গাজা থেকে সব ফিলিস্তিনিকে তাড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা ইসরায়েলের

অনলাইন ডেস্ক

ইসরায়েলের কট্টর ডানপন্থী নেতা এবং জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ক মন্ত্রী ইতামার বেন গাভির গাজা ভূখণ্ড থেকে সব ফিলিস্তিনিকে তাড়িয়ে দেওয়ার বিস্তারিত পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন। আসন্ন নির্বাচনের প্রচারণার অংশ হিসেবে দেওয়া এক বক্তব্যে বেন গাভির দাবি করেন, গাজার আনুমানিক ২০ লাখ জনসংখ্যার পুরোটাকেই অন্যান্য দেশে সরিয়ে নেওয়ার এই প্রস্তাব অত্যন্ত বাস্তবসম্মত ও সুনির্দিষ্ট।

তার ঘোষিত এই পরিকল্পনায় উল্লেখ করা হয়েছে, প্রথম বছরেই গাজা থেকে আড়াই লাখ ফিলিস্তিনিকে সরিয়ে দেওয়া হবে। পরবর্তী ছয় বছরের মধ্যে অবরুদ্ধ এই ভূখণ্ডের বাকি সব বাসিন্দাকে স্থানান্তরিত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। বেন গাভির বলেন, গাজাবাসীদের গ্রহণ করতে প্রস্তুত এমন কয়েকটি দেশ রয়েছে। তবে তিনি সুনির্দিষ্টভাবে কোনো দেশের নাম প্রকাশ করতে রাজি হননি।

আন্তর্জাতিক আইন ও জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী কোনো অধিকৃত ভূখণ্ডের বেসামরিক জনগোষ্ঠীকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত করা বা বিতাড়িত করাকে যুদ্ধাপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়। কিন্তু মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উদ্যোগে করা যুদ্ধবিরতি চুক্তি বাস্তবায়নের প্রচেষ্টা উপেক্ষা করে ইসরায়েলি রাজনীতিবিদরা গাজা নিয়ে কে কত কঠোর নীতি গ্রহণ করতে পারেন, তা দেখানোর প্রতিযোগিতায় নেমেছেন। বর্তমানেও গাজায় ইসরায়েলের হামলা নিরবচ্ছিন্নভাবে অব্যাহত রয়েছে।

বেন গাভির জানান, তাদের কট্টর ডানপন্থী দল ‘জুইশ পাওয়ার’ (ওৎজমা ইহুদিত) আগামী সরকার গঠনের সময় ‘অভিবাসন বিষয়ক নতুন মন্ত্রণালয়’ দাবি করবে। তিনি আরও দাবি করেন, এই পরিকল্পনাটি হুট করে নেওয়া কোনো সিদ্ধান্ত নয় বরং প্রায় দেড় বছরের টানা গবেষণার পর একটি পূর্ণাঙ্গ রূপ হিসেবে এটি তৈরি করা হয়েছে। ২০ পৃষ্ঠার এই বিতর্কিত নথির শিরোনাম দেওয়া হয়েছে ‘গাজা উপত্যকা থেকে স্বেচ্ছায় অভিবাসনের জাতীয় কর্মপরিকল্পনা’।

দলিলটিতে কৌশলে ‘স্বেচ্ছায়’ শব্দটি ব্যবহার করা হলেও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় একে স্পষ্টতই একটি জোরপূর্বক ও নিপীড়নমূলক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছে। কারণ ইসরায়েলের দীর্ঘদিনের সামরিক হামলা ও অবরোধের ফলে গাজার মানুষের জন্য বেঁচে থাকার মৌলিক পরিস্থিতিই আর বজায় রাখা হয়নি। একই সঙ্গে বেন গাভিরের মূল উদ্দেশ্য অত্যন্ত স্পষ্ট; গাজা ভূখণ্ডকে সম্পূর্ণ ফিলিস্তিনিশূন্য করা। এর আগে আন্তর্জাতিক একটি স্বাধীন জাতিসংঘ তদন্ত দল নিশ্চিত করেছিল যে, ইসরায়েল গাজায় ক্রমাগত শিশু হত্যা ও আক্রমণ চালিয়ে আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী গণহত্যা অব্যাহত রেখেছে।

ইতামার বেন গাভিরের এই বিষোদ্গার এমন এক সময়ে এলো, যখন তার কয়েক দিন আগেই ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ অনুরূপ এক মন্তব্য করেন। কাৎজ জানান, গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের তাড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনাটি মার্কিন ট্রাম্প প্রশাসনের অনুমোদনের জন্য ইসরায়েল চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, পরিকল্পনাটি ট্রাম্প সাময়িকভাবে স্থগিত রেখেছিলেন, তবে তা বাতিলের বদলে এখনও আলোচনার টেবিলেই রয়েছে। কাৎজ ইসরায়েলি পত্রিকা ইয়েদিওথ আহরোনোথ-এর এক সম্মেলনে স্পষ্ট করেন যে, ইসরায়েল যে কোনো উপায়েই হোক গাজাবাসীদের এই স্থানান্তরে সহায়তা করবে।

চলতি বছরের শুরুর দিকে নিজের দ্বিতীয় মেয়াদের সূচনালগ্নে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও গাজার ২০ লাখ বাসিন্দাকে তাড়িয়ে দিয়ে সেই ভূখণ্ড মার্কিন উদ্যোগে পুনরায় গড়ে তোলার একটি প্রস্তাব দিয়ে বিশ্বজুড়ে তীব্র ক্ষোভের মুখে পড়েছিলেন। পরবর্তীতে তিনি সেই বিতর্কিত বক্তব্য থেকে কিছুটা পিছু হটেছিলেন।

আগামী অক্টোবরে হতে যাওয়া ইসরায়েলের সাধারণ নির্বাচনকে সামনে রেখে চরমপন্থী জাতীয়তাবাদী ভোটারদের নিজের পক্ষে টানতে বেন গাভির ধারাবাহিকভাবে একের পর এক উসকানিমূলক পদক্ষেপ ও বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছেন। সম্প্রতি তিনি ইসরায়েলি সামরিক আদালতে প্রাণঘাতী হামলার অভিযোগে দণ্ডপ্রাপ্ত ফিলিস্তিনি বন্দিদের ফাঁসি দেওয়ার স্থানে গিয়ে ধারণ করা একটি ভিডিও প্রকাশ করেন। যদিও ইসরায়েলি একই ধরনের চরম অপরাধে অভিযুক্ত ইহুদিদের ক্ষেত্রে এই আইন প্রযোজ্য নয়। অন্য আরেকটি ভিডিওতে দেখা যায়, তিনি ইসরায়েলি হেফাজতে থাকা ফিলিস্তিনি বন্দিদের নির্যাতন ও দুর্ব্যবহারের ঘটনা নিয়ে প্রকাশ্যে আনন্দ ও বড়াই প্রকাশ করছেন।

সাম্প্রতিক রাজনৈতিক জরিপগুলো বলছে, বর্ণবাদে উসকানি দেওয়া এবং একটি সন্ত্রাসী সংগঠনকে সমর্থনের দায়ে পূর্বে ইসরায়েলি আদালতেই দণ্ডপ্রাপ্ত এবং একাধিক দেশের নিষেধাজ্ঞার তালিকায় থাকা বেন গাভিরের দল জুইশ পাওয়ার নির্বাচনে প্রায় সাতটি আসনে জয় পেতে পারে।

অন্যদিকে, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু গত বুধবার গাজার একটি সামরিক আউটপোস্ট পরিদর্শনে গিয়ে দৃঢ় বার্তা দেন যে, ইসরায়েলি বাহিনী কোনো অবস্থাতেই গাজার দখল করা অঞ্চলগুলো থেকে সরে আসবে না। নেতানিয়াহু দাবি করেন, ইসরায়েল এই রেখা থেকে একচুলও পিছু হটবে না। তাদের নিয়ন্ত্রণে বর্তমানে গাজা ভূখণ্ডের ৬০ শতাংশ অঞ্চল রয়েছে এবং এই দখলের পরিধি আরও বাড়বে। কারণ তারা প্রতিদিন সেখানে তাদের নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ ব্যক্তিদের ধ্বংস বা নিমূল করার অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে।

ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর ডেপুটি চিফ অফ জেনারেল স্টাফ মেজর জেনারেল তামির ইয়াদাইয়ের দেওয়া তথ্যমতে, ইসরায়েল এখন গাজার প্রায় ৬৫ শতাংশ ভূখণ্ড নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখেছে। এই সামরিক দখল গত বছর ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে নির্ধারিত ৫৩ শতাংশ সীমানাকে অনেক আগেই ছাপিয়ে গেছে।

সূত্র: গর্ডিয়ান

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights