চট্টগ্রামে পানিবন্দি মানুষ, মানবেতর জীবন

বিশেষ প্রতিনিধি, চট্টগ্রাম

টানা কয়েক দিনের ভারি বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে চট্টগ্রামের বিস্তীর্ণ এলাকা পানির নিচে তলিয়ে গেছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন জেলার ১০ লাখ মানুষ। অনেক এলাকায় রাস্তাঘাট পানিতে নিমজ্জিত হয় যোগাযোগ ব্যবস্থা হয়ে পড়েছে বিপর্যস্ত। কোথাও যাতায়াত করতে হচ্ছে নৌকাযোগে। তবে নৌকাও অপ্রতুল হওয়ায় গৃহবন্দি হয়ে পড়েছেন মানুষ। কেউ কেউ আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে পারলেও বেশিরভাগ মানুষই বাসাবাড়িতে অটকা পড়েছেন। খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সংকটে মানবেতর জীবনযাপন করছেন তারা।

শনিবারও প্রায় সবকয়টি উপজেলা কমবেশি বন্যাকবলিত। এর মধ্যে ছয়টি উপজেলা বাঁশখালী, সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, চন্দনাইশ, হাটহাজারী ও ফটিকছড়ির বন্যা পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি সাতকানিয়া উপজেলায়। এখানকার অনেক এলাকার সড়কে হাঁটু থেকে বুক সমান পানি। বেশিরভাগ বাড়ির নিচতলা পানিতে ডুবে গেছে।

চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন ও বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থা ত্রাণ বিতরণ করলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। যতায়াতের ব্যবস্থা না থাকায় প্রত্যন্ত এলাকায় ত্রাণ পৌঁছানো যাচ্ছে না।

টানা প্রায় ছয় দিনের ভারি বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, চন্দনাইশ, বাঁশখালী, হাটহাজারী ও ফটিকছড়িসহ জেলার বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত সাতকানিয়া উপজেলা। উপজেলার ১৭টি ইউনিয়নের সবকটিই পানির নিচে তলিয়ে গেছে। শুধু এ উপজেলাতেই চার লাখের বেশি মানুষ পানিবন্দি।

জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রামের ১৬টি উপজেলা ও মহানগরের ১৭৬টি ইউনিয়ন ও পৌরসভা বন্যাকবলিত হয়েছে। বর্তমানে ১ লাখ ৮৮ হাজার ৬৪৮টি পরিবার পানিবন্দী এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭ লাখ ৫৪ হাজার ৫৯০। পাহাড়ধস, দেয়ালধস ও পানিতে ডুবে এ পর্যন্ত ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং আহত হয়েছেন পাঁচজন।

চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম মিয়া বলেন, অনেক এলাকায় সাধারণ নৌকাও পৌঁছাতে পারছে না। তাই দুর্গম এলাকায় স্পিডবোট ব্যবহার করে উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করা হবে। জেলার ৬৭০টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। বর্তমানে সেখানে ২৩ হাজার ৮৫০ জন আশ্রয় নিয়েছেন। আশ্রয়কেন্দ্রে শুকনো খাবারের পাশাপাশি রান্না করা খাবারেরও ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

তিনি জানান, বন্যার্তদের জন্য এ পর্যন্ত ৭০০ মেট্রিক টন চাল ও ৬০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৩০০ মেট্রিক টন চাল, ৪৩ লাখ টাকা, ২২ হাজার ২৫০টি শুকনো খাবারের প্যাকেট এবং ৯ হাজার ৮০০টি রান্না করা খাবারের প্যাকেট বিতরণ করা হয়েছে। জেলা প্রশাসনের কাছে বর্তমানে আরও ৪০০ মেট্রিক টন চাল ও ১৭ লাখ টাকা জরুরি ত্রাণ হিসেবে মজুত রয়েছে।

সাতকানিয়ার জন্য ইতিমধ্যে ৯ লাখ টাকা ও ২৫ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ইউনিয়নগুলোতে ওই চাল দিয়ে রান্না করা খাবার বিতরণ করা হচ্ছে। জেলার অন্যান্য ক্ষতিগ্রস্ত উপজেলাতেও একই কার্যক্রম চলছে। সাতকানিয়ার পরিস্থিতি সরেজমিনে পরিদর্শনের পর চট্টগ্রামের জন্য অতিরিক্ত বিশেষ বরাদ্দ দেওয়ার আশ্বাসও পাওয়া গেছে বলে জানান জেলা প্রশাসক।

বন্যাকবলিত সাতকানিয়া, বোয়ালখালী, হাটহাজারী ও ফটিকছড়িসহ কয়েকটি উপজেলায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে উদ্ধারকাজে অংশ নিচ্ছে। সন্দ্বীপে সহায়তা করছে বাংলাদেশ কোস্টগার্ড। পাশাপাশি পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির স্বেচ্ছাসেবকেরা উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন।

জলাবদ্ধতার কারণ প্রসঙ্গে জেলা প্রশাসক বলেন, শুধু খাল দখল নয়, খালে বিভিন্ন ধরনের বর্জ্য ফেলার কারণেও পানি নিষ্কাশন ব্যাহত হচ্ছে। খাল পরিষ্কার করতে গিয়ে ফ্রিজ, জাজিমসহ নানা ধরনের বর্জ্য পাওয়া যাচ্ছে। খাল দখলকারীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে নাগরিকদের দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

তিনি বলেন, গতকয়েক দিনের তুলনায় বৃষ্টির তীব্রতা কিছুটা কমেছে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী আগামী দুই-এক দিনের মধ্যে বৃষ্টিপাত আরও কমলে পাহাড়ি ঢলের পানিও নেমে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে শনিবার সাংগু নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করেছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গে সমন্বয় করে স্লুইস গেট ও পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা সচল রাখতে কাজ চলছে।

বন্যা-পরবর্তী স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলায় মেডিকেল টিম, প্রয়োজনীয় ওষুধ এবং বিশুদ্ধ পানির সরবরাহ প্রস্তুত রাখা হয়েছে বলেও জানান জেলা প্রশাসক।

প্রাথমিক হিসাবে সড়ক ও জনপথ বিভাগের আওতাধীন ২০টি সড়কের ৫০ দশমিক ৫৬ কিলোমিটার অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) তথ্য অনুযায়ী, জেলার ৫১৪টি সড়কের ২৪৭ দশমিক ৬৫ কিলোমিটার অংশ এবং ১৭৬টি সেতু ও কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, “সরকার ও জেলা প্রশাসন বন্যার্ত মানুষের পাশে রয়েছে। পর্যাপ্ত ত্রাণ মজুত আছে। উদ্ধার, ত্রাণ ও চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে সব বিভাগ সমন্বিতভাবে কাজ করছে। পরিস্থিতির সম্পূর্ণ উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।”

তিনি বিত্তবান ব্যক্তি, সামাজিক সংগঠন ও স্বেচ্ছাসেবীদের বন্যাদুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights