০০ রুপি (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৭ হাজার টাকা)। এখন তার কোম্পানির নিট সম্পদের পরিমাণ ৪২০ কোটি রুপি (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৫৩৭ কোটি টাকা)। হাওয়া থেকে তার প্রতিষ্ঠান এখন ১০টি বিমান ও হেলিকপ্টারের মালিক। যুবরাজ সিং-এর মত তারকা ক্রিকেটার তার প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করেন। ভারতের মুম্বাই, দিল্লি, বেঙ্গালুরু ছাড়াও নিউইয়র্ক এবং দুবাইতে বিস্তৃত তার ব্যবসায়িক নেটওয়ার্ক।

শুধু ক্যান্সার সারভাইভার হলেই অন্য অনেক মানুষকে অনুপ্রেরণা জোগাতে পারতেন কানিকা। সাথে যখন ৫ হাজার ৬০০ রুপির ব্যবসাকে ৪২০ কোটিতে তুলে নেন, কানিকা তখন কোটি মানুষের অনুপ্রেরণার নাম। তবে তার পথচলাটা অত সহজ ছিল না।
কানিকা টেকরিওয়ালের জীবন শুধু ব্যবসায়িক সাফল্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; ক্যানসার থেকে অলৌকিকভাবে বেঁচে ফেরা এবং পিতৃতান্ত্রিক সমাজকে চ্যালেঞ্জ করার মধ্য দিয়ে তিনি নিজের একটি অনন্য ব্যক্তিত্ব তৈরি করেছেন।

২১ বছর বয়সে যখন কানিকা ক্যানসারে আক্রান্ত হন, তখন তার আত্মীয়রা তার মাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলছিলেন, ‘আহা! মেয়েটা যদি সুস্থও হয়, তবে ওকে বিয়ে দেবে কীভাবে?’ হাসপাতাল শয্যায় শুয়ে কানিকা রেগে গিয়ে তাদের বলেছিলেন, ‘ঠিক ৫ বছর পর আমি ফোর্বসের কভারে আসব।’ সবাইকে অবাক করে ঠিক ৫ বছর পর ২০১৬ সালের মার্চ মাসে তিনি ফোর্বসের ’৩০ আন্ডার ৩০’ তালিকায় স্থান পান। এটা কোনো লটারি নয়, এটা তার অর্জন।

ক্যান্সারকে অনেকে ভয় পায়, অভিশাপ মনে করে। কিন্তু কানিকা ক্যান্সারকে নিজের জীবনের ‘সেরা উপহার’ মনে করেন। তার উপলব্ধি হলো, ক্যান্সার তাঁকে জীবনের আসল মূল্য বুঝতে এবং কোনো কিছুকে হালকাভাবে না নিয়ে নিজের স্বপ্নের পেছনে সম্পূর্ণ শক্তি নিয়ে ছুটতে শিখিয়েছিল।

১৯৯২ সালের ৭ জুন ভারতের মধ্যপ্রদেশের ভোপালে এক মারোয়ারি পরিবারের জন্ম কানিকার। আর ১০টা পরিবারের মত মেয়ের কাছে তাদের চাওয়া ছিল পড়াশোনা করে সম্পন্ন পরিবারের কাউকে বিয়ে করে নিশ্চিন্ত জীবন। কিন্তু কানিকার মনে ছিল অন্য ভাবনা। ছেলেবেলা থেকেই তার আগ্রহ ফিন্যান্স এবং এভিয়েশনে। ভোপালে স্কুল জীবন শেষ করে উচ্চতর পড়াশোনার জন্য তিনি ইংল্যান্ডের কভেন্ট্রি ইউনিভার্সিটিতে যান। ২১ বছর বয়স পর্যন্ত তার জীবন বাবা-মার চওয়া মতই এগিয়েছি। ২১ বছর বয়সে একসাথে দুটি ঘটনা ঘটে- ক্যান্সার এবং ব্যবসা।

ক্যান্সারের সাথে লড়াইয়ের কথা শেয়ার করে তিনি বলেন, ‘আমার বয়স যখন ২১, তখন ৪০ জন ডাক্তার আমাকে বলেছিলেন যে, আপনি চার মাস বা চার দিন বাঁচবেন। তারপর আমি মুম্বাইয়ের এক ডাক্তারের সাথে দেখা করি এবং তাঁকে বলি, ‘আমরা ৪০ বছর পর একসঙ্গে ড্রিংক করব, এখন চিকিৎসা নিয়ে কথা বলা যাক।’ সেই ডাক্তার নিশ্চয়ই এখন ও তার সঙ্গে ড্রিংক করার অপেক্ষায় আছেন। এক সাক্ষাতকারে কানিকা বলেছেন, ‘ক্যানসার থেকে বেঁচে ফেরা আসলে আমাকে বুঝতে শিখিয়েছে যে জীবন ছোট এবং আমাকে নিজের জন্য বাঁচতে হবে ও যা আমার জন্য গুরুত্বপূর্ণ তাই করতে হবে।’

অনেকে ভাবতে পারেন প্রায় বিনা পুঁজিতে ব্যবসা শুরু করে কীভাবে ৪২০ কোটি রুপির সম্পদ গড়া যায়? কোনো লটারি জেতেননি তো? না, কানিকার ব্যবসা পুরোটাই আইডিয়ার। কানিকার প্রতিষ্ঠিত ’জেটসেটগো’ হলো ভারতের প্রথম এবং বৃহত্তম প্রযুক্তি-ভিত্তিক প্রাইভেট এভিয়েশন মার্কেটপ্লেস। এটি মূলত চার্টার ফ্লাইট বুকিং সহজতর করার উদ্দেশ্যে একটি অনলাইন এগ্রিগেটর প্ল্যাটফর্ম। গ্রাহকেরা কর্পোরেট মিটিং, ব্যক্তিগত ছুটি বা জরুরি চিকিৎসার জন্য এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সরাসরি ব্যক্তিগত বিমান এবং হেলিকপ্টার বুক করতে পারেন। তাছাড়া অনেক ধনী ব্যক্তি বা কর্পোরেট গ্রুপ যারা নিজস্ব বিমান কেনেন; তাদের বিমানের পাইলট স্টাফিং, রক্ষণাবেক্ষণ এবং সরকারি নিয়মকানুনের সমস্ত দায়িত্ব পরিচালনা করে প্রতিষ্ঠানটি। তাদের নিজস্ব প্রশিক্ষিত রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রকৌশল টিম রয়েছে, যা বিমানের নিরাপত্তা ও ইন-হাউস মেরামত নিশ্চিত করে। শুরুতে তাদের নিজস্ব কোনো বিমান ছিল না। তারা শুধু গ্রাহক ও বিমান মালিকের মধ্যে যোগাযোগ করিয়ে দিতো। বর্তমানে তাদের বহরে আছে অন্তত ১২টি বিমান ও হেলিকপ্টার। জেটসেটগো’কে বলা হয় আকাশের উবার। ভারতের শহুরে যাতায়াত ব্যবস্থায় বিপ্লব আনতে বৈদ্যুতিক এয়ার ট্যাক্সি চালুর পরিকল্পনা করছে জেটসেটগো।

একজন ক্যান্সার রোগী এবং নারী হিসেবে প্রায় শূন্য হাতে একটি প্রাইভেট এভিয়েশন প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা তার জন্য সহজ ছিল না। তিনি বলেছেন, ‘অনেকে আমাকে জিজ্ঞেস করেন পুঁজি ছাড়াই আমি কীভাবে এটি করলাম। কিস্তু বাস্তবতা হলো মাত্র মাত্র ৫৬০০ রুপি বিনিয়োগ করেছি এবং আমরা ভারতের সবচেয়ে বড় প্রাইভেট জেটের বহর পরিচালনা করছি।’ কানিকার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল এভিয়েশন শিল্পে পুরুষদের আধিপত্য জয় করা। তিনি বলেছেন, ’শুরুতে আমি যে ব্যবসা করছি সেটির জন্য মানুষ আমাকে গুরুত্ব সহকারে নিতে সময় নিয়েছিল এবং আমি ‘আপনার কাপকেক বেকিং করা উচিত’ এই ধরনের মন্তব্যও শুনেছি। কখনো কখনো আমি যখন নিজের দাবিতে অটল বা দৃঢ় থাকি, তখন আমাকে অহংকারী মনে করা হয়, যেখানে একজন পুরুষ আমার চেয়ে বেশি দৃঢ় হলে তাকে উৎসাহী বা আবেগপ্রবণ মনে করা হয়। তবে এগুলো খুবই তুচ্ছ বিষয়।’

ব্যবসায়ী পি. শরৎ চন্দ্র রেড্ডিকে বিয়ে করে সুখেই আছেন কানিকা টেকরিওয়াল। এই দম্পতি এক পুত্রসন্তানের বাবা-মা। কানিকা একজন নিয়মিত ম্যারাথন রানার। সুযোগ পেলেই ক্যানভাসে রঙ তুলি নিয়ে মেতে ওঠেন। পছন্দ করেন ঘুরে বেড়াতে।
ফোর্বসের তালিকায় তো নাম তুলেছেন ৩০এর আগেই। জিতেছেন ভারত সরকারের ‘জাতীয় উদ্যোক্তা পুরস্কার’। বিবিসি-র ‘১০০ প্রভাবশালী নারী’ এবং ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের ‘তরুণ গ্লোবাল লিডার’এর তালিকায়ও আছে কানিকা টেকরিওয়ালের নাম।

সূত্র : এনডিটিভি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights