ঘরের ভেতর ভিন্ন চ্যালেঞ্জ, নেতানিয়াহু টিকবেন কি?

অনলাইন ডেস্ক

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নজিরবিহীন আক্রমণের পর প্রথমবারের মতো জাতীয় নির্বাচনে ভোট দিতে যাচ্ছেন ইসরায়েলি নাগরিকরা। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এই নির্বাচনকে মূলত প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর দীর্ঘ নেতৃত্বের ওপর জনগণের এক চূড়ান্ত গণভোট হিসেবে দেখছে।

তবে ক্যাম্পেইনে সবচেয়ে আলোচিত বিষয়টি বাইরের বিশ্বের প্রত্যাশার চেয়ে কিছুটা আলাদা। গাজায় যুদ্ধের নীতি ও কৌশল নিয়ে দেশটির ভেতরে খুব একটা বিতর্ক নেই, যদিও এই যুদ্ধের কারণেই নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি রয়েছে।

একইভাবে দক্ষিণ লেবানন ও সিরিয়ার একাংশে নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা কিংবা ইরানের সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার সিদ্ধান্তগুলোর প্রতিও ইসরায়েলি সমাজের একটা বড় অংশের সমর্থন রয়েছে।

এর পরিবর্তে ভোটারদের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে নেতানিয়াহুর ব্যক্তিগত নৈতিকতা ও নেতৃত্ব। ৭ অক্টোবরের নিরাপত্তা ব্যর্থতায় তার ভূমিকা, অতি-অর্থোডক্স ইহুদিদের সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়া থেকে অব্যাহতি দেওয়ার বিতর্কিত সিদ্ধান্ত এবং ২০২৩ সালের বিচার বিভাগীয় সংস্কার নীতি।

নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী প্রধান দুই জোটেরই প্রাধান্য রয়েছে এমন রাজনৈতিক দলগুলোর হাতে, যারা অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইহুদি বসতি স্থাপনকে সমর্থন করে এবং স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের তীব্র বিরোধিতা করে। বলা চলে, প্রধান কোনো প্রার্থীর প্রচারণাতেই থমকে যাওয়া শান্তি প্রক্রিয়া পুনরায় শুরু করার কোনো ইঙ্গিত মিলছে না।

সাধারণ মানুষ যখন ভোটকেন্দ্রে যাবেন, তখন তাদের চোখে পড়বে নিহত সেনাদের ছবি দেওয়া পোস্টার আর জিম্মিদের স্মরণে টাঙানো হলুদ রিবন। অবশ্য দীর্ঘ আলোচনার পর গত বছর এক যুদ্ধবিরতি চুক্তির মাধ্যমে শেষ জিম্মিকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। একটি শীর্ষস্থানীয় থিঙ্ক ট্যাঙ্কের তথ্য মতে, প্রায় ৬৮ শতাংশ ইহুদি ভোটার জানিয়েছেন যে ৭ অক্টোবরের ঘটনা তাদের দল নির্বাচনের ক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা রাখছে। অন্যদিকে, দেশটির আরব সংখ্যালঘুদের ক্ষেত্রে মাত্র ৩২ শতাংশ বিষয়টি নিয়ে চিন্তিত, কারণ তাদের কাছে স্থানীয় অপরাধ দমনই প্রধান ইস্যু।

নেতানিয়াহু ৭ অক্টোবরের ব্যর্থতার দায় নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের ওপর চাপানোর চেষ্টা করছেন। একই সাথে তিনি গাজায় হামাস, লেবাননে হিজবুল্লাহ এবং তাদের মূল পৃষ্ঠপোষক ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক সাফল্য তুলে ধরছেন। তবে সমালোচকদের দাবি, তিনি ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত থামিয়ে দিয়েছেন, সময়মতো জিম্মিদের ফিরিয়ে আনতে ব্যর্থ হয়েছেন এবং কোনো শত্রুর বিরুদ্ধেই চূড়ান্ত জয় ছিনিয়ে আনতে পারেননি।

এর পাশাপাশি সেনাবাহিনীর নিয়োগ নীতি নিয়েও বিতর্ক তুঙ্গে। নেতানিয়াহুর বর্তমান জোট সরকার অতি-অর্থোডক্স ধর্মীয় শিক্ষার্থীদের সেনাবাহিনীতে যোগ না দেওয়ার যে সুযোগ দিয়েছে, তা নিয়ে তীব্র অসন্তোষ দেখা দিয়েছে সাধারণ ধর্মনিরপেক্ষ নাগরিকদের মধ্যে। কারণ, যুদ্ধ পরিস্থিতিতে সাধারণ রিজার্ভ সেনাদের বারবার তলব করা হচ্ছে। ইসরায়েলে সাধারণত নারী ও পুরুষ উভয়ের জন্যই সামরিক সেবা বাধ্যতামূলক। বর্তমানে প্রতি বছর ১৮ বছর বয়সী প্রায় ১৩ হাজার অতি-অর্থোডক্স যুবক এই বয়সে পৌঁছালেও তাদের ১০ শতাংশের কম সেনাবাহিনীতে যোগ দেয়। বিশেষজ্ঞ ও বিশ্লেষকদের মতে, দেশটির অর্ধেকের বেশি ভোটার সামরিক সেবা না দেওয়ার এই সুযোগ বন্ধ করার বিষয়টিকে বিরোধী জোটের প্রধান এজেন্ডা হিসেবে দেখছেন। নেতানিয়াহুর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী গাদি আইজেনকোট প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে তিনি এই নিয়ম বাতিল করবেন। সাবেক এই সেনাপ্রধান গাজা যুদ্ধে তাঁর ছেলে ও দুই ভাইপোকে হারিয়েছেন।

অন্যদিকে, ২০২৩ সালের বিতর্কিত বিচার বিভাগীয় সংস্কার কর্মসূচির বিষয়টি দেশটিতে এখনও বিভাজন তৈরি করে রেখেছে। যদিও গাজা যুদ্ধের কারণে এটি কিছুটা আড়ালে পড়ে গেছে, তবুও বামপন্থী ও মধ্যপন্থী দলগুলো এটিকে স্বৈরাচারী পদক্ষেপ হিসেবে দেখে আসছে এবং এই আইন বাতিলের ঘোষণা দিয়েছে।

ইসরায়েলের নির্বাচনে নাগরিকরা কোনো একক প্রার্থীকে সরাসরি ভোট দেন না, বরং তারা রাজনৈতিক দলকে ভোট দেন। দেশটির ১২০ আসনের পার্লামেন্ট বা নেসেটে কোনো একক দল একাই ৬১টি আসন পেয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারবে বলে মনে হচ্ছে না। তাই জোট গঠনের পরেই নির্ধারিত হবে কে হবেন পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী। কোনো পক্ষই সরকার গঠনে ব্যর্থ হলে নেতানিয়াহুর বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারই বহাল থাকবে। নেতানিয়াহুর সমর্থকরা তাঁকে একজন অভিজ্ঞ রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে দেখেন যিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ বৈশ্বিক শক্তিগুলোর চাপের মুখেও ইসরায়েলের নিরাপত্তা স্বার্থে আপস করেননি। পক্ষান্তরে, তাঁর বিরোধীরা তাঁকে দুর্নীতিগ্রস্ত এবং ক্ষমতার অপব্যবহারকারী মনে করেন।

রাজনৈতিক উত্তেজনার মাঝে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধিও সাধারণ মানুষকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করছে। বর্তমানে ইসরায়েলে জীবনযাত্রার খরচ ইউরোপের অনেক ধনী দেশের চেয়েও বেশি। যুদ্ধের কারণে সামরিক ব্যয় চরম মাত্রায় বৃদ্ধি পাওয়ায় অর্থনৈতিক চাপ আরো ঘনীভূত হচ্ছে। যদিও নেতানিয়াহু তাঁর অর্থনৈতিক নীতিকে প্রবৃদ্ধির মূল চাবিকাঠি হিসেবে দেখান, কিন্তু বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘমেয়াদী সংঘাত ও উচ্চ সামরিক ব্যয়ের খেসারত সাধারণ ইসরায়েলিদেরই দিতে হচ্ছে।

এপির বিশ্লেষণ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights