খালি অস্ত্রাগার-ফাঁকা হুমকি, যুক্তরাষ্ট্রের সামনে কি?
অনলাইন ডেস্ক
প্রতিপক্ষ রাষ্ট্রগুলোর চোখ এখন যুক্তরাষ্ট্রের দিকে। তাদের স্পষ্ট হিসাব, আমেরিকার গোলাবারুদের মজুদ দ্রুত ফুরিয়ে আসছে এবং একটি নির্ভরযোগ্য ও যুদ্ধোপযোগী অস্ত্রাগার পুনর্গঠন করতে দেশটির বহু বছর লেগে যাবে। পেন্টাগনও এখন ধীরে ধীরে বুঝতে শুরু করেছে যে, তাদের প্রথাগত এবং সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার মতো অস্ত্রের যে বর্তমান মজুদ রয়েছে, তা দিয়ে কয়েক দিনের বেশি টানা যুদ্ধ চালানো একেবারেই অসম্ভব।
প্যাট্রিয়ট ও হিমার্স ক্ষেপণাস্ত্রের অভাব, ১৫৫ মিলিমিটার গোলাবারুদের ঘাটতি এবং প্রয়োজনীয় রাডার ও ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ প্ল্যাটফর্মের অনুপস্থিতি এই সংকটকে বেশ স্পষ্ট করে তুলেছে। সাম্প্রতিক সময়ে ইরানের মতো দ্বিতীয় সারির হুমকি কিংবা হুতিদের হাত থেকেও মার্কিন ও মিত্রদের ঘাঁটিগুলো পর্যাপ্তভাবে সুরক্ষিত রাখতে না পারা প্রমাণ করে যে, আমেরিকার বর্তমান নিরাপত্তা সমাধানগুলো বাস্তবে কার্যকর হচ্ছে না।
রাশিয়া, চীন, ইরান এমনকি হুতিরাও বুঝে গেছে যে আমেরিকা ও তার মিত্ররা এক কঠিন সংকটে রয়েছে। ফলে এই মুহূর্তে ইউরোপ বা এশিয়ায় যেকোনো সংঘাত যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত ধ্বংসাত্মক হতে পারে। তার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি অস্ত্রগুলোর দাম আকাশচুম্বী হয়ে উঠেছে এবং এগুলো তৈরি করাও বেশ জটিল। একটি প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টর তৈরি করতে প্রায় ৪০ লাখ মার্কিন ডলার খরচ হয়। আর কোনো লক্ষ্যবস্তু নিখুঁতভাবে ধ্বংস করতে যেখানে দুটি ক্ষেপণাস্ত্রের প্রয়োজন পড়ে, সেখানে এই খরচ বহন করা প্রায় অসম্ভব।
বর্তমানে আমেরিকার প্রতিরক্ষা শিল্প খাত প্রধানত পাঁচটি বড় প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল লকহিড মার্টিন, আরটিএক্স, নর্থরপ গ্রুম্যান, জেনারেল ডায়নামিক্স এবং বোয়িং। বড় বড় প্রতিষ্ঠানগুলোকে একত্রিত করে তৈরি করা এই বিশাল কোম্পানিগুলোর অনেকগুলোই আসলে গণউৎপাদন বা বেশি পরিমাণে অস্ত্র তৈরির জন্য ডিজাইন করা হয়নি। অন্যদিকে প্রথাগত অস্ত্রের ক্ষেত্রে দেখা যায়, গোলাবারুদ ও কামানের নল প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বেশ পুরোনো, যার ফলে তারা চাইলেও উৎপাদন দ্রুত বাড়াতে পারছে না।
পেন্টাগনের অতিরিক্ত খরচ কমাতে এবং অস্ত্র সংগ্রহ প্রক্রিয়ার গতি বাড়াতেই ১৯৯৩ সালে এই একীভূতকরণের পথ তৈরি হয়েছিল। ১৯৯৩ সালের ২১ জুলাই তৎকালীন প্রতিরক্ষা সচিব লেস অ্যাস্পিন এবং উপ-প্রতিরক্ষা সচিব ম্যাথিউ পেরি শীর্ষ ২০টি প্রতিরক্ষা কোম্পানির পরিচালকদের এক নৈশভোজে আমন্ত্রণ জানান। পেন্টাগনের সেই ঐতিহাসিক সান্ধ্যভোজে তাদের সাফ জানিয়ে দেওয়া হয় যে, আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে অর্ধেক কোম্পানিকে বিলুপ্ত হতে হবে, কারণ প্রতিরক্ষা বিভাগ থেকে তাদের আর কোনো চুক্তি দেওয়া হবে না। পেন্টাগনের একীভূতকরণের সেই সিদ্ধান্তের ফলশ্রুতিতে আজ মাত্র পাঁচটি বিশাল প্রতিরক্ষা কোম্পানি যুক্তরাষ্ট্রের বেশিরভাগ শীর্ষ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করছে। প্রতিযোগিতা না থাকায় তাদের ওপর খরচ কমানো বা উৎপাদন ত্বরান্বিত করার কোনো তাগিদ নেই, উল্টো উৎপাদিত অস্ত্রের দাম রাখা হচ্ছে অত্যধিক।
একই সাথে বিদেশি প্রতিযোগীদেরও মার্কিন বাজারে বাধা দেওয়া হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, চমৎকার পারফরম্যান্সের ইউরোপীয় এয়ারবাস রিফুয়েলিং বিমানকে বাদ দিয়ে বোয়িংয়ের একটি সমস্যাযুক্ত ও অপরীক্ষিত বিমানকে বেছে নেওয়া হয়েছিল। এমনকি ব্রিটেন যখন শর্ট টেক-অফ অ্যান্ড ল্যান্ডিং সুবিধার হ্যারিয়ার প্ল্যাটফর্মের প্রস্তাব দেয়, তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সেটির ডিজাইন বদলে দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদনের সিদ্ধান্ত নেয়। এতে খরচ বহুলাংশে বেড়ে যায় এবং সরবরাহ পেতে মারাত্মক বিলম্ব ঘটে।
একই ঘটনা ঘটেছে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক বাতিল হওয়া ফ্রিগেট কর্মসূচি ‘এফএফজি-এক্স’-এর ক্ষেত্রে। এটি ছিল ইউরোপের অত্যন্ত সফল ফ্রেম (FREMM) প্ল্যাটফর্মের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। মার্কিন নৌবাহিনী যদি অনর্থক এতে মার্কিন ব্যবস্থা যুক্ত করে নতুন করে ডিজাইন না করত, তবে আজ মার্কিন নৌবহরে এসব আধুনিক যুদ্ধজাহাজ ভেসে বেড়াত। এমনকি ইউরোপীয় জাহাজ নির্মাণ কারখানাগুলো থেকে তৈরি জাহাজ সরাসরি কিনে নেওয়া হলেও বুদ্ধিমানের কাজ হতো। কিন্তু মার্কিন আইন অনুসারে বিদেশি মূল জাহাজের কাঠামো ব্যবহার করা নিষিদ্ধ।
বাহ্যিক উৎস থেকে অস্ত্র ক্রয়ে ব্যর্থতার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি নিয়ন্ত্রণে থাকা অস্ত্রাগারগুলোও মারাত্মক উৎপাদন সংকটে ভুগছে। নিউইয়র্কের আপস্টেটে অবস্থিত বিখ্যাত ওয়াটারভ্লিয়েট আর্সেনালের কথাই ধরা যাক। ১৮১৩ সালে প্রতিষ্ঠিত এই সরকারি কারখানাটি মার্কিন ট্যাংকের ১৫৫ মিলিমিটার ও ১২০ মিলিমিটার কামানের নল তৈরি করে। এই কামানের নলগুলো খুব দ্রুত ক্ষয় হয়ে যায় অথবা বেঁকে যায়, ফলে ঘন ঘন পরিবর্তনের প্রয়োজন পড়ে। কিন্তু ওয়াটারভ্লিয়েট বছরে মাত্র ২১৬টি কামানের নল তৈরি করতে পারে, যা চাহিদার তুলনায় নগণ্য। বর্তমানে ইউক্রেনে এই প্রয়োজনীয় খুচরা যন্ত্রংশের অভাবে এক-তৃতীয়াংশ বড় কামান অকেজো হয়ে পড়ে আছে। আজ ওয়াটারভ্লিয়েটে বিপুল পরিমাণ ব্যাকলগ জমা হয়ে আছে এবং তাদের একটি কামানের নল তৈরি করতেই চার মাস সময় লেগে যায়। সরকারি মালিকানাধীন ও পরিচালিত হওয়ায় এটি মার্কিন প্রতিরক্ষার এক ছোঁয়াছোঁয়াছ ছাড়া প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে, ফলে বিকল্প কোনো প্রতিযোগীকে অর্থায়ন করার ধারণাও সেখানে পাত্তাই পায় না।
একটি দ্রুত ও সাশ্রয়ী উপায় খোঁজার চেষ্টা কেবল শুরু হয়েছে, তবে বড় ধরনের কোনো সংস্কার আসতে বছরের পর বছর লেগে যাবে। পারস্য উপসাগরে সাম্প্রতিক ডিফেন্সিভ ব্যর্থতাগুলো দেখাচ্ছে যে, অত্যাধুনিক বিমান প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি থাকা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র তার সামরিক ঘাঁটিগুলোকে ইরান বা হুতিদের হামলা থেকে পুরোপুরি রক্ষা করতে পারছে না।
আমেরিকার এক নম্বর বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা প্যাট্রিয়ট প্রথম চালু হয় ১৯৮৫ সালে এবং গত ৪০ বছরে এতে বিভিন্ন উন্নয়ন ঘটানো হয়েছে। আকাশপথের শত্রু বিমান ধ্বংসের জন্য তৈরি এই ব্যবস্থার আধুনিক ইন্টারসেপ্টর ‘পিএসি-৩’ ১৯৯৯ সালে অন্তর্ভুক্ত করা হয়, যার সাথে যুক্ত করা হয় আরও উন্নত রাডার ও থাডের মতো ব্যবস্থার সাথে কাজ করার সুবিধা। তবে বর্তমানে এই ইন্টারসেপ্টরের প্রচণ্ড ঘাটতি দেখা দিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সংঘাতের সময় পেন্টাগন ও তার মিত্ররা মাত্র পাঁচ সপ্তাহে আনুমানিক ১৭০০টি প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে। বর্তমানে মার্কিন সংরক্ষিত তহবিলে আনুমানিক মাত্র ৭৫০টি ক্ষেপণাস্ত্র অবশিষ্ট আছে। অন্যদিকে প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান লকহীড মার্টিন বছরে প্রায় ৬৫০টি ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করে, তবে বোয়িংয়ের তৈরি রাডার সিকার সরবরাহে বিলম্বসহ নানা জটিলতায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। পেন্টাগন সম্প্রতি ইউক্রেনকে ৫০০টি প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র দেওয়ার অনুমোদন দিলেও ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি যেমনটি উল্লেখ করেছেন, সেগুলো পৌঁছাতে বছরের পর বছর সময় লেগে যাবে।
উন্নত প্যাট্রিয়ট ঠিকমতো কাজ করে না তা নয়, যদিও আধুনিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের বিরুদ্ধে এর সার্বিক কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। আসল সমস্যা হলো ড্রোন, ক্রুজ মিসাইল এবং ব্যালিস্টিক মিসাইলের সমন্বয়ে হওয়া ঝাঁক ঝাঁক আক্রমণের মুখে এদের টিকে থাকার ক্ষমতা। তাছাড়া এই ব্যবস্থার অতিরিক্ত খরচের কারণে এখন সস্তা বিকল্পের অনুসন্ধান জরুরি হয়ে পড়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রে প্যাট্রিয়টের কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী নেই। যদিও মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগ ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন দ্রুত করার চেষ্টা করছে, তবে কেবল তা দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। পেন্টাগনকে এখন একসাথে আসা গণ-ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের আক্রমণ কীভাবে ঠেকানো যায় তা বের করতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন আকাশ প্রতিরক্ষা প্ল্যাটফর্মের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, গভীর নেটওয়ার্কিং ও একাধিক স্থল, নৌ ও আকাশভিত্তিক ব্যবস্থার সমন্বয়ে নতুন উদ্ভাবন।
সংকীর্ণ মার্কিন পণ্য কেনার নীতি আসলে এক ধরনের সংরক্ষণবাদী ব্যবস্থা ছাড়া কিছুই নয়। বর্তমান সময়ের যুদ্ধে টিকতে হলে মিত্রদের মধ্যে উৎপাদন ভাগাভাগি ও বণ্টন করাই পর্যাপ্ত অস্ত্র তৈরির একমাত্র বাস্তবসম্মত উপায়। একইসাথে পেন্টাগন উৎপাদন ও পরীক্ষার ওপর যেসব অতিরিক্ত প্রশাসনিক নিয়মকানুন চাপিয়ে রেখেছে তা পুনর্মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। আমেরিকার সম্ভাব্য শত্রুরা ইতিমধ্যেই জেনে গেছে যে তারা সীমিত সামরিক অভিযান ছাড়া বড় কোনো যুদ্ধে লড়াই করার জন্য প্রস্তুত নয়। এটি কেবল যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিতেই প্রভাব ফেলছে না, বরং দিনশেষে তাদের সমগ্র জাতীয় নিরাপত্তাকেই বড় ধরনের ঝুঁকিতে ফেলে দিচ্ছে।
সূত্র: এশিয়া টাইমস
