গভীর রাতে উত্তরায় তাণ্ডব
নিজস্ব প্রতিবেদক
রাজধানীর উত্তরায় রিকশাচালককে পিটিয়ে হত্যা ও লাশ গুমের অভিযোগ তুলে ‘উত্তরা স্কয়ার শপিং মল’ ঘেরাও করেন রিকশা এবং ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার চালকরা। এরপর তারা মার্কেটের সামনের গ্লাসে ব্যাপক ভাঙচুর চালান। তবে হত্যা ও লাশ গুমের খবরটি গুজব বলে জানিয়েছে পুলিশ।
গতকাল সকালে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম) নজরুল ইসলাম মার্কেটটি পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের জানান, এ ঘটনায় কিছু দুষ্কৃতকারী মব সৃষ্টির মাধ্যমে লুটপাটের চেষ্টা চালায়। এতে পুলিশের ছয় সদস্য আহত হয়েছেন। ঘটনায় জড়িতদের আইনের আওতায় আনতে আলামত সংগ্রহ করা হচ্ছে।
সরেজমিন দেখা যায়, উত্তরা-১১ নম্বর সেক্টরের সোনারগাঁও জনপথ সড়কে অবস্থিত স্কয়ার শপিং মলটি। দুপুরেও মার্কেটের আশপাশে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করতে দেখা যায়। রাতের উত্তেজনার রেশ সকালেও কাটেনি। রিকশাচালকরা সেখানে জড়ো হওয়ার চেষ্টা করেন। পরে পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসে। সেখানকার বাণিজ্যিক কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েন করা হয়। অপরদিকে, রিকশাচালকরা উত্তরার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ দেখিয়েছেন। এতে উত্তরা থেকে বিমানবন্দর ও টঙ্গীমুখী সড়কে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। সাধারণ যাত্রী ও চালকরা চরম ভোগান্তিতে পড়েন। এর আগে রবিবার রাত সাড়ে ১১টায় মার্কেটটির নিরাপত্তাকর্মীদের সঙ্গে রিকশা পার্কিং নিয়ে এক চালকের কথা কাটাকাটি হয়। পরে ওই রিকশাচালককে হত্যা করা হয়েছে এমন খবর ছড়িয়ে পড়লে শত শত রিকশাচালক শপিং মলের সামনে জড়ো হয়। তারা সেখানে সড়কে আগুন জ্বালিয়ে বিক্ষোভ দেখাতে থাকেন। একপর্যায়ে মার্কেটের নিরাপত্তাকর্মীদের সঙ্গে হাতাহাতিতে রূপ নেয়। পরে রিকশাচালকরা শপিং মলে ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও লাঠিসোঁটা নিয়ে ভাঙচুর শুরু করে। এতে শপিংমলের আশপাশ এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। একপর্যায়ে রিকশাচালকরা উত্তরা পশ্চিম থানায় গিয়েও হামলা চালান এবং ভবনের সামনে রাখা যানবাহনে অগ্নিসংযোগ করেন। এতে পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। সাধারণ মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য ছোটাছুটি শুরু করেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। জামাল নামে এক রিকশাচালক অভিযোগ করেন, ওই রিকশাচালককে পিটিয়ে হত্যার পর তার লাশ ভবনের ভিতরে লুকিয়ে রাখা হয়। এ তথ্য ছড়িয়ে পড়লে উপস্থিত জনতা আরও ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করলে কয়েক দফায় রিকশাচালকদের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়। বিক্ষুব্ধরা দফায় দফায় ইটপাটকেল ছুড়তে থাকে। রাত সাড়ে ১১টা থেকে শুরু হওয়া এই উত্তেজনা গতকাল ভোর ৪টা পর্যন্ত চলে। একপর্যায়ে লাঠিচার্জ ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
গতকাল স্থানীয় ও পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মার্কেটের নিরাপত্তাকর্মীর সঙ্গে এক রিকশাচালকের বাগবিতণ্ডা মারামারিতে রূপ নেয়। বিষয়টি দ্রুত অন্য রিকশাচালকদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়লে উত্তেজিত জনতা সড়ক অবরোধের পাশাপাশি মার্কেট ভাঙচুরের চেষ্টা করে। পরে নিরাপত্তা ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম যাতে ব্যাহত না হয় সেজন্য অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। আর ঘটনার সত্যতা যাচাই ও জড়িতদের শনাক্তের জন্য তদন্ত অব্যাহত রয়েছে। এ ছাড়া পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এলাকায় সতর্ক অবস্থানে থাকবে। এ বিষয়ে ডিএমপির যুগ্ম কমিশনার ওয়াহিদুল ইসলাম বলেন, একজন নিখোঁজ থাকার কথা বলা হলেও এখনো তার নাম-ঠিকানা পাওয়া যায়নি। কেউ নিহত হয়েছেন কি না সেটিও নিশ্চিত না। বিষয়টি যাচাই করতে সিসিটিভি ফুটেজ পরীক্ষা করা হবে।
তিনি জানান, সেনাবাহিনী ও পুলিশ ভবনের ভিতরে তল্লাশি চালালেও এখন পর্যন্ত সন্দেহজনক কিছু পাওয়া যায়নি। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ঘটনাস্থলে প্রায় ২ হাজার পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়। এদিকে নিজেদের অফিশিয়াল ফেসবুক পেজের এক পোস্টে একটি ভিডিও প্রকাশ করেছে ‘উত্তরা স্কোয়ার’ কর্তৃপক্ষ। পোস্টের ক্যাপশনে তারা দাবি করেন, ‘উত্তরায় একটি গুজব ছড়িয়ে দিয়ে কিছু লোকজন মব সৃষ্টি করে মার্কেটে ভাঙচুর চালিয়েছে। অথচ যেই রিকশাওয়ালার সঙ্গে ঝামেলা হয়েছিল, তিনি নিজেই হেঁটে মার্কেট থেকে বের হয়ে গেছেন। তাকে মেরে ফেলা হয়েছে, এটি সম্পূর্ণ মিথ্যা ও গুজব। সবার প্রতি অনুরোধ, গুজবে কান দেবেন না এবং যাচাই না করে কিছু বিশ্বাস করবেন না।’ তবে রাতেই পরিস্থিতি জানতে ঢাকা-১৮ আসনের এমপি এস এম জাহাঙ্গীর হোসেন ঘটনাস্থলে গিয়ে রিকশাচালকদের সঙ্গে কথা বলেন এবং পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা চালান।
